নূর–মামুনের নির্বাচনি ঝড়ে অস্থির স্থানীয় বিএনপি
জলিল রহমান, পটুয়াখালী
প্রকাশ: ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৭:২১ পিএম
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
পটুয়াখালী-৩ (গলাচিপা–দশমিনা) আসনের নির্বাচন ঘিরে বিএনপির স্থানীয় রাজনীতিতে বড় ধরনের রদবদল দেখা দিয়েছে। জোটের প্রার্থী গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নূর এবং বিএনপির ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী হাসান মামুনের প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে কেন্দ্র করে দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ, একের পর এক কমিটি বিলুপ্তি, বহিষ্কারাদেশ ও নতুন আহ্বায়ক কমিটি গঠনের মধ্য দিয়ে এ পরিবর্তন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
গত ১৮ দিনের ব্যবধানে গলাচিপা ও দশমিনা উপজেলায় বিএনপি এবং এর অঙ্গসংগঠনের একাধিক কমিটি বিলুপ্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্যের অভিযোগে কয়েকজন নেতাকে বহিষ্কার করা হয়।
দলীয় সূত্রের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে হাসান মামুনের প্রভাবাধীন স্থানীয় বিএনপির সাংগঠনিক নিয়ন্ত্রণ কয়েক দিনের ব্যবধানে তার বিরোধী শিবিরের হাতে চলে গেছে।
ভিপি নুরুল হক নূর ও স্বতন্ত্র প্রার্থী হাসান মামুনের পক্ষে–বিপক্ষে বিএনপির নেতাকর্মীরা বিভক্ত হয়ে প্রচারণায় নামলে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের কাছে অভিযোগ পৌঁছায়। এর পরিপ্রেক্ষিতে তারেক রহমানের নির্দেশে কেন্দ্রীয় বিএনপি সাংগঠনিক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়। এতে গলাচিপা–দশমিনায় বিএনপির ভেতরে চরম অস্থিরতা তৈরি হয়।
৩ ফেব্রুয়ারি কেন্দ্রীয় যুবদলের সহ-দপ্তর সম্পাদক মিনহাজুল ইসলাম ভূঁইয়ার স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে জানানো হয়, দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য ও সংগঠনবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে দশমিনা যুবদলের আহ্বায়ক এনামুল হক ও যুগ্ম আহ্বায়ক ইয়াসিন আলী খান এবং গলাচিপা যুবদলের আহ্বায়ক মশিউর রহমান, যুগ্ম আহ্বায়ক জাহিদুল ইসলাম ও সদস্য মোস্তাফিজুর রহমানকে দলীয় পদ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। একই সঙ্গে গলাচিপা উপজেলা ও পৌর এবং দশমিনা উপজেলা যুবদলের কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়।
দলীয় সূত্র জানায়, গত ২৭ জানুয়ারি বহিষ্কৃত এনামুল হক জোট প্রার্থী নুরুল হক নূরের বিরুদ্ধে নির্বাচনি আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ এনে দশমিনা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে লিখিত অভিযোগ করেন। পরিপ্রেক্ষিতে ৩০ জানুয়ারি দশমিনা নির্বাচনি অনুসন্ধান ও বিচারিক কমিটির দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নুরুল হক নূরকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেন।
এছাড়া বহিষ্কৃত কয়েকজন নেতা দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে বিদ্রোহী প্রার্থী হাসান মামুনের পক্ষে প্রকাশ্যে প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছিলেন।
এর আগে ২ ফেব্রুয়ারি বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীর স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে গলাচিপা ও দশমিনা উপজেলা এবং গলাচিপা পৌর বিএনপির নতুন আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করা হয়। এরও আগে ১৭ জানুয়ারি এসব শাখার বিদ্যমান কমিটি বিলুপ্ত করা হয়েছিল।
দলীয় সূত্রের দাবি, বিলুপ্ত কমিটির অনেক নেতা দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে হাসান মামুনের পক্ষে অবস্থান নেন।
নবগঠিত কমিটিতে স্থান পাওয়া কয়েকজন নেতাকে জেলা যুবদলের সাবেক নেতা মো. শিপলু খানের ঘনিষ্ঠ হিসেবে দেখা হচ্ছে। শিপলু খান শুরু থেকেই নুরুল হক নূরের পক্ষে মাঠে সক্রিয় রয়েছেন।
নতুন কমিটি অনুযায়ী, গলাচিপা উপজেলা বিএনপির ২১ সদস্যের আহ্বায়ক কমিটির আহ্বায়ক হয়েছেন গোলাম মোস্তফা এবং সদস্য সচিব আলতাব খান। দশমিনা উপজেলা বিএনপির ১৬ সদস্যের কমিটির আহ্বায়ক সিদ্দিক আহমেদ মোল্লা ও সদস্য সচিব হয়েছেন শাহালম শানু। গলাচিপা পৌর বিএনপির আহ্বায়ক রাকিবুল ইসলাম খান এবং সদস্য সচিব শাহেব আলী মাতব্বর। এসব কমিটির নেতারা বর্তমানে নুরুল হক নূরের ‘ট্রাক’ প্রতীকের পক্ষে নির্বাচনী প্রচারণা চালাচ্ছেন।
নুরুল হক নূরের পক্ষে কাজ না করার অভিযোগ তুলে নবগঠিত কমিটির নেতারা গলাচিপা ও দশমিনার সব ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা করেছেন। ৪ ও ৫ ফেব্রুয়ারি পৃথক প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এ সিদ্ধান্ত জানানো হয়। শুক্রবার জরুরি সভা ডাকা হয়েছে; সেখানে নতুন কমিটি গঠনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
স্থানীয় বিএনপির একাধিক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, নূর–মামুনের দ্বন্দ্ব এখন কেবল দুই প্রার্থীর মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি স্থানীয় বিএনপির নেতৃত্ব ও ভবিষ্যৎ নিয়ন্ত্রণের লড়াইয়ে রূপ নিয়েছে। নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, ততই এই ভাঙা–গড়ার রাজনীতি আরও স্পষ্ট হচ্ছে। এই অভ্যন্তরীণ টানাপড়েন পটুয়াখালী-৩ আসনের নির্বাচনি ফলাফলে বড় প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
