শেষ মুহূর্তের ভোটের হিসেব
গাজীপুরের ৫টি আসনে জয়ের বিকল্প ভাবছে না বিএনপি-জামায়াত
শাহ সামসুল হক রিপন, গাজীপুর
প্রকাশ: ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৫:০২ এএম
নির্বাচনে নিজ দল ও জোটের প্রার্থীর জয় নিয়েই ভাবছেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ও জামায়াতে ইসলামীসহ ১১ দলীয় জোটের প্রার্থীরা।
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিজ দল ও জোটের প্রার্থীর জয় নিয়েই ভাবছেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ও জামায়াতে ইসলামীসহ ১১ দলীয় জোটের প্রার্থীরা। গাজীপুরের ৫টি আসনে অন্যান্য দলের প্রার্থীরাও জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী।
এ জেলায় মোট ভোটার সংখ্যা ২৭ লাখ ৩৮ হাজার ২৫২ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ১৩ লাখ ৬৪ হাজার ৩৪৯ জন ও নারী ভোটার ১৩ লাখ ৭৩ হাজার ৮৬৯ জন।
ঢাকার সন্নিকটে শিল্পসমৃদ্ধ গাজীপুরের ৫টি আসনের দিকে সবার দৃষ্টি। বিগত সময়ে আন্দোলন সংগ্রামে ঢাকার সাথে গাজীপুরের মানুষের ছিল ব্যাপক ভূমিকা। এক সময় এ আসনগুলো আওয়ামী লীগের দখলে ছিল।
গত ২৭ জানুয়ারি রাতে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান গাজীপুরে রাজবাড়ি মাঠে এক জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন। তার জনসভায় বিপুল সংখ্যক নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষ উপস্থিত ছিলেন। দীর্ঘ প্রায় দুই দশক পরে গাজীপুরে তারেক রহমানের আগমনকে কেন্দ্র করে সাধারণ মানুষের মাঝে যেমন সাড়া ফেলেছে তেমন উজ্জীবিত হয়ে উঠেছেন নেতাকর্মীরা। সমাবেশে নেতাকর্মীরা গাজীপুরের ৫টি আসনেই বিএনপি প্রার্থীরা জয়ী হবে বলে আশা প্রকাশ করেন। সে লক্ষ্যেই তারা কাজ করছেন। গাজীপুর যে বিএনপির ঘাঁটি তা এবার তারা প্রমাণ দিতে চায়। গাজীপুর-১, ২ ও ৩ আসনটিতে তারা ভূমিধস বিজয়ের অপেক্ষায় প্রহর গুনছেন।
অপর দিকে এর এক সপ্তাহ পর ১১ দলীয় জোট নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান একই স্থানে সমাবেশ করেছেন। এ জনসভায়ও বিপুল সংখ্যক নেতাকর্মীগণের পাশাপাশি মহিলাদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। ওই সমাবেশে জামায়াতের নেতারা গাজীপুরের ৫টি আসনেই বিজয় উপহার দেবেন বলে জানান।
গাজীপুর-১
কালিয়াকৈর উপজেলা এবং গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের তিনটি থানা নিয়ে গঠিত। এ আসনে মোট ভোটার ৭ লাখ ২০ হাজার ৯৩৯ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ৩ লাখ ৬০ হাজার ২৩৪ জন। আর নারী ভোটার ৩ লাখ ৬০ হাজার ৬৯৩ জন। হিজড়া ভোটার ১২ জন। এ আসনে প্রার্থী ৮জন।
এ আসনের সাধারণ ভোটার মাসুদ রানা বলেন, এ আসনে বিএনপির প্রার্থী মেয়র মজিবুর রহমান এলাকায় ব্যাপক জনপ্রিয়। তিনি প্রায় দুই দশক ধরে কালিয়াকৈর পৌরসভার মেয়র ছিলেন। তিনি বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য। এ আসনে বিএনপি থেকে অর্ধ ডজন নেতা দলীয় মনোনয়ন চেয়েছিলেন। এখন সবাই এক সাথে মিলেমিশে ধানের শীষের পক্ষে কাজ করছেন। আসনটিতে জয়ের ব্যাপারে বিএনপির প্রার্থীকেই ভোটারা এগিয়ে রাখছেন।
অপর দিকে ১১ দলীয় জোটের জামায়াতে ইসলামী দাঁড়িপাল্লার প্রার্থী মো. শাহ আলম বকশী ছিলেন সরকারের সাবেক সচিব। সরকারের সাবেক একজন কর্মকর্তা হওয়ার কারণে তিনি মোটামোটি এলাকায় পরিচিত। তার পক্ষে জামায়াতে ইসলামীসহ ১১ দলীয় জোটের নেতারা কাজ করে যাচ্ছেন। জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীরা এ আসনে জয়ের স্বপ্ন দেখছেন।
গাজীপুর-২
এ আসনটি গাজীপুরের ভিআইপি আসন হিসেবে মানুষ মনে করেন। এ আসনে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়সহ জেলার সকল সরকারি দপ্তর ও অধিকাংশ শিল্প কারখানা। আসনটিতে মোট ভোটার ৮ লাখ ৪ হাজার ৩৩৩ জন। এর মধ্যে পুরুষ ৪ লাখ ৪০২ জন, নারী ভোটার ৪ লাখ ৩ হাজার ৯১৮ জন, হিজড়া ভোটার ১৩ জন। আসনটিতে ১২জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
এখানে বিএনপির প্রার্থী এম. মঞ্জুরুল করিম রনি গাজীপুর মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের প্রতিষ্ঠাতা মেয়র সাবেক মন্ত্রী অধ্যাপক এম এ মান্নানের ছেলে। এখানে তার পিতার একটি বিশাল ভোট ব্যাংক রয়েছে। এছাড়া তার পক্ষে দলের সকল পর্যায়ের নেতাকর্মীরা কাজ করছেন। এ আসনেও এম মঞ্জুরুল করিম রনির ভূমিধস বিজয়ের দিনক্ষণ গুনছেন দলীয় নেতাকর্মীরা।
অপরদিকে এ আসনটিতে ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী জাতীয় নাগরিক পার্টির প্রার্থী দলটির কেন্দ্রীয় নেতা আলী নাছের খান। তার পক্ষে জামায়াতে ইসলামীসহ দলটির ১১দলীয় জোটের নেতাকর্মীরা কাজ করছেন এবং জামায়াত আমির রাজবাড়ি মাঠের জনসভায় তাকে জোটের প্রার্থী হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেন। তিনিও জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী।
গাজীপুর-৩
এ আসনটি শ্রীপুর উপজেলা ও সদর উপজেলার তিনটি ইউনিয়ন এবং নগরীর কিছু একাংশ নিয়ে গঠিত। আসনটিতে মোট ভোটার সংখ্যা ৫ লাখ ২৭ হাজার ৩৬০ জন। এর মধ্যে পুরুষ ২ লাখ ৬০ হাজার ১৯১ জন, নারী ভোটার ২ লাখ ৬৭ হাজার ১৬২ জন ও হিজড়া ভোটার ৭জন।
এ আসনে বিভিন্ন দলের প্রার্থী রয়েছেন ৭ জন। এ আসনে বিএনপি (ধানের শীষ) প্রার্থী দলটির কেন্দ্রীয় নেতা ডা. এসএম রফিকুল ইসলাম বাচ্চু। তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী ১১ দলীয় জোটের নেতা বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের (রিকশা প্রতিকের) প্রার্থী মুহাম্মদ এহসানুল হক ও বিএনপি থেকে বহিস্কৃত নেতা সদর উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান (ঘোড়া প্রতিকের) স্বতন্ত্র প্রার্থী ইজাদুর রহমান মিলন।
আসনটিতেও হাফ ডজন নেতা দলীয় মনোনয়ন চাইলেও এখন তারা সবাই ঐক্যবদ্ধ হয়ে ধানের শীষের পক্ষে কাজ করছেন। আসনটি শিল্প ও গ্রাম এলাকা নিয়ে গঠিত এবং আওয়ামী লীগের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। বিএনপির প্রার্থী ডা. রফিকুল ইসলাম বাচ্চু ক্লিন ইমেজের হওয়ায় তিনি ভোটের মাঠে এগিয়ে আছেন। দলমত নির্বিশেষে যারা ভোট দিতে যাবে তারা রফিকুল ইসলাম বাচ্চুকে এগিয়ে রাখছেন।
এছাড়া এ আসনে ১১ দলীয় জোটের রিকশা প্রতিকের প্রার্থী মুহাম্মদ এহসানুল হক এলাকায় খুব একটা পরিচিত মুখ না হওয়ায় তিনি ভাল অবস্থানে রয়েছে।
গাজীপুর-৪
কাপাসিয়া উপজেলা নিয়ে গাজীপুর-৪ আসন। এখানে মোট ভোটার ৩ লাখ ৩০ হাাজর ৯৭৭ জন। পুরুষ ভোটার ১ লাখ ৬৪ হাজার ৪২৯ জন, নারী ভোটার ১ লাখ ৬৬ হাজার ৫৪৮ জন। আসনটি আওয়ামী লীগের ভোট ব্যাংক হিসেবে পরিচিত। বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী বঙ্গতাজ তাজউদ্দিন আহমেদের বাড়ি এই কাপাসিয়ায়। আওয়ামী লীগের ভোট এ আসনে বিরাট ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়াবে বলে অনেকে মনে করছেন। তবে, আসনটিতে বিএনপি অনেক শক্তিশালী হলেও জামায়াতে ইসলামী এবার মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতায় চলে এসেছে। আসনটিতে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীকে বিজয়ী করতে ১১ দলীয় জোটের নেতারা সর্বশক্তি নিয়োগ করছে।
স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা গেছে, বিএনপির ধানের শীষের প্রার্থী সাবেক মন্ত্রী ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মরহুম হান্নান শাহের ছেলে গাজীপুর জেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক শাহ রিয়াজুল হান্নান পিতার আসনটি পুনরুদ্ধার করতে মরিয়া হয়ে কাজ করছেন। তার পিতার সময়ে কাপাসিয়ায় যে উন্নয়ন হয়েছে তা সাধারণ মানুষের সামনে আনছেন। দলীয় কোন্দল থাকলেও তিনি সকল পক্ষকে সাথে নিয়ে নির্বাচনি মাঠে ধানের শীষের পক্ষে প্রচার প্রচারণা করছেন।
স্থানীয়রা আরও জানায়, জামায়াতের প্রার্থী সালাহউদ্দিন আইয়ুবী ইসলামী ছাত্র শিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি। তিনি এলাকায় সুপরিচিত। অনেক আগে থেকেই তিনি এলাকার সাধারণ মানুষের সাথে যোগাযোগ রাখছেন। একজন সুবক্তা হিসেবে তার খ্যাতি রয়েছে। এ নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থীর সাথে তার মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে।
গাজীপুর ৫
কালীগঞ্জ উপজেলা, সদর উপজেলার বাড়িয়া ইউনিয়ন এবং গাজীপুর সিটি করপোরেশনের ৪০, ৪১ ও ৪২ নম্বর ওয়ার্ড) নিয়ে গঠিত এ আসন। এতে মোট ভোটার তিন লাখ ১৮ হাজার ৪৩০ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার এক লাখ ৬০ হাজার ৪৩৬ জন। নারী ভোটার এক লাখ ৫৭ হাজার ৯৯২ জন। আর তৃতীয় লিঙ্গের দুজন। এ আসনে ৭জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
তাদের মধ্যে বিএনপির প্রার্থী সাবেক এমপি একেএম ফজলুল হক মিলন (ধানের শীষ), বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর মো. খায়রুল হাসান (দাঁড়ি পাল্লা), ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের গাজী আতাউর রহমান (হাতপাখা) ও জনতার দলের আজম খান (কলম) এর মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বলে আভাস পাওয়া যাচ্ছে।
তবে, এ আসনে বিএনপির হেভিওয়েট প্রার্থী ফজলুল হক মিলনের অবস্থান সুসংগঠিত হলেও ওই দুইজন প্রার্থীর মুখমুখি লড়তে হবে। ফজলুল হক মিলন বিএনপি কেন্দ্রীয় নেতা এবং এ আসনে দুই বারের এমপি। তিনি ছিলেন ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি এবং সুবক্তা। এলাকায় রয়েছে তার একটি সু-সংগঠিত কর্মী বাহিনী। তিনি এলাকায় একক নেতৃত্ব ধরে রেখেছেন। এছাড়াও সাধারণ মানুষের সঙ্গে তার রয়েছে নিবিড় সম্পর্ক। তিনি এ আসনে জয়ের ব্যাপারে ব্যাপক আশাবাদী।
এ আসনে বাংলাদেশ জামায়াতের প্রার্থী খায়রুল হাসান দীর্ঘ দিন ধরে গণসংযোগ করে আসছেন। সাংগঠনিকভাবেও তারা সেখানে বেশ শক্তিশালী। তারা ভোটের জন্য মানুষের বাড়ি বাড়ি যাচ্ছেন এবং দাঁড়িপাল্লায় ভোট চাচ্ছেন।
খায়রুল হাসান জানান, এলাকার মানুষের যথেষ্ট সাড়া পাচ্ছেন আশা করি জনগণ এবকার দাঁড়িপাল্লায় ভোট দিবে।
এ আসনের আরেক প্রার্থী ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের কেন্দ্রী যুগ্ম মহাসচিব ও দলটির মুখপাত্র গাজী আতাউর রহমান। তিনিও এলাকায় ব্যাপক জনসংযোগ করে যাচ্ছেন। তাদের একটি শক্তিশালী সংগঠন রয়েছে। তারা নির্বাচনে ব্যাপক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে এবং নিজেদের প্রকৃত ইসলামী দল হিসেবে দাবি করে জনগণের কাছে যাচ্ছেন। জনগণ ইসলামের পক্ষে হাতপাখাকে বেছে নেবে বলে তারা আশা প্রকাশ করছেন।
গাজী আতাউর রহমান জানান, হাতপাখার পক্ষে ব্যাপক সমর্থন পাচ্ছি। সুষ্ঠু ভোট হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
এ আসনে জনতার দলের কলম প্রতিকের প্রার্থী দলটির কেন্দ্রীয় মহাসচিব আজম খান এবার প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
তিনি বলেন, জনগণের দল হিসেবে এলাকার মানুষ জনতার দলের কলম প্রতীকে ভোট দেবেন। কালীগঞ্জকে একটি পরিকল্পিত উন্নয়নের আওতায় আনতে চাই। যেখানে মাদক, সন্ত্রাস, নৈরাজ্য থাকবে না। আমরা চাই নতুন রাজনৈতিক দল এবং নতুন নেতারা উঠে আসুক।
বিএনপি প্রার্থী একেএম ফজলুল হক মিলন বলেন, বহুদিন পর দেশে গণতান্ত্রিক পরিবেশে নির্বাচন হতে চলেছে। যে নির্বাচনের জন্য সীমাহীন ত্যাগ আমরা স্বীকার করেছি। সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে গণমানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা হবে। আমি নির্বাচিত হলে আমার আসনের গণমানুষের সকল চাহিদা পূরণ করব।
তরুণ ভোটারদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, এবার অনেক ভোটার জীবনের প্রথম ভোট দেবেন। এসব তরুণ ভোটার অনেকটা সচেতন। তারা যোগ্য প্রার্থীকে গুরুত্ব দেবেন।
আসনটিতে জয়ের ব্যাপারে সাধারণ মানুষ ধানের শীষের প্রার্থী ফজলুল হক মিলনকে এগিয়ে রাখলেও তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখে পড়তে পারে অপর প্রতিদ্বন্দ্বী তিন প্রার্থীর সাথে। ফলে, এখানে চার প্রার্থীই জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী।


