সাতক্ষীরার সব আসনে পরাজয়ের কারণ খুঁজছেন বিএনপি নেতাকর্মীরা
মো. মুজাহিদুল ইসলাম, সাতক্ষীরা
প্রকাশ: ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৬:৫৯ পিএম
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
সাতক্ষীরার চারটি সংসদীয় আসনেই বিএনপি প্রার্থীদের পরাজিত করে বিশাল জয় পেয়েছে জামায়াতে ইসলামী। বিশৃঙ্খলা, সাংগঠনিক দুর্বলতা এবং অভ্যন্তরীণ কোন্দলকে দলটির এ বিপর্যয়ের প্রধান কারণ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর কিছু নেতাকর্মীর চাঁদাবাজি এবং সিন্ডিকেট গঠনের মতো অপরাধ দলের ভাবমূর্তি দারুণভাবে নষ্ট করেছে। এছাড়া নারী ভোটারদের নিজেদের পক্ষে টানতে না পারাও বিএনপির জন্য একটি বড় পরাজয়ের কারণ হয়েছে। বিদ্রোহী প্রার্থী এবং সমন্বয়হীনতায় দলটির এই বিপর্যয়কে পুরোপুরি নিশ্চিত করেছে।
সাতক্ষীরার নির্বাচনি ফলাফলে দেখা গেছে, জেলার চারটি আসনেই জামায়াতের প্রার্থীরা নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জন করেছেন।
সাতক্ষীরা-১ (তালা-কলারোয়া) আসনে জামায়াতের অধ্যক্ষ মো. ইজ্জত উল্লাহ পেয়েছেন ১ লাখ ৯৩ হাজার ৭৭২ ভোট। বিএনপির হাবিবুল ইসলাম হাবিব পেয়েছেন ১ লাখ ৬৯ হাজার ৯৯৫ ভোট। ব্যবধান ২৩ হাজার ৭৭৭ ভোট। ভোট পড়েছে ৭৫ দশমিক ৬৪ শতাংশ। এখানে বিএনপি উল্লেখযোগ্য ভোট পেলেও ইউনিয়নভিত্তিক সংগঠন ও কেন্দ্র ব্যবস্থাপনায় জামায়াত এগিয়ে ছিল বলে স্থানীয়রা মনে করছেন।
সাতক্ষীরা-২ (সদর-দেবহাটা) সবচেয়ে বড় ব্যবধানে জামায়াতের জয় এসেছে এ আসনে। দাঁড়িপাল্লার প্রার্থী মুহাদ্দিস আব্দুল খালেক পেয়েছেন ২ লাখ ৬৬ হাজার ৯৫৯ ভোট। বিএনপির মো. আব্দুর রউফ পেয়েছেন ১ লাখ ১৬ হাজার ২২৯ ভোট। ব্যবধান ১ লাখ ৫০ হাজার ৬৬৬। ভোট পড়েছে ৭৩ দশমিক ৭৯ শতাংশ। সদর এলাকায় জামায়াতের দীর্ঘদিনের সামাজিক ও ধর্মভিত্তিক সাংগঠনিক নেটওয়ার্ক তাদের শক্ত ভিত তৈরি করেছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকেরা।
সাতক্ষীরা-৩ (আশাশুনি-কালীগঞ্জ) এ আসনে ফলাফলে বড় ভূমিকা রেখেছে বিদ্রোহী প্রার্থী। জামায়াতের হাফেজ মুহা. রবিউল বাসার পেয়েছেন ১ লাখ ৮৪ হাজার ২৩৩ ভোট। স্বতন্ত্র প্রার্থী ডা. শহিদুল আলম পেয়েছেন ১ লাখ ৫ হাজার ৩৮৯ ভোট। বিএনপির কাজী আলাউদ্দিন পেয়েছেন ৫৬ হাজার ৮১৯ ভোট। বিজয়ী ও নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বীর ব্যবধান ৭৮ হাজার ৮৪৪। ভোট পড়েছে ৭০ দশমিক ৯৯ শতাংশ।
স্থানীয় বিশ্লেষণে দেখা যায়, কালীগঞ্জ উপজেলায় বিএনপির দুই প্রভাবশালী নেতা প্রার্থী হওয়ায় ভোট বিভক্ত হয়েছে। ডা. শহিদুল আলমের প্রাপ্ত ভোটের বড় অংশ বিএনপির ঐতিহ্যগত সমর্থকগোষ্ঠী থেকে এসেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ফলে সম্ভাবনাময় আসনটি হাতছাড়া হয় বিএনপির।
সাতক্ষীরা-৪ (শ্যামনগর) আসনে জামায়াতের গাজী নজরুল ইসলাম পেয়েছেন ১ লাখ ৬ হাজার ৯১৩ ভোট। বিএনপির ড. মো. মনিরুজ্জামান পেয়েছেন ৮৫ হাজার ৪২৬ ভোট। ব্যবধান ২১ হাজার ৪৮৭। ভোট পড়েছে ৬৭ দশমিক ৭৬ শতাংশ। সুন্দরবনসংলগ্ন এই আসনে জলবায়ু, উপকূল রক্ষা ও অবকাঠামো উন্নয়ন বড় ইস্যু ছিল। ভোটারদের একাংশ মনে করেন, জামায়াত প্রার্থী মাঠে নিয়মিত উপস্থিত থেকে সংগঠিত প্রচার চালিয়েছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে ৫ আগস্টের পরবর্তী সময়ে বিএনপির কিছু নেতাকর্মীর বিতর্কিত কর্মকাণ্ড ভোটারদের মনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। বিশেষ করে বিভিন্ন স্থানে দখল, হামলা ও লুটপাটের অভিযোগ এবং চিংড়ি ও বালু সিন্ডিকেট নিয়ে অস্থিরতা সাধারণ মানুষের কাছে দলের গ্রহণযোগ্যতা কমিয়েছে।
অন্যদিকে জামায়াত অনেক আগে থেকেই সুসংগঠিতভাবে প্রচার চালিয়ে নারী ভোটারদের মন জয় করতে সক্ষম হয়েছে।
পরাজয়ের বিষয়ে জেলা বিএনপির সদস্য সচিব আবু জাহিদ জানান-জেলার ৪টি আসনে প্রার্থী মনোনয়নে দেরি হওয়া এবং অভ্যন্তরীণ সমস্যা মেটাতে সময় নষ্ট হওয়া তাদের বিপর্যয়ের অন্যতম কারণ।
তিনি স্বীকার করেন, ৩ ডিসেম্বর মনোনয়ন শুরু হলেও ২৭ ডিসেম্বর তা চূড়ান্ত হওয়ায় প্রচারের জন্য যথেষ্ট সময় পাওয়া যায়নি।
বর্তমানে সাতক্ষীরা জেলাজুড়ে জামায়াত শিবিরে উৎসবের আমেজ চললেও বিএনপিতে বিরাজ করছে চরম হতাশা। সব নেতাকর্মী ও সমর্থকরা পরাজয়ের কারণ খুঁজছেন।
