সমুদ্রপথে মাছের ট্রলারে আসে মাদক
কুয়াকাটার সাগরপারে ইয়াবার হাট-বাজার
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
মাদকে ডুবে আছে দেশের অন্যতম পর্যটনকেন্দ্র সাগরপারের কুয়াকাটা। হাত বাড়লেই সেখানে মিলছে অবৈধ মাদক ইয়াবা। সীমান্ত থেকে এই মাদক এনে বাণিজ্য করছে একশ্রেণির স্থানীয় প্রভাবশালী। যাদের অধিকাংশই জড়িত ক্ষমতাসীন দলের সাথে। বিষয়টি নিয়ে একদিকে যেমন চলছে তোলপাড় তেমনি পর্যটন শিল্পেও পড়ছে বিরূপ প্রভাব। বিভিন্ন আবাসিক হোটেলের কক্ষ দখল করে ইয়াবা সেবন আর বাণিজ্যে বিরক্ত পর্যটকরা। শুধু তাই নয়, রাজনৈতিক নেতাদের ইয়াবা সেবনের ভিডিও আর পাইকারি/খুচরা দর নিয়ে মোবাইলে কথোপকথনের স্ক্রিনশট ভাইরাল পর্যন্ত হয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। মাদকসহ আটক হয়ে কারাগারেও গেছেন কয়েকজন। কিন্তু নিয়ন্ত্রণে আসছে না পর্যটনকেন্দ্রে মাদকের এই অবাধ বাণিজ্য, যা নিয়ে চরম উদ্বেগে স্থানীয় বাসিন্দাসহ পর্যটন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা।
কুয়াকাটার অবস্থান পটুয়াখালীর সর্বদক্ষিণে থাকা কলাপাড়া উপজেলায়। এই উপজেলাতেই রয়েছে দেশের তৃতীয় সমুদ্রবন্দর ‘পায়রা’। উপজেলা প্রশাসন, পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, এই ৩ এলাকাতেই বর্তমানে চলছে মাদক ইয়াবার রমরমা বাণিজ্য। যা নিয়ন্ত্রণ করছেন ক্ষমতাসীন দলের অঙ্গ সহযোগী সংগঠনের কয়েকজন নেতা। এদের মধ্যে পুলিশের হাতে ধরার পর ৬-৭ জনকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। কিন্তু বন্ধ হচ্ছে না মাদকের কারবার।
পর্যটন বাণিজ্যে যুক্ত কুয়াকাটার একাধিক ব্যবসায়ী বলেন, ‘মাদকের এই ব্যবসা এখানে নতুন নয়। সমুদ্রপথে মাছের ট্রলারে করে আনা হয় ইয়াবা। সড়কপথে কিছু চালান এলেও তার পরিমাণ খুব একটা বেশি নয়। সমুদ্রে নজরদারি আর পাহারা কম হওয়ায় ট্রলারে করে চালান আনাতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্য পায় মাদক ব্যবসায়ীরা। প্রায় প্রতিদিনই এভাবে সীমান্ত এলাকা থেকে আসে চালান। ৫ আগস্টের আগে এটা নিয়ন্ত্রণ করত স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতারা। বর্তমানে তা দখলে বিএনপির। পাইকারি দরে এনে এখানে মোটা লাভে ইয়াবা বিক্রি করে তারা। এর সাথে কলাপাড়া-কুয়াকাটার অন্তত ১৫-২০ জন জড়িত। মোবাইল ফোনে যোগাযোগে চলে ব্যবসা। পুরো উপজেলায় মাদকের প্রধান ডিলার আছে ৬ থেকে ৭ জন। সাব ডিলার আর খুচরা বিক্রেতাদের মাধ্যমে চলে মাদক সরবরাহ। স্থানীয় তরুণ আর কিশোররাই কেবল নয়, একশ্রেণির পর্যটকও মাদক সংগ্রহ করে তাদের কাছ থেকে।
পাইকারি রেটে এনে খুচরা দরে ইয়াবা বিক্রির বিষয়টি সম্প্রতি প্রকাশ্যে আসে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ফাঁস হওয়ার কয়েকটি স্ক্রিনশটে। হোম ডেলিভারির মাধ্যমে ক্রেতার বাড়িতে কিংবা হোটেল কক্ষে ইয়াবা পৌঁছে দেয়ার প্রমাণও মেলে সেখানে। দৈনিক যুগান্তরের হাতে আসা ওই স্ক্রিনশটে দেখা যায়, উপজেলার চম্পাপুর ইউনিয়ন ছাত্রদলের সভাপতি ইমতাজুর রহমান কোয়েল মৃধা ইয়াবার বুকিং দিচ্ছেন ইয়াবার হোল সেলারদের কাছে। সেখানে অগ্রিম বুকিং বাবদ দরদাম, কিভাবে ইয়াবা ডেলিভারি দেওয়া হবে আর প্রতি পিসের মূল্য নিয়ে আলোচনা করছেন তিনি। পর্যটনকেন্দ্র কুয়াকাটার খুব কাছেই থাকা একটি ইউনিয়ন এই চম্পাপুর। ধারণা করা হচ্ছে, স্থানীয় ডিলার হিসাবে ইয়াবা এনে উপজেলা শহর, পায়রা সমুদ্রবন্দর আর পর্যটনকেন্দ্র কুয়াকাটায় সরবরাহ করেন কোয়েল। বিষয়টি সম্পর্কে জানতে তার মোবাইলে ফোন দেওয়া হলে তা বন্ধ পাওয়া যায়।
গ্রাহক পর্যায়ে ইয়াবা পৌঁছে দেওয়ার বিনিময়ে টাকা পান এমন একজন বলেন, ‘সাগরপাড়ে ঘুরতে আসা পর্যটকদের কাছেও বিক্রি করা হয় ইয়াবা।’ আসক্তদের কিভাবে শনাক্ত করেন জানতে চাইলে পরিচয় গোপন রাখার শর্তে ওই তরুণ বলেন, ‘প্রথমত আমরা চেহারা দেখলেই বুঝতে পারি যে কে আসক্ত আর কে নয়। তাছাড়া কিছু কমন কোড ওয়ার্ড ব্যবহার করা হয়। ওই শব্দ করে পর্যটকদের পাশে ঘুরলেই যারা আসক্ত তারা সাড়া দেয়।’ এই তরুণের কাছ থেকেই মেলে ইয়াবার ডিলার রেট থেকে মাঠ পর্যায় পর্যন্ত দরের চিত্র। মূল ডিলাররা প্রতি পিস ইয়াবা দেন ৫০ টাকা। তা কিনে আনেন কলাপাড়া-কুয়াকাটার ডিলাররা। পরে প্রতি পিস ১৮০ থেকে ২০০ টাকা করে বিক্রি হয় সাব ডিলারদের কাছে। সাব ডিলাররা গ্রাহকের কাছে বিক্রি করেন ৩০০ থেকে ৪০০ টাকায়। ইয়াবার এই ব্যবসা এতটাই লাভজনক যে, পুরুষের পাশাপাশি কিছু নারীও জড়িয়ে পড়েছেন এই অবৈধ আয়ে। অবশ্য তারা থাকেন সরবরাহকারী পর্যায়ে। প্রতি পিস ইয়াবা গ্রাহকের হাতে পৌঁছে দিতে ২৫ থেকে ৩০ টাকা করে পান তারা। দিনে ৫০ পিস পৌঁছে দিতে পারলেই মেলে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা। ফলে অনেকেই নেমে পড়েছেন জমজমাট এই ব্যবসায়। পরিচয় গোপন রাখার শর্তে আরেক সরবরাহকারী বলেন, ‘কুয়াকাটা পর্যটনকেন্দ্রে যারা এই ইয়াবা ছড়িয়ে দেন তাদের অনেকেরই যোগাযোগ আছে থানা পুলিশের সাথে। ট্যুরিস্ট পুলিশের একটি অংশও জানে সব কিছু। নিয়মিত মাসোহারা আর নির্দিষ্ট চুক্তির কারণে সব দেখেও না দেখার ভান করেন তারা। ফলে অবাধেই চলে ইয়াবার ব্যবসা।’
কুয়াকাটায় ইয়াবা যে কতটা ভয়াবহতা ছড়িয়েছে তার প্রমান মেলে সম্প্রতি ছড়িয়ে পড়া বেশ কিছু ভিডিওতে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ওইসব ভিডিওতে দেখা যায় রাজনৈতিক নেতাদের ইয়াবা সেবনের দৃশ্য। উপজেলার ডালবুগঞ্জ ইউনিয়ন যুবদলের সাধারণ সম্পাদক রেদওয়ানের ভাই কালাম কাজী এবং ভাতিজা আরিফ কাজীর ইয়াবা সেবনের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর অভিযোগ ওঠে যে, রেদওয়ান কাজীও জড়িত এই অবৈধ ব্যবসায়। যদিও রেদওয়ান সেই অভিযোগ স্বীকার করেননি। এর কয়েক দিনের মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ায় কুয়াকাটা পৌর মৎস্যজীবী দলের সাধারণ সম্পাদক আবু সালেহর ইয়াবা সেবনের ভিডিও। পর্যটনকেন্দ্রের একটি আবাসিক হোটেলের কক্ষে ওই ইয়াবা সেবন করছিলেন তিনি। এর কয়েক দিন আগে বালিয়াতলী ইউনিয়ন স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম আহ্বায়ক মুরাদ হোসেনকে ইয়াবাসহ আটক করে পুলিশ। পরে ভ্রাম্যমাণ আদালত তাকে এক মাসের কারাদণ্ড ও আর্থিক জড়িমানা করেন। এছাড়া ইয়াবাসহ আটক হওয়ার পর আর্থিক চুক্তিতে ছেড়ে দেওয়ার ঘটনাও রয়েছে অন্তত ৬টি। আটক হওয়া ওই ৬ জনও বিএনপির বিভিন্ন অঙ্গ সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মী।
কলাপাড়া উপজেলা বিএনপির সভাপতি হাজী হুমায়ুন সিকদার বলেন, কোনো মাদক ব্যবসায়ী কিংবা মাদকাসক্তের সাথে আমাদের যেমন সম্পর্ক নেই তেমনি দলেও তাদের কোনো প্রয়োজন নেই। আমরা পুলিশ প্রশাসনকেও বলেছি, এদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে। কুয়াকাটা পৌর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মতিউর রহমান বলেন, ‘পর্যটনকেন্দ্রকে মাদকমুক্ত করতে সর্বোচ্চ কঠোর অবস্থানে রয়েছি আমরা। মাদকসংশ্লিষ্টতায় কয়েকজনকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। কুয়াকাটায় মাদক কিংবা মাদক ব্যবসার কোনো অস্তিত্ব রাখা হবে না।’
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর কলাপাড়া অফিসের পরিদর্শক শাহিনুল কবির জানান, ‘গত ৬ মাসে কলাপাড়া উপজেলায় ৩৩৬টি মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালিত হয়েছে। এতে ১১০ জনের বিরুদ্ধে হয়েছে ১০৯টি মামলা। এসব অভিযানে এক হাজার পিসের বেশি ইয়াবা ও ১০ কেজি গাঁজা উদ্ধার হয়েছে। এছাড়া ৮৭ জনকে গ্রেফতারের পর দেয়া হয়েছে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড।’
কলাপাড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রবিউল ইসলাম বলেন, ‘সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওর লিংকগুলো পাঠান। দেখে বলতে পারব কি হয়েছে না হয়েছে।’ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কাউছার হামিদ বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় মাদকের বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। আমাদের এমপি মহোদয়েরও এ ব্যাপারে কঠোর নির্দেশনা রয়েছে। মাদকের সাথে সম্পৃক্ত ব্যক্তির পারিবারিক কিংবা রাজনৈতিক পরিচয় আমাদের কাছে মুখ্য নয়। তাদের আইনের আওতায় এনে বিচারের প্রক্রিয়া চলছে।’

