Logo
Logo
×

সারাদেশ

পাবনায় লিচুর বাম্পার ফলন, ৮শ কোটি টাকা আয়ের আশাবাদ

Icon

আখতারুজ্জামান আখতার, পাবনা

প্রকাশ: ০৩ জুন ২০২৬, ০৮:৩২ পিএম

পাবনায় লিচুর বাম্পার ফলন, ৮শ কোটি টাকা আয়ের আশাবাদ

কেউ গাছ থেকে লিচু ভাঙছেন, কেউ বা পাতা থেকে লিচু ছাড়িয়ে ভরছেন কার্টনে বা লটে। আবার ব্যাপারীরা এসে ট্রাকসহ নানা যানবাহনে করে দূর-দূরান্তে নিয়ে যাচ্ছেন কার্টনভর্তি লিচু। এভাবেই লিচুর ভরা মৌসুমে মালিক-শ্রমিক বা ব্যাপারী সবাই ব্যস্ত সময় পার করছেন।

এটি হলো পাবনার ঈশ্বরদীর লিচু বাগানের ও লিচু হাটের বর্তমান চিত্র।

কৃষি বিভাগ ও লিচু চাষি সূত্রমতে, শস্যভাণ্ডার খ্যাত পাবনায় এ বছর লিচুর বাম্পার ফলন হয়েছে। চাষিদের ভাষায় এ বছর লিচুর ‘অন এয়ার’ হওয়ায় লিচু গাছে আশাতীত ফল ধরে। ঈদের এক সপ্তাহ আগে থেকে স্থানীয় মোজাফ্ফারীবাদ বা আঁটি লিচু ভাঙা হয়। এখন বোম্বাই ও চায়না-৩ জাতের লিচুর ভরা মৌসুম। অত্যন্ত লোভনীয় রং সুস্বাদ টসটসে পাবনার বোম্বাই লিচুর চাহিদা শিশু-বৃদ্ধসহ সব বয়সের মানুষের কাছেই।

এদিকে এ বছর লিচু থেকে কমপক্ষে ৮শ কোটি টাকা আয় হতে পারে বলে পাবনার চাষি এবং কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ আশা করছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, অন্যান্য ফসলের মতো সাম্প্রতিককালে পাবনায় লিচু আবাদে শুধু চমকই নয়, বরং দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম লিচু উৎপাদনকারী জেলা হিসেবে পাবনা পরিচিতি পায়।

লিচু চাষিদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, নব্বই দশক থেকে পাবনার ঈশ্বরদীতে সীমিত আকারে লিচুর চাষ শুরু হয়। দিনে দিনে এই লিচু চাষ এখন পুরো জেলায় বিস্তৃত হয়েছে। এক কথায় এখন লিচুতে বিপ্লব ঘটেছে পাবনায়। লিচু চাষে সাফল্যের মাধ্যমে পাবনায় ভাগ্য বদলেছে অনেক প্রান্তিক কৃষকেরও। কাজেই এ এলাকায় অনেক কৃষকের স্বপ্নের আরেক নাম লিচু।

পাবনার সফল কৃষকদের পাইওনিয়ার এবং কৃষিতে তিনবার রাষ্ট্রীয় পদকপ্রাপ্ত কৃষক শাহজাহান আলী ওরফে পেঁপে বাদশা জানান, প্রথম দিকে পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলার জয়নগর, মানিকনগর এবং মিরকামারি এলাকায় লিচু চাষ শুরু হয়। এখন ঈশ্বরদী, আটঘরিয়া, চাটমোহর, পাবনা সদরসহ জেলার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ব্যাপকভাবে লিচু চাষ হচ্ছে।

তিনি বলেন, গত এক দশকে পদ্মার চরাঞ্চলে শত শত বিঘা লিচু বাগান গড়ে তোলা হয়েছে। ঈশ্বরদীর কামালপুরের চরে ৪০-৫০ বিঘা করে একেকটি বাগান গড়ে তোলা হয়েছে। অনেক খ্যাতিমান এবং ধনাঢ্য কৃষক এই লিচু চাষে এখন পুঁজি বিনিয়োগ করেছেন। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের তথ্য মতে প্রতিবছর জেলায় গড়ে সাড়ে ৪ হাজার থেকে ৫ হাজার হেক্টর জমিতে লিচু চাষ হয়ে থাকে।

এ বছর আবাদ হয়েছে ৪ হাজার ৭২৩ হেক্টর জমিতে। এর মধ্যে শুধুমাত্র ঈশ্বরদীতে আবাদ হয়েছে ৩ হাজার হেক্টর। তবে ঈশ্বরদীতে প্রকৃতপক্ষে আরও বেশি জমিতে লিচু আবাদ হয়ে থাকে বলে জানান চাষিরা।

চাষিরা জানান, প্রতি বছর লিচু চাষ করে গড়ে ৬শ থেকে ৭শ কোটি টাকার লিচু বিক্রি হয়ে থাকে। এ বছর অন এয়ার হওয়ায় লিচুর বাম্পার ফলন হয়েছে। এতে কমপক্ষে ৮শ কোটি টাকার লিচু বিক্রির আশা করা হচ্ছে।

কৃষি বিভাগ এবং প্রতিষ্ঠিত লিচু চাষিদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যে জানা গেছে, জেলার ঈশ্বরদী ছাড়াও সদরে, চাটমোহর,আটঘরিয়া, সুজানগরসহ কয়েকটি উপজেলায় কমবেশি লিচু চাষ হয়েছে। চাষিরা সবচেয়ে বেশি আবাদ করছেন বোম্বাই জাতের লিচু।

মূলত ঈশ্বরদীর বোম্বাই লিচুর কদর দেশ জোড়া। অন্যান্য জাতের মধ্যে বেদানা, কদমী, দেশি আঁটি বা মোজাফফরী, চায়না-থ্রি, ইত্যাদি। ঈশ্বরদী উপজেলার সলিমপুর, সাহাপুর, দাশুরিয়া এবং লক্ষীকুন্ডা ইউনিয়নসহ এ উপজেলায় অন্তত ২৫ হাজার লিচু চাষি রয়েছেন। এসব এলাকার এমন কোনো বাড়ি নেই, যে বাড়িতে অন্তত দুটি লিচু গাছ নেই।

পাবনার ঈশ্বরদীর কয়েকজন প্রখ্যাত লিচু চাষি হলেন, কেতাব মণ্ডল ওরফে লিচু কেতাব, রিয়াজ সর্দার, মনির সর্দার, মুকুল, নজরুল ইসলাম, মোজাম্মেল মাস্টার (রাষ্ট্রপতি কৃষি স্বর্ণপদকপ্রাপ্ত) হাবিবুর রহমান রঞ্জু, ময়েজ উদ্দিন, আব্দুল বারী প্রমুখ।

লিচু চাষি কেতাব মণ্ডল ওরফে লিচু কেতাব জানান, এ অঞ্চলে আগে সনাতন পদ্ধতিতে লিচু চাষ হতো বা প্রাকৃতিকভাবে বাড়িতে লিচুর গাছে লিচু পাওয়া যেত। কিন্তু বাণিজ্যিক ভিত্তিতে ৮৩-৮৪ সাল থেকে শুরু হয় এর সম্প্রসারণ এবং ১৯৯০ সাল থেকে তা ব্যাপক আকারে চাষ হয়। এখন তা এক অর্থনৈতিক বিপ্লবে পরিণত হয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এ বছর লিচুর বাম্পার ফলন হয়েছে। মালিক-শ্রমিক এবং ব্যাপারী সবাই এখন লিচু নিরয়ে ব্যস্ত সময় পার করছেন।

বাগান থেকে ১০০ লিচু ২৫০ থেকে মান ভেদে ৩৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। খুচরা বাজারে আরও বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। আর এক থেকে সর্বোচ্চ দুই সপ্তাহ লিচু পাওয়া যাবে।

এদিকে ভরা মৌসুমে ঈশ্বরদীসহ জেলার বিভিন্ন স্থানে লিচুর হাট বা আড়ত গড়ে উঠেছে। লিচু বাগানে অসংখ্য নারী-পুরুষ দিনরাত লিচু ভাঙ্গা ও প্যাকেটজাত করাসহ নানা কাজে মহাব্যস্ত।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপপরিচালক জাহাঙ্গীর আলম প্রামাণিক বলেন, এবছর বাম্পার ফলন হয়েছে। এ বছর ৩৫ হাজার মেট্রিক টন লিচু উৎপাদন হবে এবং কমপক্ষে ৮শ কোটি টাকার লিচু বিক্রি হতে পারে বলে ধারণা করছি। পাবনার লিচু শুধু দেশে নয় ব্যক্তিগত উদ্যোগে কিছু কিছু লিচু বিদেশেও পাঠানো হয়।

চাষিদের অজ্ঞতার কারণে লিচুর মান নিয়ন্ত্রণ করতে না পারায় এবং লিচু সংরক্ষণের অভাবে দেশের বাইরে ব্যাপকভাবে পাঠানো সম্ভব হয় না। এজন্য দীর্ঘদিন ধরে লিচু চাষিরা এখানে বিশেষায়িত লিচু সংরক্ষণাগার বা প্রক্রিয়াজাত কেন্দ্র স্থাপনের দাবি জানিয়ে আসছেন।

ঈশ্বরদীর প্রখ্যাত ও রাষ্ট্রীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত কৃষক সিদ্দিকুর রহমান ময়েজ ওরফে কুল ময়েজ বলেন, লিচু গাছ থেকে পারা শুরু করলে ১৫ থেকে মাত্র ২০ দিন পর্যন্ত তা গাছে থাকতে পারে। এ সময়ের মধ্যে লিচু বাজারজাত না করতে পারলে তা বিনষ্ট হয়। এজন্য দীর্ঘদিন ধরে ঈশ্বরদীর লিচুচাষিরা এখানে একটি লিচু সংরক্ষণাগার প্রতিষ্ঠার দাবি করে আসছেন।

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম