গাজীপুর-জামালপুরের ডিসির উদ্যোগে পথহারা অভিমানী দুবোন ফিরল ঘরে
যুগান্তর ডেস্ক
প্রকাশ: ০৩ জুন ২০২৬, ১১:১০ পিএম
গাজীপুর-জামালপুরের ডিসির উদ্যোগে পথহারা অভিমানী দুবোন ফিরল ঘরে
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
শনিবারের সকালটা আর দশটা দিনের মতোই হতে পারত; কিন্তু গাজীপুরের শ্রীপুরে পূর্ব নিজ মাওনা গ্রামের সোহেল রানার ঘরে সেদিন নেমে এসেছিল এক জমাট বাঁধা অন্ধকার। ১৪ বছরের সানজিদা আর ১৩ বছরের আতিয়া—পিঠাপিঠি দুই বোন হঠাৎ করেই উধাও।
অভিমানী দুই বোনের এই নিখোঁজ হওয়ার পেছনে কোনো পারিবারিক কলহ ছিল না, ছিল ভার্চুয়াল দুনিয়ার এক ভয়ঙ্কর প্রলোভন। এক টিকটকারের রঙিন কথার ফাঁদে পা দিয়ে, মা-বাবার ওপর সামান্য অভিমানে, নিজেদের চিরচেনা গ্রাম ছেড়ে অজানা পথের উদ্দেশ্যে পা বাড়িয়েছিল তারা।
কিন্তু পর্দার ভেতরের সেই রঙিন দুনিয়ার বাস্তবতা যে কতটা নির্মম ও অচেনা, তা বুঝতে কিশোরী দুটির বেশি সময় লাগেনি। পথ ভুলে তারা যখন দিগ্বিদিকশূন্য, তখন তাদের ঠিকানা হয় নিজ জেলা থেকে বহুদূরের জামালপুরে।
নিশ্চিত কোনো বিপদের মুখে পড়ার আগেই এই দুই বোনের জীবনে দেবদূতের মতো হাজির হন জাহাঙ্গীর আলম নামের এক ফেসবুক ব্যবহারকারী। মেয়ে দুটির অসহায়ত্ব দেখে তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি মানবিক পোস্ট দেন।
তিনি লেখেন- পথ ভুলে চলে আসা এই মেয়ে দুটিকে আমরা পেয়েছি... তারা দুই বোন। কোনো কারণে তারা কারো মোবাইল নম্বর বলছে না অথবা মনে করতে পারছে না। মেয়ে দুটি এখন জামালপুর অপরাজেয় বাংলাদেশের শেল্টার হোমে আছে। অনুগ্রহ করে মাওনা-গাজীপুর এলাকার কোনো বন্ধু যদি ঠিকানা খুঁজে দিতে পারতেন তাহলে মেয়ে দুটি তাদের বাবা-মায়ের কাছে ফেরত যেতে পারত। বন্ধুরা বেশি বেশি শেয়ার করুন...’।
পোস্টটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং এক সময় তা নজরে আসে জামালপুরের জেলা প্রশাসক (ডিসি) মোহাম্মদ ইউসুফের। ফেসবুকের এই আর্তির সূত্র ধরেই তিনি কালক্ষেপণ না করে মেয়ে দুটির প্রকৃত ঠিকানা খুঁজে বের করার উদ্যোগ নেন।
জামালপুরের ডিসি তাৎক্ষণিকভাবে যোগাযোগ করেন গাজীপুরের জেলা প্রশাসক নূরুল করিম ভূঁইয়ার সাথে। ঘরের মেয়েদের ঘরে ফেরাতে এরপর শুরু হয় এক যৌথ ও দ্রুতগতির প্রশাসনিক তৎপরতা।
গাজীপুরের ডিসি নূরুল করিম ভূঁইয়া বিষয়টি জানার পরপরই শ্রীপুরের উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) নাহিদ ভূঁইয়াকে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন। ইউএনও নাহিদ ভূঁইয়া দ্রুততার সঙ্গে ফরাজিপাড়া ও বিএনপি বাজারসংলগ্ন পূর্ব নিজ মাওনা গ্রামে খোঁজ নিয়ে মেয়ে দুটির নাম-ঠিকানা নিশ্চিত করেন।
সানজিদা ও আতিয়ার হতদরিদ্র পিতা-মাতাকে ডেকে এনে মেয়েদের অবস্থান নিশ্চিত করা হয়। সন্তানদের বেঁচে থাকার এবং নিরাপদে থাকার খবর পেয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন ভাগ্যহত সেই মা-বাবা।
অবশেষে মঙ্গলবার, নিখোঁজ হওয়ার ঠিক দুই দিন পর, দুই জেলা প্রশাসকের বিশেষ ব্যবস্থাপনায় সানজিদা ও আতিয়াকে তাদের মা-বাবার কোলে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে। জামালপুরের ‘অপরাজেয় বাংলাদেশ’ শেল্টার হোম থেকে বিশেষ সুরক্ষায় তাদের গাজীপুরে এনে মা-বাবার হাতে তুলে দেওয়া হয়। বুকে জড়িয়ে ধরে সন্তানদের ফিরে পাওয়ার সেই আবেগঘন দৃশ্য উপস্থিত সবার চোখেই জল এনে দেয়।
গাজীপুরের জেলা প্রশাসক মো. নূরুল করিম ভূঁইয়া স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বলেন, আল্লাহর অশেষ মেহেরবানী, এ দুই অভিমানী মেয়ের কোনো ক্ষতি হয়নি। অপরাজেয় বাংলা শেল্টার হোমে তারা সম্পূর্ণ নিরাপদ ছিল এবং তাদের বেশিদূর পথহারা হতে হয়নি। তবে এ ধরনের ঘটনা আমাদের বারবার অভিভাবক সচেতনতার গুরুত্ব স্মরণ করিয়ে দেয়।
তবে শুধু ফিরিয়ে দিয়েই প্রশাসন তাদের দায়িত্ব শেষ করেনি। এই দরিদ্র পরিবারের মেয়ে দুটির পড়াশোনা যাতে অর্থের অভাবে বন্ধ না হয়, সেজন্য শ্রীপুরের ইউএনওকে সানজিদা ও আতিয়ার যাবতীয় পড়াশোনার ব্যবস্থা গ্রহণ করারও নির্দেশনা দিয়েছেন গাজীপুরের ডিসি।
সানজিদা ও আতিয়া ভাগ্যবতী, কারণ তারা কোনো মানবপাচারকারী বা অপরাধ চক্রের হাতে পড়ার আগেই নিরাপদ আশ্রয়ে পৌঁছাতে পেরেছিল; কিন্তু প্রতিদিন কত শিশু-কিশোরী এভাবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রলোভনে পড়ে আর কখনো ফিরে আসে না, তার হিসাব মেলানো কঠিন।
এ ঘটনা আমাদের সমাজের সামনে কিছু জরুরি বার্তা রেখে গেছে। অভিভাবকদের ডিজিটাল নজরদারি বিষয়টি। বিশেষ করে সন্তানরা ইন্টারনেটে বা স্মার্টফোনে কী করছে, কার সঙ্গে মিশছে, সেদিকে কঠোর নজরদারি প্রয়োজন। এছাড়াও ভার্চুয়াল ফাঁদ বনাম সচেতনতা বিষয়ক প্রচারণা দরকার কারণ টিকটক, লাইকি বা ফেসবুকের মতো প্ল্যাটফর্মে অপরিচিত মানুষের প্রলোভন যে কতটা বিপজ্জনক হতে পারে, তা সন্তানদের বোঝাতে হবে।
এসবের বাইরে সোশ্যাল মিডিয়ার ইতিবাচক শক্তিকেও আমরা অস্বীকার করতে পারছিনা; যেমন জাহাঙ্গীর আলমের একটি ফেসবুক পোস্ট এবং নেটিজেনদের শেয়ারের কারণেই আজ একটি পরিবার ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা পেয়েছে। প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার এভাবেই জীবন বাঁচাতে পারে।
অভিমান কিংবা রঙিন দুনিয়ার মোহ—কোনো কিছুই যেন আমাদের সন্তানদের অন্ধকারের দিকে ঠেলে না দেয়। সানজিদা আর আতিয়ার ঘরে ফেরা হোক অন্য সব অসচেতন পরিবারের জন্য এক বড় সতর্কবার্তা।
