পাশের আশায় শিক্ষককে ডাকলেন বাবা, ছাত্রীর উত্তরপত্র ভাইরাল
হাতিয়া (নোয়াখালী) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ০৭ জুলাই ২০২৬, ১০:৫৯ পিএম
পাশের আশায় শিক্ষককে ডাকলেন বাবা, ছাত্রীর উত্তরপত্র ভাইরাল
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
পরীক্ষার খাতায় প্রশ্নের উত্তর নেই, তার বদলে ভুল বানানে ভরা অসংলগ্ন কিছু বাক্য। আর খাতার নিচে নম্বর দেওয়ার আকুতি জানিয়ে শিক্ষককে সম্বোধন করা হয়েছে ‘বাবা’।
নোয়াখালীর দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ার একটি উচ্চ বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণির এক ছাত্রীর এমন একটি উত্তরপত্র সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে।
এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় পর্যায় থেকে শুরু করে দেশজুড়ে নেটিজেন এবং শিক্ষাবিদদের মধ্যে চলছে তুমুল আলোচনা-সমালোচনা। নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার গুণগত মান নিয়ে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, হাতিয়া উপজেলার একটি স্থানীয় উচ্চ বিদ্যালয়ের অর্ধবার্ষিক বা প্রাক-নির্বাচনি পরীক্ষায় এ ঘটনা ঘটে। সংশ্লিষ্ট শ্রেণির এক শিক্ষক খাতা মূল্যায়ন করতে গিয়ে দেখেন, ওই শিক্ষার্থী প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার ন্যূনতম চেষ্টাও করেনি। উল্টো অত্যন্ত দুর্বল ভাষা ও ভুল বানানে কিছু অসংলগ্ন কথা লিখে রেখেছে। শেষে অনুকম্পা ও নম্বর পাওয়ার আশায় শিক্ষককে ‘বাবা’ ডেকে পাশ করিয়ে দেওয়ার অনুরোধ জানায়।
শিক্ষক নিজের ফেসবুক আইডিতে উত্তরপত্রটির ছবি পোস্ট করে লেখেন- ‘আমার স্কুলের সপ্তম শ্রেণির ছাত্রীর অবস্থা দেখুন।’ মুহূর্তের মধ্যেই পোস্টটি ছড়িয়ে পড়ে এবং ভাইরাল হয়ে যায়।
উত্তরপত্রটি ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ার পর নেটিজেনদের মধ্যে তীব্র মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। মন্তব্যকারীদের একাংশ শিক্ষার্থীর এই ভাষাগত ও বানান দুর্বলতা দেখে চরম উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, সপ্তম শ্রেণিতে পড়া একটি শিশুর সাধারণ বাক্য গঠনের এই করুণ দশা আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার ভেতরের কঙ্কালকে স্পষ্ট করে দেয়।
আবার অন্য একটি বড় অংশ ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন খোদ শিক্ষকের ওপর। তাদের দাবি, একজন শিক্ষার্থীর খাতা এভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করে তাকে এবং তার পরিবারকে মানসিকভাবে হেয়প্রতিপন্ন করা হয়েছে। এটি শিক্ষকসুলভ আচরণ নয়।
বিতর্কের মুখে খাতাটি পোস্ট করা সংশ্লিষ্ট শিক্ষক জানান, কাউকে হেয় করা বা ছোট করার কোনো উদ্দেশ্য তার ছিল না। তিনি বলেন, আমি কেবল আমাদের শিক্ষার বর্তমান বাস্তবচিত্রটি সবার সামনে তুলে ধরতে চেয়েছিলাম। করোনাপরবর্তী সময়ে এবং নতুন কারিকুলামের মাঝে শিক্ষার্থীদের যে বড় ধরনের শেখার ঘাটতি (Learning Gap) তৈরি হয়েছে, এটি তারই প্রমাণ। এই ঘাটতি দূর করতে সবার সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
বিষয়টি নিয়ে কথা বলেন হাতিয়া উপজেলা শিক্ষক সমিতির সভাপতি আনম হাসান। তিনি কিছুটা ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান নিয়ে বলেন, একটি বা দুটি উত্তরপত্র দেখে পুরো দেশের শিক্ষাব্যবস্থার মূল্যায়ন করা একেবারেই ঠিক হবে না। তবে হ্যাঁ, ঘটনাটি অবশ্যই উদ্বেগের। শিক্ষার্থীদের মৌলিক দক্ষতা বাড়াতে শিক্ষক, অভিভাবক ও শিক্ষা প্রশাসনকে আরও বেশি দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।
স্থানীয় শিক্ষাবিদ এবং সমাজ সচেতন ব্যক্তিরা এই ঘটনাকে একটি ‘ওয়েক-আপ কল’ বা সতর্কবার্তা হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, এই ঘটনাটি বিচ্ছিন্ন হতে পারে, কিন্তু এটি আমাদের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের পাঠদানের মান, শিক্ষার্থীদের পড়ার প্রতি উদাসীনতা এবং মূল্যায়ন পদ্ধতির গলদগুলোকে নতুন করে ভাবার সুযোগ করে দিয়েছে।
