বিনা দোষে ২২ বছর কারাগারে ইব্রাহিম
‘জেল থেকে মুক্তি পাইছি জীবনডা ফেরত পাই নাই’
খালাসের রায়ের কপি কারাগারে পৌঁছাতেই লাগে ৮ বছর
আবুল আহসান টিটু, ফকিরহাট (বাগেরহাট)
প্রকাশ: ১৬ জুলাই ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
বাগেরহাটের ফকিরহাটের ইব্রাহিম আলী শেখ মাকে নিয়ে বসবাস করছেন এই ঝুপড়ি ঘরে। মঙ্গলবার তোলা ছবি -যুগান্তর
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
‘জেল থেকে মুক্তি পাইছি, কিন্তু জীবনডা আর ফেরত পাই নাই।’ কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলছিলেন ইব্রাহিম আলী শেখ। বিনা দোষে ২২ বছর কারাভোগের পর মুক্তি মিলেছে বছরখানেক আগে; তবু ফেরেনি স্বাভাবিক জীবন। ২০১৭ সালে উচ্চ আদালত খালাস দিলেও রায়ের কপি কারাগারে পৌঁছে আট বছর পর। ততদিন নির্দোষ মানুষটিকে থাকতে হয়েছে বন্দি। জেলে থাকতেই স্ত্রী চলে গেছে, বিক্রি হয়ে গেছে মায়ের শেষ আশ্রয়টুকুও। ইব্রাহিম আলী শেখের (সাগর) বাড়ি ছিল খুলনার বটিয়াঘাটায়। বর্তমানে তিনি বাগেরহাটের ফকিরহাট উপজেলার লখপুর ইউনিয়নের ভবনা-খড়িবুনিয়া গ্রামে মেয়ের জামাইয়ের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন। মঙ্গলবার সকালে সেখানে গিয়ে দেখা যায়, একটি ঝুপড়ি ঘরে মাকে নিয়ে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন ইব্রাহিম। নিয়মিত কোনো আয়ের উৎস না থাকায় অনেক সময় মা-ছেলেকে অর্ধাহারে-অনাহারে দিন কাটাতে হয়।
ইব্রাহিম জানান, বটিয়াঘাটায় শৈশবেই বাবা দ্বিতীয় বিয়ে করে আলাদা হয়ে গেলে পরিবারের দায়িত্ব এসে পড়ে তার কাঁধে। দরিদ্রতার কারণে লেখাপড়া ছেড়ে দিনে ভ্যান-রিকশা চালাতেন, রাতে বাজারে নাইটগার্ডের কাজ করতেন। সেই আয়েই চলত মা, ভাই-বোন, স্ত্রী ও দুই মাস বয়সি মেয়ের সংসার। ২০০৩ সালে রাতের পাহারা শেষে সকালে বাড়ি ফেরার পথে পুলিশ তাকে আটক করে। পরে থানায় নিয়ে হত্যাসহ চারটি মামলায় তাকে আসামি করে। গ্রেফতারের পর ২ মাসের মেয়েকে ফেলে তার স্ত্রী অন্যত্র বিয়ে করেন।
ইব্রাহিম বলেন, ‘আমি বারবার কইছিলাম, আমি কাউরে মারি নাই। আমি গরিব মানুষ, খাইটে খাই। কিন্তু কেউ আমার কথা শুনল না।’
তিনি জানান, নিরক্ষর ও চরম দরিদ্র হওয়ায় নিজের পক্ষে আইনজীবী নিয়োগ কিংবা কার্যকর আইনি লড়াই চালানোর সামর্থ্য ছিল না। পরে কারাগারে থাকা এক সহবন্দির পরিবারের সহযোগিতায় ও তার মায়ের মাথা গোঁজার একমাত্র ঠাঁই ভিটেমাটি বিক্রি করে উচ্চ আদালতে আপিল করেন। ২০১৭ সালের ২০ জুলাই হত্যা মামলায় ও যাবজ্জীবন সাজা মামলায় তাকে বেকসুর খালাস দেওয়া হয়। তবে সেই রায়ের কপি কারাগারে পৌঁছতে আরও আট বছর লেগে যায়। ফলে ২০২৫ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত তাকে কারাগারেই থাকতে হয়। অন্য মামলা দুটির সাজা ৭ ও ১০ বছর তিনি জেলে থাকায় সাজা ভোগ হয়ে গিয়েছিল অনেক আগেই।
মুক্তি পেলেও ইব্রাহিমের জীবনে স্বাভাবিকতা ফেরেনি। দীর্ঘদিন কারাগারে কাটানোর প্রভাব পড়েছে তার শরীরে। মানসিকভাবেও ভেঙে পড়েছেন তিনি। চোখে কম দেখেন, আলো সহ্য করতে পারেন না। হাত-পা দুর্বল হয়ে গেছে। বয়সের তুলনায় শরীরে আগেভাগেই বার্ধক্য নেমে এসেছে। ভারী কাজ তো দূরের কথা, সাধারণ শ্রমের কাজও করতে কষ্ট হয়।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে ইব্রাহিম বলেন, ‘জেলে থাকতি দুইবেলা খাওন পাইতাম। এখন অনেক সময় না খাইয়া থাকতি হয়। বউ বাচ্চা ফালাইয়ে ঘর ছাড়ছে, মেয়েটাও অর্ধাহার-অনাহারে কষ্টে আছে। জেল থেকে মুক্তি পাইছি, কিন্তু জীবনডা আর ফেরত পাই নাই।’
সরকারের কাছে পুনর্বাসনের আবেদন জানিয়ে ইব্রাহিম বলেন, ‘সরকারের কাছে একটাই দাবি, আমারে বাঁচার একটা ব্যবস্থা করে দিক। বাকি জীবনটা যেন পরের কাছে আশ্রিত থাকতি না হয়। মরার পর যেন বেওয়ারিশ লাশ হয়ে পড়ে থাকতে না হয়।’
ইব্রাহিমের মা কোহিনূর বেগম জানান, ছেলেকে মুক্ত করতে তিনি ইটভাটায় ও মানুষের বাড়িতে কাজ করেছেন। শেষ পর্যন্ত নিজের বসতঘরও বিক্রি করতে হয়েছে। ইব্রাহিমের মেয়ে বড় হলে তাকে বিয়ে দিয়েছেন। এখন সেই মেয়ের জামাইয়ের বাড়িতেই তারা আশ্রয় নিয়েছেন।
মুক্তির পর গেল এক বছর সমাজসেবা অধিদপ্তর, স্থানীয় প্রশাসনসহ বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে সহায়তার জন্য আবেদন করেছেন ইব্রাহিম। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিয়ে দ্বারে দ্বারে ঘুরলেও এখন পর্যন্ত কোনো পুনর্বাসন সুবিধা পাননি।
এ বিষয়ে বাগেরহাট জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের উপপরিচালক সন্তোষ কুমার নাথ বলেন, ইব্রাহিম আলী শেখের প্রয়োজন ও সক্ষমতা বিবেচনা করে সহায়তার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
