Logo
Logo
×
   

শেষ পাতা

পাহাড়ধস, বৃষ্টি ও ঢল

কক্সবাজারে ক্ষতি ৮৯০ কোটি টাকা

আবার লঘুচাপ, বাড়তে পারে বৃষ্টি * বাঁশখালীতে ৩০ হাজার মাটির ঘর তলিয়ে গেছে * সাজেকভ্যালি ভ্রমণের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার

Icon

যুগান্তর ডেস্ক

প্রকাশ: ১৬ জুলাই ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

কক্সবাজারে ক্ষতি ৮৯০ কোটি টাকা

কয়েকদিনের ভারি বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে ভেঙেছে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া-কসবা আঞ্চলিক সড়কের একাংশ। এতে বন্ধ রয়েছে যান চলাচল। বুধবার তোলা ছবি -যুগান্তর

টানা বৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল ও পাহাড়ধসে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে দুর্ভোগ এখনো কাটেনি। সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি কক্সবাজারে। জেলার ১০ উপজেলার ৭০টি ইউনিয়নের প্রায় সাত লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। কৃষি, মৎস্য, সড়ক, ঘরবাড়ি ও বেড়িবাঁধসহ সাতটি খাতে প্রাথমিক ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৮৯০ কোটি টাকা। একই সময়ে চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে প্রায় ৩০ হাজার মাটির ঘর তলিয়ে গেছে, কৃষিতে ক্ষতি হয়েছে প্রায় অর্ধশত কোটি টাকা। রাঙামাটিতে বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হলেও বহু মানুষ এখনো পানিবন্দি। তবে সাজেকভ্যালি ভ্রমণের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করেছে প্রশাসন। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়ায় পাহাড়ি ঢলের তোড়ে নির্মাণাধীন সেতুর বিকল্প সড়ক ভেঙে যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গেছে। বগুড়ার সারিয়াকান্দিতে জলাবদ্ধতায় ২২টি হিন্দু পরিবার মানবেতর জীবন কাটাচ্ছে।

বঙ্গোপসাগরে আবার লঘুচাপ, বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা

সাম্প্রতিক সময়ের লঘুচাপের রেশ কাটতে না কাটতেই উত্তর-পশ্চিম বঙ্গোপসাগরে আরেকটি লঘুচাপ সৃষ্টির সম্ভাবনার কথা জানিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। বুধবার আবহাওয়ার পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, এর প্রভাবে আগামী কয়েক দিন দেশের বিভিন্ন এলাকায় বৃষ্টিপাতের প্রবণতা বাড়তে পারে। আবহাওয়াবিদ ড. আবুল কালাম মল্লিক জানান, মৌসুমি বায়ুর বর্ধিতাংশ বর্তমানে পাঞ্জাব, হরিয়ানা, উত্তরপ্রদেশ, বিহার, পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের মধ্যাঞ্চল হয়ে আসাম পর্যন্ত বিস্তৃত রয়েছে। এর আরেকটি অংশ উত্তর বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত। বর্তমানে মৌসুমি বায়ু দেশের উত্তরাঞ্চলে সক্রিয় এবং অন্যান্য এলাকায় মোটামুটি সক্রিয় অবস্থায় রয়েছে। উত্তর বঙ্গোপসাগরেও এটি মাঝারি অবস্থায় বিরাজ করছে। আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে উত্তর-পশ্চিম বঙ্গোপসাগর ও আশপাশের এলাকায় একটি নতুন লঘুচাপ সৃষ্টি হতে পারে।

কক্সবাজারে মানবিক বিপর্যয়

টানা নয় দিনের নজিরবিহীন বর্ষণ এবং উজান থেকে ধেয়ে আসা পাহাড়ি ঢলে কক্সবাজার জেলায় মানবিক বিপর্যয় নেমে এসেছে। স্মরণকালের এ ভয়াবহ বন্যায় জেলার বেশির ভাগ এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জেলা প্রশাসনের প্রাথমিক ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ কমিটির তথ্য অনুযায়ী, জেলার ১০ উপজেলার ৭০টি ইউনিয়নের প্রায় সাত লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। বন্যা ও পাহাড়ধসে প্রাণ গেছে ৩১ জনের, যাদের মধ্যে ১৫ জন রোহিঙ্গা। সড়ক ও যোগাযোগ অবকাঠামো, ঘরবাড়ি, কৃষি, মৎস্য ও বেড়িবাঁধসহ সাতটি খাতে ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৮৯০ কোটি টাকা। তবে পানি পুরোপুরি নেমে গেলে এ অঙ্ক হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা সংশ্লিষ্টদের।

জেলার ৭১টি ইউনিয়নের মধ্যে ৭০টিই প্লাবিত হয়েছে। পাঁচটি পৌরসভার মধ্যে চারটিতে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। পেকুয়ার ৯৫ শতাংশ, মাতামুহুরীর ৮৫ শতাংশ, চকরিয়ার ৮০ শতাংশ, কুতুবদিয়ার ৬৫ শতাংশ, মহেশখালীর ৫০ শতাংশ এবং রামুর ৩৫ শতাংশ এলাকা পানিতে তলিয়ে যায়। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এক হাজার ৬১৩টি ঘরবাড়ি।

বন্যায় জেলার দুই হাজার ৪৮ কিলোমিটার সড়ক এবং ৭৯টি সেতু-কালভার্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মাতামুহুরী নদীর পানি বিপৎসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় চকরিয়া, পেকুয়া ও মাতামুহুরী এলাকার ৩৮০ কিলোমিটার বেড়িবাঁধের ৪৪টি স্থানে ভাঙন দেখা দিয়েছে।

মৎস্য বিভাগের হিসাবে ৪৫৩টি বাণিজ্যিক চিংড়ি ঘের ও তিন হাজার ৯১৮টি পুকুরের মাছ ভেসে গিয়ে প্রায় ৪৬ কোটি ২২ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ৭৬৮ জন খামারি। কৃষি বিভাগের তথ্যে, ১০ হাজার ৪০১ একর ফসলি জমি নষ্ট হওয়ায় ৪৩ হাজার ২১০ জন কৃষক বড় ধরনের লোকসানে পড়েছেন। জেলার ৬১৮টি আশ্রয়কেন্দ্রে এক হাজার ৫৮০ জন আশ্রয় নিয়েছেন। দুর্গত এলাকায় এখনো সুপেয় পানি ও খাদ্যসংকট রয়েছে।

রাঙামাটিতে দুর্ভোগ অব্যাহত, সাজেক ভ্রমণের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার

রাঙামাটির সাজেকভ্যালি ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হয়েছে। খুলে দেওয়া হয়েছে সাজেকভ্যালিসহ বাঘাইছড়ি উপজেলার সব পর্যটনকেন্দ । পরিস্থিতি উন্নতি হওয়ায় এক সপ্তাহ পর বুধবার বিকালে জারি করা এক গণবিজ্ঞপ্তিতে এ নিষেধাজ্ঞা তুলে নেন রাঙামাটির জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট নাজমা আশরাফী।

এদিকে জেলায় টানা বৃষ্টিপাত কমে যাওয়ায় বৈরী আবহাওয়া ও দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতির উন্নতি হলেও দুর্গত মানুষের দুর্ভোগ কাটেনি। জেলার বাঘাইছড়ি, বরকল, জুরাছড়ি, বিলাইছড়িসহ বিভিন্ন এলাকায় এখনো পানিবন্দি রয়েছেন অসংখ্য মানুষ। এ অবস্থায় দুর্গতদের সহায়তায় বুধবার বাঘাইছড়ি উপজেলার দুর্গত এলাকা পরিদর্শন ও ত্রাণ বিতরণ করেছেন পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক ও ভূমি মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন। এ সময় তিনি ইতোমধ্যে রাঙামাটি জেলায় দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত আট হাজার ৮০০ পরিবারের কাছে খাদ্যসহায়তা পৌঁছে দেওয়া হয়েছে বলে উল্লেখ করেন।

বাঁশখালীতে ৩০ হাজার মাটির ঘর তলিয়ে গেছে

চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে এলাকায় বন্যার কিছু কিছু জায়গায় পানি কমতে শুরু করেছে। কিন্তু কিছু এলাকায় অপরিবর্তিত রয়েছে। বন্যার পানি কমতে শুরু করায় ভেসে উঠছে ভয়াবহতার চিত্র, ভেঙে যাচ্ছে হাঁটুপানিতে ডুবে থাকা কাঁচা মাটির ঘরগুলো। প্রত্যন্ত অঞ্চলে পর্যাপ্ত ত্রাণ না পাওয়ার অভিযোগ করেছেন ক্ষতিগ্রস্তরা। স্থানীয় ক্ষতিগ্রস্তরা জানান, এবারের বন্যায় বাঁশখালীতে পানিতে প্রায় ৩০ হাজার মাটির ঘর তলিয়ে গেছে, প্রত্যন্ত অঞ্চলে পর্যাপ্ত ত্রাণ না পাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। কৃষি বীজতলা, আউশ ধান, পুকুর, মৎস্য চাষ ও বিভিন্ন সবজি ফসল নষ্ট হয়ে প্রায় অর্ধশত কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। পাহাড়ি ঢল ও সমুদ্রের জোয়ারের পানিতে সহস্রাধিক গ্রামীণ সড়ক ক্ষত-বিক্ষত হয়েছে।

আখাউড়ায় নির্মাণাধীন সেতুর বিকল্প সড়ক ভেঙে গেছে

ভারি বৃষ্টি ও ভারতের ত্রিপুরা থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের তোড়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া-কসবা আঞ্চলিক সড়কের কাকিনা খালের ওপর নির্মাণাধীন সেতুর পাশের বিকল্প সড়ক মঙ্গলবার রাতে ভেঙে যায়। এতে আখাউড়া-কসবাসহ আশপাশের এলাকার যোগাযোগ ব্যাহত হয়েছে। বিকল্প পথে চলাচল করতে গিয়ে ভোগান্তিতে পড়েছেন হাজারো মানুষ।

সারিয়াকান্দির ২২ হিন্দু পরিবার পানিবন্দি

বগুড়ার সারিয়াকান্দি উপজেলার ফুলবাড়ি ইউনিয়নের পাটনিপাড়ার ২২ হিন্দু পরিবার গত কয়েক মাস ধরেই পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। স্থানীয় একজন প্রভাবশালী ড্রেনের মুখ বন্ধ করায় এ ধরনের জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। হাতে পায়ে ঘাসহ নানা ধরনের সমস্যায় ভুগছেন ভুক্তভোগী এলাকাবাসী। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সুমাইয়া ফেরদৌস বলেন, জলাবদ্ধতা নিরসনে দ্রুত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।

[প্রতিবেদন তৈরিতে তথ্য দিয়েছেন স্টাফ রিপোর্টার, ব্যুরো ও প্রতিনিধিরা]

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম

We use cookies to improve your browsing experience. By using the site, you agree to our Privacy Policy .