‘বছরের দীর্ঘতম রাতে আমার বাবা পুলিশ ফাঁড়িতে’

  যুগান্তর রিপোর্ট ২৩ ডিসেম্বর ২০১৮, ১৯:১১ | অনলাইন সংস্করণ

ছেলের বাড়িতে বেড়াতে যাওয়ার পথে সত্তর বছরের বৃদ্ধ মো. আকমল হোসাইন শিকদারকে (৭০) আটক করে পুলিশ। ছবি-সংগৃহীত
ছেলের বাড়িতে বেড়াতে যাওয়ার পথে সত্তর বছরের বৃদ্ধ মো. আকমল হোসাইন শিকদারকে (৭০) আটক করে পুলিশ। ছবি-সংগৃহীত

পাবনা থেকে রাজশাহীতে ছেলের বাড়িতে বেড়াতে যাচ্ছিলেন সত্তর বছরের বৃদ্ধ মো. আকমল হোসাইন শিকদার (৭০)।

শনিবার দুপুরে সুজানগর উপজেলার নাজিরগঞ্জ বাসস্ট্যান্ডে বাসের জন্য অপেক্ষা করছিলেন তিনি। হঠাৎ পুলিশ তাকে আটক করে কামালপুর পুলিশ ফাঁড়িতে নিয়ে যায়।

আটকের খবর পেয়ে প্রথমে বিশ্বাস করতে পারছিল না পরিবারের সদস্যরা।

কারণ আকমল হোসাইন তার ছেলের বাড়িতে বেড়াতে যাচ্ছিলেন। তিনি কেন পুলিশের হাতে আটক হবেন।

পরে তার পরিবারের সদস্যরা থানায় যোগাযোগ করেও কোনো ফল পাননি।

অবশেষে ঘটনার বিস্তারিত তুলে ধরে বৃদ্ধ বাবাকে নিয়ে ফেসবুকে শনিবার একটি হৃদয়বিদারক স্ট্যাটাস দেন ছেলে মোহাম্মদ আসাদুল্লাহ।

দেশের নতুন দৈনিক ‘দেশ রূপান্তর’ পত্রিকার সহ-সম্পাদক আসাদুল্লাহ লিখেছেন, ‘বছরের দীর্ঘতম রাতটা আমার আব্বা কাটাবেন পুলিশ ফাঁড়িতে। আজ (শনিবার) দুপুরে গণআটকের খপ্পরে পড়েছেন তিনি।’

খবর পেয়ে আমার নানার (আওয়ামী লীগের উপজেলা নেতা) সঙ্গে কথা বললাম। নানা আওয়ামী লীগ প্রার্থীর সঙ্গে কথা বললেন। প্রার্থী জানালেন, এখন যাদের ধরা হচ্ছে তাদের বিষয়ে কোনো তদবির শোনা হচ্ছে না।’

তিনি লিখেন, ‘আরও নানাভাবে, নানা দিক থেকে চেষ্টা করলাম। ওসি সাহেবের সঙ্গে কথা বললাম। বললাম, আমার বাবা জগতের অন্যতম নির্ভেজাল মানুষ। সংসার আর নামাজ কালামের বাইরে তার কোনো জগৎ নেই। এলাকার মোড়ে বসে চায়ের আড্ডাও দেন না কখনো। রাজনৈতিক সংযোগহীন মানুষ। শেখ হাসিনা-খালেদা জিয়া ছাড়া আর কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তির নামও বলতে পারবে না।

শুধুমাত্র দুই একজন নেতার সঙ্গে আমাদের পারিবারিক দূরত্ব থাকতে পারে। এর কারণ জমি-জমা। রাজনীতি না। একটু ভালো করে খোঁজ নেন। ব্যক্তিগত বিরোধকে রাজনৈতিক রূপ দেয়া হয়েছে।’

ওসি বললেন, ঠিক আছে খোঁজ নিচ্ছি। খোঁজ নিলেন। কিন্তু খোঁজ দিলেন না। আমার আব্বার ছেড়ে দেয়ার কোনো খোঁজ দিলেন না তিনি।’

কিশোর বয়সে মা হারিয়েছিলেন আমার বাবা। এমন শীতের বহুরাত তার কেটেছে মায়া-মমতাহীন। ফলে আজকে বৃহৎ এই রাতে ক্ষুধা আর শীতে প্রচণ্ড শারীরিক কষ্টে ভুগবেন এমনটা ভাবছি না। সয়ে নেবেন দ্রুতই।

তবে তার মানসিক কষ্ট হবে। পুলিশ ফাঁড়ির খুপড়ি ঘরে, যেখানে চোর-ডাকাত, নেশাখোররা আটকে থাকে, সেই ঘরে থাকতে তার কষ্ট হবে। বাবা নৈতিকভাবে মানতে পারবেন না। আমি জানি। ভোরে বাবা গলা ছেড়ে জিকির করেন। পুলিশ ফাঁড়িতে নিশ্চয় জিকিরের ব্যবস্থা নেই। ফলে সকালটাও তার খারাপ যাবে।

তার ছেলে-মেয়েরা চিন্তা করছে, ভাই-বোনেরা পাগলের মতো হয়ে গেছে এই চিন্তা তাকে আরও বেশি ব্যথিত করবে।’

আসাদুল্লাহ আরও লিখেন, ‘আব্বা বলতেন, গ্রামে ঝগড়া ফ্যাসাদ লাগলে আমি আগে ভাবি আমার ছেলেরা কোথায়? তারা কোনো গ্যাঞ্জামে আছে কিনা? যখন দেখি আমার একেকটা ছেলে একেক জায়গায় নিরাপদে সুবুদ্ধিতে আছে, আমার তখন দুশ্চিন্তা কম হয়।

সারাজীবন নিজে নিশ্চিন্ত থেকে আজ আমাদের চিন্তায় ফেলেছেন বাবা।

আব্বাকে সকালে কোর্টে চালান করা হবে। আমরা উকিল ধরব। দ্রুত জামিনও হয়ে যাবে হয়তো। কিন্তু দারিদ্যের ভাঁজপড়া সত্তর ছোঁয়া মলিন মুখে যে বেদনার ছাপ পড়বে, সে বেদনা দূর হবে কিসে? আমরা ভাই-বোনেরা পাগলের মতো একে ওকে ফোন দিচ্ছি। ছটফট করছি। তার কী হবে?’

ফেসবুকের এ স্ট্যাটাস নজরে আসার পর সাংবাদিক আসাদুল্লাহর সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়।

তিনি যুগান্তরকে বলেন, আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে পাবনায় গণগ্রেফতার অভিযান চালাচ্ছে পুলিশ। তারই অংশ হিসেবে আমার বৃদ্ধ বাবাকে আটক করা হয়েছে।

আসাদুল্লাহ জানান, তাদের গ্রামের বাড়ি সুজানগরের সৈয়দপুরে। সেখান থেকে তার বাবা রাজশাহী ছেলের বাড়িতে যাচ্ছিলেন। পথে নাজিরগঞ্জ বাসস্ট্যান্ড তাকে আটক করা হয়। তিনি বলেন, আজ আদালতে বাবাকে তোলা হয়েছিল। জামিন হয়নি। আইনজীবী বলেছে, আগামীকাল সোমবার জামিন হতে পারে।

এ ব্যাপারে যোগাযোগ করা হলে পাবনার সুজানগর থানার ওসি শরীফুল আলম যুগান্তরকে বলেন, কয়েক দিন আগে এখানে আওয়ামী লীগের মিছিলে হামলার ঘটনায় থানায় মামলা হয়েছিল। ওই হামলার সঙ্গে কানেকশন থাকার অভিযোগে আকমল হোসাইন শিকদারকে আটক করা হয়েছে।

জেলার খবর
অনুসন্ধান করুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter
×