দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করা নরসিংদীর শামীম জিতলেন কোটি টাকা

প্রকাশ : ২৪ ডিসেম্বর ২০১৮, ১৫:১৪ | অনলাইন সংস্করণ

  বিশ্বজিৎ সাহা, নরসিংদী

নরসিংদী শহরের সাটিরপাড়া কালিকুমার ইনস্টিটিউশন স্কুল অ্যান্ড কলেজের পেছনে দুকক্ষের একটি বাড়ি।  ইটের গাঁথুনি থাকলেও প্রলেপ না পড়ায় অনেকটা শ্রীহীন।

ঘরে প্রবেশ করলেই দারিদ্র্যতার মলিন চিত্র চোখে পড়ে। বিছানার পাশে মায়ের জীবনযুদ্ধের হাতিয়ার সেলাইমেশিন। আর পাশে ৫ ফুট বাই ৭ ফুট কক্ষটিতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে নানা লেখকের বই।

অথচ শ্রীহীন এই বাড়ির ছেলে শামীম আহমেদ জ্ঞানের আলো ছড়িয়েছে সারা দেশে। বেসরকারি টেলিভিশন ইন্ডিপেনডেন্টের বাংলাদেশ জিজ্ঞাসা প্রতিযোগিতায় ৮০ হাজার প্রতিযোগীকে পেছনে ফেলে হয়েছেন দেশসেরা। চ্যাম্পিয়ন হয়ে জিতে নিয়েছেন এক কোটি টাকা। নিজের সঙ্গে আলোকিত করেছেন নরসিংদীকে।

নিজ কলেজের ছাত্র বিজয়ী হওয়ায় উচ্ছ্বসিত নরসিংদী সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. আনোয়ারুল ইসলাম। তিনি বলেন, চরম দারিদ্র্যতার মধ্যেও ইচ্ছাশক্তি, মনের জোর, চেষ্টা ও কঠোর অধ্যবসায় থাকলে যে সাফল্য অর্জন করা যায়, তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ শামীম আহমেদ। সংঘাত, চরাঞ্চলের টেঁটাযুদ্ধ ও সামাজিক অবক্ষয়ের কারণে প্রায়ই নেতিবাচক সংবাদের শিরোনাম হয় নরসিংদী। এরই মধ্যে শামীমের সাফল্য কলেজ তথা নরসিংদীবাসীর মুখ উজ্জ্বল করেছে।

৪৭ বছরে বাংলাদেশের অর্জন, সাফল্য, ব্যর্থতা-সব মিলিয়ে আমরা কোথায়-কীভাবে আছি, সেই প্রশ্ন আর উত্তর নিয়ে ইনডিপেনডেন্ট টিভিতে অনুষ্ঠিত হয় কুইজ শো বাংলাদেশ জিজ্ঞাসা।

শামীম আহমেদের সেই গল্পের কথা শুনতে মঙ্গলবার যাই শহরের দক্ষিণ সাটিরপাড়ায় তার বাড়িতে। বাবা আবদুল মোমেন ইউএমসি জুট মিলের অবসরপ্রাপ্ত শ্রমিক। মেজ ভাই সাইফুল ইসলাম সজীব ট্রেন দুর্ঘটনায় এক পা হারিয়েছেন। আর ছোট ভাই সফিকুল ইসলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিভাগের স্মাতকের ২য় বর্ষের ছাত্র।

শত অভাব-অনটনে শামীমের মা শামসুন নাহার দিনরাত সেলাই কাজের মাধ্যমে নিরলস পরিশ্রম করে সংসারের হাল ধরেন। শামীম নরসিংদী সরকারি কলেজ থেকে হিসাববিজ্ঞান বিভাগে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর করেছে। এরই মধ্যে বয়সের ভারে ন্যুজ বাবা ইউএমসি জুট মিল থেকে অবসরে যান। তাই এসএসসি পরীক্ষার পর থেকেই শামীম টিউশনি শুরু করেন।

তবে জীবন সংগ্রামে প্রতিনিয়ত লড়াই করে যাওয়া শামীম অদ্ভুত এক নেশায় মগ্ন। সেই নেশা হল- বইয়ের। পত্রিকা আর বিভিন্ন লেখকের বই পড়া তার ছিল দৈনন্দিন রুটিন।

এরই মধ্যে গত সেপ্টেম্বরে জানতে পারেন ইন্ডিপেনডেন্ট টেলিভিশনে বাংলাদেশ জিজ্ঞাসা প্রতিযোগিতার কথা। ৮০ হাজার প্রতিযোগী থেকে বাছাই করা ৬৪ জন প্রতিযোগী নিয়ে অনুষ্ঠিত হয় চূড়ান্ত প্রতিযোগিতা। প্রতিযোগিতার চার রাউন্ডের মধ্যে তিনটিতে হয়েছেন সেরা স্কোরার।

চূড়ান্ত প্রতিযোগীর প্রতীক্ষার অবসান ঘটল মহান বিজয় দিবসের রাতে। কোটি টাকা উঠল বিজয়ী শামীম আহমেদের হাতে। সঞ্চালক খালিদ মুহিউদ্দীনের শেষ প্রশ্ন-পর্ব বাজান রাউন্ডের সমাপনীর সঙ্গে সঙ্গে নরসিংদীর ছেলে শামীমের স্কোর দাঁড়ায় ১১৫।

বিজয় নিশ্চিত হলে মঞ্চে ছুটে এসে পুত্রকে জড়িয়ে ধরে আবেগে কেঁদে ফেলেন শামীমের মা। বিজয়ীর হাতে কোটি টাকার চেক তুলে দেন পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল।

অনুষ্ঠান প্রচারিত হওয়ার পর শামীমের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে নরসিংদী তথা দেশব্যাপী। বিভিন্ন শ্রেণিপেশার লোক বাড়িতে গিয়ে শামীমকে অভিনন্দন জানান, যা দারিদ্র্যজয়ী শামীমের মা-বাবাকে মুগ্ধ করে।

স্থানীয় শিক্ষক শাহরুখ ইশতিয়াক খান বলেন, আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি-এই অর্জন তার জীবনে অনাগত অসংখ্য সাফল্যের সূচনামাত্র।

জানতে চাইলে শামীমের মা শামসুন নাহার বলেন, ২০ বছর সেলাই কাজ করার সেই কষ্ট আজ সার্থক হয়েছে। এখন স্বপ্ন দেখি আমার ছেলে ভালো একটি চাকরি করবে।

শামীমের বাবা আবদুল মোমেন বলেন, শামীম এই বয়সে সংসারের দায়িত্ব কাঁধে নিয়েও কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে সে দেশসেরা হয়েছে। আমরা তাকে আরও ভালো জায়গায় দেখতে চাই।