খোঁজ মেলেনি শ্রমিকদের, শোকের চাদরে ঢাকা ভাঙ্গুরার চার গ্রাম

  চাটমোহর (পাবনা) প্রতিনিধি ১৭ জানুয়ারি ২০১৯, ১৮:৫৯ | অনলাইন সংস্করণ

মাদরবাড়িয়া গ্রামে নিখোঁজ শ্রমিকদের স্বজনদের আহাজারি
মাদরবাড়িয়া গ্রামে নিখোঁজ শ্রমিকদের স্বজনদের আহাজারি

মাত্র ছয় মাস আগে তুহিন হোসেনের সঙ্গে বিয়ে হয়েছে মুসলিমা খাতুনের। সংসারে সচ্ছলতা ফেরাতে নববিবাহিত স্ত্রীকে বাড়িতে রেখে যান মাটি কাজার কাজে।

স্ত্রীকে বলেছিলেন, কিছুদিন হাড়ভাঙ্গা খাটুনি করে আর মাটি কাটার কাজ করবেন না। ট্রলারডুবিতে নিখোঁজ স্বামীকে খুঁজে বেড়াচ্ছেন তিনি।

তুহিনের বাবা ছায়দার আলীর আহাজারিতে ভারি হয়ে উঠেছে গ্রামের পরিবেশ। তাকে থামানোর চেষ্টা করে ব্যর্থ দুই ভাইও কেঁদে উঠছেন। ছেলেকে এনে দাও বলে মাঝে মাঝে মূর্ছা যাচ্ছেন মা শাহিদা খাতুন।

শুধু তুহিন হোসেনই নন, তার মতো একই ইউনিয়নের ১৮ জন শ্রমিক এখন পর্যন্ত নিখোঁজ থাকায় কান্না থামছে না স্বজনদের। এদিকে ঘটনার তিন দিন অতিবাহিত হলেও এখনও খোঁজ মেলেনি ডুবে যাওয়া ট্রলার এবং নিখোঁজ শ্রমিকদের।

সরেজমিনে ভাঙ্গুড়া উপজেলার খানমরিচ ইউনিয়নের মুন্ডুমালা, মাদারবাড়িয়া, চন্ডিপুর ও দাসমরিচ গ্রামে গিয়ে দেখা যায় এমন পরিবেশ। গ্রামগুলো যেন এখন শোকের গ্রাম। পরিবারে চলছে শোকের মাতম।

স্বজন হারিয়ে বাকরুদ্ধ অনেকেই। কারো সন্তান, কারো স্বামী, আবার কারো বাবার সন্ধান না পেয়ে আহাজারি থামছে না তাদের। শোকের চাদরে ঢাকা পড়েছে গ্রামগুলোর পরিবেশ। নিখোঁজ শ্রমিকের স্বজনদের সান্ত্বনা দিতে গিয়ে চোখের পানি ধরে রাখতে পারছেন না প্রতিবেশী ও এলাকাবাসী।

নিখোঁজ শ্রমিক মানিক হোসেনের স্ত্রী রুমা খাতুন স্বামীকে ফিরে পেতে বিলাপ করছেন। বলছিলেন, ‘আপনারা আমার স্বামীকে ফিরিয়ে দিন। আমি এই বয়সে বিধবা হতে চাই না? আমার দুই সন্তানকে কে দেখবে। আমার দুই ছেলে কাকে বাবা বলে ডাকবে?’

মানিকের মা নাজমা খাতুন জানান, ১০ দিন আগে ১০ হাজার টাকা দাদন দিয়ে আমার ছেলেকে জোর করে নিয়ে গেছে আবদুল হাই নামের স্থানীয় এক লেবার সর্দার। তারপর মঙ্গলবার সকালে খবর পেলাম আমার ছেলে যে ট্রলারে ছিল সেটা ডুবে গেছে বলে হাউমাউ করে কেঁদে ওঠেন তিনি।

দুই ছেলে আলিফ ফকির ও মোস্তফা ফকির এবং এক জামাই রহমত আলী নিখোঁজ থাকায় পাগলপ্রায় বাবা জব্বার ফকির। সংবাদকর্মীদের কাছে পেয়ে তাদের পা ধরে সন্তান ও জামাইয়ের খোঁজ জানতে চাইছেন তিনি। কী করবেন বুঝে উঠতে পারছেন না। কাঁদছেন আর যাকে কাছে পাচ্ছেন তার কাছে জানতে চাইছেন বেঁচে আছে তো?

নিখোঁজ ব্যক্তিদের স্বজনরা জানান, গত ১১ দিন আগে একই ইউনিয়নের মাদরবাড়িয়া গ্রামের মাটি কাটার সরদার আবদুল হাই দাদন দিয়ে শ্রমিকদের নারায়গঞ্জের বক্তারখালী এলাকায় মাটি কাটার কাজে নিয়ে যায়। এরপর মঙ্গলবার ভোররাতে কুমিল্লার দাউদকান্দি থেকে ট্রলারে মাটি নিয়ে নারায়ণগঞ্জের বক্তারখালী এলাকায় যাচ্ছিলেন শ্রমিকরা।

ট্রলারে থাকা শ্রমিকের মধ্যে কেউ ঘুমিয়েছিলেন, কেউবা জেগে। পথিমধ্যে ভোররাত সাড়ে ৩টা থেকে ৪টার মধ্যে ট্রলারটি মুন্সিগঞ্জের গজারিয়ার উপজেলার সীমান্তবর্তী কালিয়াপুর এলাকার মেঘনা নদীতে পৌঁছার পর একটি মালবাহী জাহাজের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এতে ট্রলারটি ডুবে যায়। ট্রলারে থাকা শ্রমিকদের মধ্যে ১৪ জন সাঁতার জানায় প্রাণে বাঁচলেও ১৮ জন নিখোঁজ হয়।

বেঁচে যাওয়া শ্রমিকদের মধ্যে পাবনার ভাঙ্গুড়া উপজেলার খানমরিচ ইউনিয়নের চন্ডিপুর গ্রামের হাশেম আলীর ছেলে মামুন আলী প্রামাণিক ও পাইকপাড়া গ্রামের আশরাফ মোল্লার ছেলে শাহ আলম জানান, ট্রলারের মাথার দিকে ছিলেন মামুন আর পেছনের দিকে ছিলেন শাহ আলমসহ বাকিরা। ট্রলার ডুবে যাওয়ার মুহূর্তে আমরা ১৪ জন পাড়ে উঠে আসতে পারলেও অন্যরা পারেনি। মামুন ও শাহ আলম আরও জানান, ওই সময় চারদিকে অন্ধকারে কিছুই দেখা যাচ্ছিল না। ৩ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে আমরা ঠাণ্ডা পানির মধ্যে সাঁতরে ভেসে ছিলাম। মনে হচ্ছিল মৃত্যু খুব কাছে। পরিবারের কথা মনে পড়ছিল। আর ১০ মিনিট পানিতে থাকলে মারা যেতাম।

মাটির ট্রলার নির্ধারিত সময়ের মধ্যে গন্তব্যে না পৌঁছার কারণে মালিক পক্ষ মোবাইলে ফোন দিয়ে বন্ধ পায়। সন্দেহ হলে তখন তারা আরেকটি ট্রলার নিয়ে এসে আমাদের উদ্ধার করে।

নিখোঁজ ১৮ জন শ্রমিক হলেন পাবনার ভাঙ্গুড়া উপজেলার খানমরিচ ইউনিয়নের মুন্ডুমালা গ্রামের গোলাই প্রামাণিকের ছেলে ছোলেমান হোসেন, জব্বার ফকিরের ছেলে আলিফ হোসেন ও মোস্তফা ফকির, গোলবার হোসেনের ছেলে নাজমুল হোসেন-১, আবদুল মজিদের ছেলে জাহিদ হোসেন, নুর ইসলামের ছেলে মানিক হোসেন, ছায়দার আলীর ছেলে তুহিন হোসেন, আলতাব হোসেনের ছেলে নাজমুল হোসেন-২, লয়ান ফকিরের ছেলে রফিকুল ইসলাম, দাসমরিচ গ্রামের মোশারফ হোসেনের ছেলে ওমর আলী ও মান্নাফ আলী, তোজিম মোল্লার ছেলে মোশারফ হোসেন, আয়ান প্রামাণিকের ছেলে ইসমাইল হোসেন, সমাজ আলীর ছেলে রুহুল আমিন, মাদারবাড়িয়া গ্রামের আজগর আলীর ছেলে আজাদ হোসেন, চণ্ডিপুর গ্রামের আমির খান ও আবদুল লতিফের ছেলে হাচেন আলী এবং উল্লাপাড়া উপজেলার গজাইল গ্রামের তোফজ্জল হোসেনের ছেলে রহমত আলী।

এদিকে বুধবার বিকালে জেলা প্রশাসক জসিম উদ্দিনের নির্দেশে নিখোঁজ শ্রমিকদের পরিবারের খোঁজ নিতে যান ভাঙ্গুড়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার মাসুদুর রহমান। এ সময় তিনি প্রত্যেক পরিবারকে শুকনো খাবার ও শীতবস্ত্র হিসেবে কম্বল বিতরণ করেন।

তিনি জানান, নিখোঁজ শ্রমিকদের পরিবারের খবর আমরা নিয়মিত রাখব। তাদের পাশে দাঁড়াতে সব ধরনের উদ্যোগ নেয়া হবে।

জেলার খবর
অনুসন্ধান করুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×