‘হেইল বাবা কুঁড়িখাই নাচতে নাচতে বেশতে যাই’

  এ টি এম নিজাম, কিশোরগঞ্জ ব্যুরো ১২ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ২২:৩৯ | অনলাইন সংস্করণ

আধ্যাত্মিক সাধক কামেল পীরের মাজারের ওরসে ভক্তরা
আধ্যাত্মিক সাধক কামেল পীরের মাজারের ওরসে ভক্তরা

আধ্যাত্মিক সাধক কামেল পীরের মাজারের ওরস উপলক্ষে আয়োজিত মেলায় গেলে তার এবং সৃষ্টিকর্তার সুদৃষ্টি মেলে এমন বিশ্বাস থেকে মানুষের ঢল নামে কুঁড়িখাই মেলায়।

আর এ বিশ্বাস এতটাই প্রবল যে, মেলা অভিমুখী বিভিন্ন শ্রেণি ও বয়সের লোকজনের কাফেলা থেকে উচ্চারিত হয়- ‘হেইল বাবা কুঁড়িখাই, নাচতে নাচতে বেশতে (বেহেশতে) যাই’। কুঁড়িখাই মেলা নিয়ে শত বছর ধরে এ অঞ্চলের মানুষের মধ্যে এ কথা প্রবাদ বাক্যের মতো ছড়িয়ে আছে।

কিশোরগঞ্জ জেলার কটিয়াদী উপজেলার মুমুরদিয়া ইউনিয়নের কুঁড়িখাই গ্রামে জমে ওঠেছে হাজারো বছরের ঐতিহ্যবাহী এ মেলা। বছরের প্রতি মাঘ মাসের শেষ সোমবার থেকে শুরু হয়ে পরবর্তী সাত দিন চলে এই মেলা।

বরাবরের মতো এবারও মাঘ মাসের শেষ সোমবার থেকে শুরু হয়েছে এ মেলা। আধ্যাত্মিক সাধক ও কামেল পীর হিসেবে খ্যাত শাহ্ সামসুদ্দিন বুখারী (র.) এর মাজারে ওরস উপলক্ষে বসে এই মেলা।

আর এই মেলায় এ জেলার অধিবাসীদের পাশাপাশি দেশের দূর-দূরান্ত থেকে লাখো দর্শনার্থী, আগন্তুক ও আধ্যাত্মিক সাধক-ফকির এমনকি বৈষ্ণব-বৈষ্ণবীদের সমাবেশ ঘটে।

শিশু-কিশোরদের মনোরঞ্জনে বিশাল মেলার আয়োজনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এখানে সাধক-ফকির ও বাউলদের গান-বাজনার আসর বসলেও শেষ পর্যন্ত জামাই-বউয়ের মাছের মেলা সব কিছুকে ছাপিয়ে যায়।

এই আনন্দ আয়োজনে অংশ নিতে ব্যাকুল হয়ে ওঠে বিভিন্ন বয়সের নারী-পুরুষ। স্থানীয় প্রশাসনও মনে করে এ বিচিত্র আয়োজনের মেলা বাঙালি সংস্কৃতির নিদর্শনের হিরণ্ময় স্মারক।

জনশ্রুতি আছে, ৩৬০ জন আউলিয়ার শিরোমনি হজরত শাহ জালাল (রহ.) এর সফরসঙ্গী হজরত শাহ শামছুদ্দিন বুখারী (রহ.) বাংলা ১২২৫ সালে ৩ জন সফরসঙ্গী শাহ নাসির, শাহ কবীর ও শাহ কলন্দরকে নিয়ে কটিয়াদী উপজেলার কুঁড়িখাই অঞ্চলে ইসলাম ধর্ম প্রচার শুরু করেন। তিনিই এ অঞ্চলের প্রথম ইসলাম ধর্মের প্রচারক।

এছাড়া তিনি ছিলেন ১২ আউলিয়ার একজন। ১২ আওলিয়ার সঙ্গে ইসলাম ধর্ম প্রচার করতে আসা আধ্যাত্মিক সাধক হজরত শাহ্ সামসুদ্দিন আওলিয়া সুলতানুল বুখারীর (র.) দেহত্যাগের পর গড়ে উঠা মাজারের ওরসকে কেন্দ্র করে এ মেলার গোড়াপত্তন হয়।

প্রতি বছরের মতোই সোমবার থেকে বসেছে ওই কুঁড়িখাই মেলা। এ উপলক্ষে মাজারসংলগ্ন বিশাল প্রাঙ্গণ জুড়ে শিশু-কিশোরদের নানা রকম বিনোদনমূলক বাহন, খেলনা, মাটি, বাঁশ-বেত ও কাটের কুটির শিল্পজাত সামগ্রী এবং বাহারী মুখরোচক ঐতিহ্যবাহী খাদ্যসম্ভারের পসরা সাজিয়ে বসেছে ব্যবসায়ীরা। রয়েছে পুতুল নাচ, নাগর দোলা, জাদু,সার্কাস ও শিশু-কিশোরদের মনোরঞ্জনের নানা আয়োজন।

একই সঙ্গে এক প্রান্তে বসেছে দুর্লভ ও নানা প্রজাতির মাছের বিরাট মেলা। এ মেলায় কোনো কোনো মাছ দেড় থেকে দুই লাখ টাকা পর্যন্ত মূল্যেও বিক্রি হয়। আর এ মাছের ক্রেতারা হচ্ছেন বিভিন্ন স্থানে বিয়ে দেয়া কটিয়াদী উপজেলার মেয়েদের স্বামীরা।

মেলা শুরুর আগে থেকেই এ অঞ্চলের মেয়েরা তাদের স্বামী ও সন্তানদের নিয়ে বাবা বাড়িতে এসে অবস্থান নেন। কুঁড়িখাই মেলায় মাজারে জিকির ও ফাতেহা পাঠের পাশাপাশি মেলার অন্য এক প্রান্তে বসেছে সকল ধর্মবর্ণ নির্বিশেষে সাধক ফকির, বৈষ্ণব-বৈষ্ণবী ও বাউলদের গান-বাজনার আসর। আর এসব আসরে প্রকাশ্যে গাঁজা সেবনও শত বছরের ঐতিহ্যে রূপ নিয়েছে।

সোমবার বিকালে সরেজমিন পরিদর্শনকালে হাজারো মানুষের ভিড়ে মেলার একপ্রান্তে দেখা মেলে লালসালু ও সাদা পোশাকের জটাধারী অসংখ্য আধ্যাত্মিক চেতনাধারী সাধক, ফকির এবং বৈষ্ণব- বৈষ্ণবীদের।

এ সময় বৈষ্ণব- বৈষ্ণবীদের কাফেলায় ১২ সদস্যের সন্ধান মিলে। তারা কুষ্টিয়ার ছেউরিয়া থেকে এসেছেন বলে জানালেন।

এ সময় কথা হলে সুনীতি নামে এক বৈষ্ণবী বললেন, আমরা কোনো জাত ধর্মে নয়, আমরা মানব ধর্মে বিশ্বাস করি। আমাদের সাধন ভজন এ মানব ধর্মকে নিয়েই।

অপরদিকে গাঁজা সেবনকারী এক লালসালু পরা অশতিপর জটাধারী বললেন, সিদ্ধি ছাড়া সাধনা করা কঠিন, তাই তারা সাধন ভজনের অংশ হিসেবে সিদ্ধি সেবন করে থাকেন।

এ সময় তিনি আরও দাবি করেন, এ বেশেই তিনি দীর্ঘ ৬০ বছর ধরে কুঁড়িখাই মেলায় অংশ নিচ্ছেন।

এলাকার সংস্কৃতি ও সমাজকর্মী রাজিব সরকার পলাশ জানালেন, এ মাজার ও এ মেলা হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে সকল জাত ও পথের লোকজনের এক অপূর্ব মেলবন্ধন।

কটিয়াদী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইসরাত জাহান কেয়া জানান, ভক্ত অনুরাগীদের পাশাপাশি এ মেলায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বিভিন্ন ধর্ম-বর্ণের বিপুলসংখ্যক লোকজনের আগমন বিশেষ উৎসব আনন্দের সৃষ্টি করে। এ শত বছরের ঐতিহ্য বাঙালি সংস্কৃতির হিরণ্ময় স্মারক।

কটিয়াদী উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান আবদুল ওয়াহাব আইনুদ্দিন বললেন, কিশোরগঞ্জ জেলাসহ সারা দেশে কুঁড়িখাই মেলার বিশেষ খ্যাতি রয়েছে। আর এ জন্য প্রতি বছর এ মেলায় লাখো মানুষের সমাগম ঘটে। এটি কটিয়াদীবাসীর গর্বিত অতীত ও ইতিহাসের অংশ।

উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা দুজনই মেলার সুষ্ঠু পৃষ্ঠপোষকতা ও উপযুক্ত নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থাপনা ও নজদারির ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।

জেলার খবর
অনুসন্ধান করুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×