মেঘনা পাড়ে কলাগাছের শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা

প্রকাশ : ২২ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০০:৫১ | অনলাইন সংস্করণ

  রায়পুর (লক্ষ্মীপুর) প্রতিনিধি

মেঘনা পাড়ে কলাগাছের শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা

ভাষা শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা তাদের। তবে ধারে-কাছে কোনো শহীদ মিনার নেই। কিন্তু মহান একুশের বিশেষ দিনে ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা তো জানাতেই হবে। অগত্যা কলাগাছ দিয়েই শহীদ মিনার গড়লেন তারা। জানালেন বিনম্র শ্রদ্ধা।

বৃহস্পতিবার ভাষা আন্দোলনের শহীদদের প্রতি এভাবেই শ্রদ্ধা নিবেদন করেন লক্ষ্মীপুরের রায়পুর উপজেলার দক্ষিণ চরবংশী ইউনিয়নের পুলিশ ফাঁড়ি সংলগ্ন মেঘনা নদীর পাড়ে হাজীমারা সানরাইজ আইডিয়াল স্কুলের শিক্ষক, শিক্ষার্থীসহ জেলে ও দিনমজুররা।

এ প্রতিষ্ঠানে বর্তমানে প্রধান শিক্ষকসহ ৮ জন সহকারী শিক্ষক কর্মরত ও প্রায় ১৮০ শিক্ষার্থী অধ্যায়নরত রয়েছে।

বুধবার সন্ধ্যায় কলাগাছ দিয়ে শিক্ষক, শিক্ষার্থী, জেলে ও দিনমজুররা প্রতীকী শহীদ মিনার গড়েন। বৃহস্পতিবার ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান ওই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীসহ শতাধিক গ্রামবাসী। ভাষা আন্দোলনের প্রতি অদম্য আবেগ ও ভাষা শহীদদের প্রতি গভীর ভালোবাসার প্রমাণ রাখেন এভাবে।

মেঘনা উপকূলীয় অঞ্চল বেড়িবাঁধ ও নদীর পাড়ে গিয়ে দেখা গেছে, কলাগাছের তিনটি টুকরো মাটিতে পুঁতে তৈরি করা হয়েছে তিনটি মিনার। প্রতিটি মিনারের ওপর অপেক্ষাকৃত ছোট কলাগাছের তিনটি টুকরো তির্যকভাবে আটকে দেয়া হয়েছে। কাগজ দিয়ে মুড়ে দেয়া হয়েছে প্রতিটি মিনার। টাঙিয়ে দেয়া হয়েছে জড়ি, রঙিন কাগজ, নানান রঙের বেলুন আর ফুল।

সকালে দেখা গেছে, নদীর পাড়ে জেলে, দিনমজুর, বেড়িবাঁধের দুপাশের আশ্রিত পরিবারের সদস্য, ওই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক ও শিশু কিশোর বয়সী শিক্ষার্থীরা দাঁড়ালেন তাদের গড়া শহীদ মিনারের সামনে। এর পর শিক্ষক শিশু শিক্ষার্থীদের, আবার শিশু শিক্ষার্থীরা জেলে ও দিনমজুরদের হাতে তুলে দিলেন একটি ফুলের স্তবক।

কয়েকজন শিক্ষার্থী ও জেলে পরিবারের সদস্য মিলে এই স্তবক নিয়ে রাখেন মিনারের বেদিতে। এর পর অন্য সবাই একে একে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। শেষে তারা নীরবে দাঁড়িয়ে থাকেন কিছুক্ষণ। শ্রদ্ধা জানানো শেষে শ্রমিকেরা যে যার কাজে মন দেন।

স্কুলের শিক্ষক মো. ফরিদ ও সাজিয়া বেগম বলেন, মেঘনা নদীর পাড়ে আশ্রায়ন কেন্দ্রের পাশে কয়েকজন শিক্ষানুরাগীর উদ্যোগে এ প্রতিষ্ঠানটি গত বছরের জানুয়ারি মাসে প্রতিষ্ঠিত হয়। এ উপকূলীয় অঞ্চলের বেশিরভাগ পরিবারের সদস্যরা জেলে ও দিনমজুর। ভোর থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত নদীতে মাছ ধরা ও দিনমজুর কাজ করতে হয় তাদের। তাদের পরিবারের সন্তানরা দূরের কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গিয়ে ভাষা শহীদদের শ্রদ্ধা জানানোর বাড়তি সময় হাতে থাকে না। তাই তারা নদীর পাড়ে ব্যক্তি মালিকানায় প্রতিষ্ঠিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেই একটি শহীদ মিনার নির্মাণ করার কথা ভাবেন।

তারা বলেন, এ ভাবনা থেকে আমরা শিক্ষকরাসহ কয়েকজন যুবক মিলে কলাগাছ দিয়ে একটি শহীদ মিনার তৈরি করি। এর খরচ আমরা নিজেরাই ভাগাভাগি করে দিয়েছি।

অভিভাবক ও শিক্ষানুরাগী জুলহাস মোল্লা বলেন, যারা আমাদের ভাষার জন্য মূল্যবান জীবন দিয়েছেন, তাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে গিয়ে ব্যবসার ক্ষতি হলেও এখানে শিশুদের সঙ্গে সময় দিয়ে আনন্দিত হয়েছি। ছোট হলেও এখানে একটি স্থায়ী শহীদ মিনার নির্মাণ করা হলে আমরা খুব সহজে শহীদদের শ্রদ্ধা জানাতে পারতাম। নদীর পাড়ে একটি ফাঁড়ি থানা থাকলেও সেখানেও শহীদ মিনার নেই।

প্রধান শিক্ষক আব্বাস হোসেন বলেন, ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর জন্য কাজ কিছুটা পিছিয়ে পড়লেও আমরা তা নমনীয়ভাবে দেখছি। এখানে সবার সম্মিলিতভাবে একটি স্থায়ী শহীদ মিনার তৈরি করা যায় কি না, ভেবে দেখব আমরা।