‘অস্ত্রসহ একটা সুন্দর ছবি তোলাই ছিল বাবার শেষ ইচ্ছা’

  সুশীল প্রসাদ চাকমা, রাঙ্গামাটি প্রতিনিধি ২২ মার্চ ২০১৯, ২২:৩৪ | অনলাইন সংস্করণ

বাঘাইছড়িতে সন্ত্রাসীদের গুলিবর্ষণে নিহত আনসার সদস্য মিহির কান্তি দত্তের স্ত্রী সেগুরাণী দত্ত ও ছেলে পিয়াল দত্ত
বাঘাইছড়িতে সন্ত্রাসীদের গুলিবর্ষণে নিহত আনসার সদস্য মিহির কান্তি দত্তের স্ত্রী সেগুরাণী দত্ত ও ছেলে পিয়াল দত্ত

‘বাবা চাকরি করতেন আনসার বাহিনীতে। দায়িত্বে ছিলেন ইউনিয়ন প্লাটুন কমান্ডার। ১৮ মার্চ দ্বিতীয় ধাপে অনুষ্ঠিত বাঘাইছড়ি উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় তাকে দায়িত্ব দেয়া হয়, উপজেলার সাজেকের কংলাক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে।’

‘কেন্দ্রটিতে নির্বাচনের ডিউটি পালনে যেতে হয়েছে একদিন আগে। সহায়তার জন্য আমিও যাই সঙ্গে। তদুপরি দুর্গম ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হওয়ায় নিরাপত্তার বিষয়টিও ভেবেছিলাম। এসব কিছু ভেবে সেদিন বাবার সঙ্গী হওয়াটাই ছিল নিতান্তই গুরুদায়িত্ব। কিন্তু তবু বাবাকে যে এভাবে প্রাণ দিতে হবে, তা তো মোটেও ভাবনার মধ্যে ছিল না।’

শুক্রবার যুগান্তরকে অশ্রুসিক্ত নয়নে কথাগুলোর বর্ণনা দিচ্ছিলেন ১৮ মার্চ বাঘাইছড়িতে সন্ত্রাসীদের গুলিবর্ষণে নিহত আনসার সদস্য মিহির কান্তি দত্তের ছেলে পিয়াল দত্ত।

পিয়াল মা সেগুরাণী দত্তকে নিয়ে জেলা সদরে এসেছিলেন বাহিনীর পক্ষ থেকে দেয়া আর্থিক সহায়তা নিতে।

এ সময় আনসার-ভিডিপি জেলা সদর দফতরের প্রাঙ্গণে দাঁড়িয়ে পিয়াল বলেন, নির্বাচনের আগের দিন বিকালে আমরা যখন কেন্দ্রে পৌঁছাই, তখন বাবা আমাকে আদরের সুরে অনেকটা আবদার রেখে বলেন ‘পিয়াল, তুই অস্ত্রসহ আমার একটা সুন্দর করে ছবি তোল। তোর তোলা ছবি খুব চমৎকার হয়। তা ছাড়া ডিউটি পালনকালে কোনোবার অস্ত্রসহ আমার ছবি উঠাইনি।’

বাবার আবদারে সঙ্গে সঙ্গে তার পোজ দেয়া একটা ছবি তুলি আমার মোবাইল ফোনের মেমোরিতে। কিন্তু ছবিটা যে বাবার স্মৃতি হয়ে যাবে, তা তো মোটেও ভাবনায় ছিল না। আর এটা যে বাবার অন্তিম ইচ্ছা ছিল, জানতাম না তা। বলতে বলতে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েন পিয়াল।

এ সময় স্বামীর শোকে অনেকটা নির্বাক পিয়ালের মা সেগুরাণীও। দুচোখে গড়িয়ে পড়ছিল জল। নিজেকে যেন ধরে রাখতে পারছিলেন না।

পিয়াল জানান, খাগড়াছড়ি সরকারি কলেজ থেকে এবার স্নাতক ডিগ্রির ফাইনাল পরীক্ষা দিয়েছেন। তাদের তিন ভাইয়ের মধ্যে বড় ভাই সেবু দত্ত বেকার আর ছোট ভাই এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছে।

তিনি বলেন, ঘটনার দিন ভোট গণনা শেষে ফলাফলসহ নির্বাচনী সরঞ্জাম নিয়ে দুটি জিপ গাড়িতে চড়ে কেন্দ্র ছেড়ে রওনা দেন বাঘাইছড়ি উপজেলা সদরের উদ্দেশে। ফিরতি যাত্রাকালে আমাদের সঙ্গে ছিল শুধু পুলিশ। বাঘাইহাট পার হয়ে মাচালং পৌঁছলে যোগ হয় নিরাপত্তা বাহিনীর টহল গাড়ি। তখন সামনে সেনাবাহিনী আর পেছনে ছিল বিজিবির গাড়ি। আমি বাঘাইহাট নেমে যাই। সেখান থেকে মোটরসাইকেল নিয়ে সরাসরি চলে যাই বাঘাইছড়ি উপজেলা সদরে।

তিনি আরও বলেন, বাবা বলেছেন- বাড়িতে পৌঁছার সঙ্গে সঙ্গেই ফোন দিতে। না হয় চিন্তায় থাকবেন। বাড়ি পৌঁছে বাবার নম্বরে বারবার কল দিয়ে দেখি, তার ফোন বন্ধ। কিছুক্ষণ পর শুনতে পাই, গুলিবর্ষণের দুঃসংবাদটি। আমি তখন ভাষা হারিয়ে ফেলি।

মারিশ্যা-দীঘিনালা সড়কের ৯ কিলোমিটারে বাবাদের গাড়িবহরে সন্ত্রাসীরা যখন অতর্কিত ব্রাশফায়ার করে, তখন নিরাপত্তাবাহিনীর প্রহরার গাড়ি প্রায় আধা কিলোমিটার দূরত্বে চলে যায়। এ ঘটনায় প্রাণ হারান ৭ জন- যাদের মধ্যে পিয়ালের বাবাসহ আনসার-ভিডিপি সদস্য ছিলেন চারজন। তিনি ভবিষ্যতে পাহাড়ে আর যাতে কেউ এভাবে স্বজনহারা না হয়, সে জন্য উপযুক্ত পদক্ষেপ নিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান পিয়াল।

বাঘইছড়ি উপজেলা সদরের করেঙ্গাতলীর বাসিন্দা মিহির কান্তি দত্তের স্ত্রী সেগুরাণী দত্ত বলেন, আমাদের সংসারে উপার্জনকারী ছিলেন শুধু আমার স্বামী। এখন তিন ছেলে নিয়ে কী করব, চোখে পথ দেখছি না। তিনি তার ছেলেদের চাকরির জন্য আবেদন জানান।

এ ঘটনায় নিহত আনসার-ভিডিপির অন্য তিন সদস্যের মধ্যে উপজেলা সদরের পশ্চিম লাইল্যাঘোনার বাসিন্দা বিলকিস আক্তারের স্বামী রহমত উল্ল্যা মারা গেছেন চার বছর আগে। এরপর থেকে তার দুই মেয়ে জান্নাতুল নুর ও মাউয়াকে নিয়ে সংসারের হাল ধরেছিলেন একাই। জান্নাতুল নুর এবার এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছে। ওর ছোট বোন মাউয়ার বয়স মাত্র চার। ওদের এখন বাবা, মা কেউ নেই। জানা নেই ভবিষ্যৎ নিয়ে।

জান্নাতুল নুর জানান, মাকে হারিয়ে এখন খালার আশ্রয়ে চলে গেছি। মায়ের অপেক্ষায় পথ চেয়ে থাকা মাউয়ার কান্না থামানো যাচ্ছে না। ও এখন খালার কোলে শুধু অঝোরে কান্নাকাটি করে। ভবিষ্যৎ কী হবে, কিছুই জানি না।

নিহত আনসার-ভিডিপি সদস্য আল-আমিনের বাবা ও কাচালং বাজারের বাসিন্দা মো. সেলিম বলেন, এভাবে যে ছেলেকে চিরতরে হারাতে হবে কখনও কল্পনায় ছিল না। ছেলেকে হারিয়ে আজ আমরা যেন বাকরুদ্ধ। হত্যার বিচার তো চাই। কিন্তু সুষ্ঠু বিচার হবে বলে তো মনে হয় না। কত হত্যার ঘটনা ঘটে যাচ্ছে কিন্তু বিচার তো নেই।

তিনি বলেন, আমার দাবি একটাই, ভবিষ্যতে যাতে আর এ ধরনের ঘটনা না ঘটে। যাকে হারিয়েছি তাকে তো ফিরে পাওয়ার নয়। ছোট ছেলে নবম শ্রেণিতে পড়ে। ভবিষ্যতে তার পড়ালেখা ও চাকরির সহায়তা কামনা করি।

একই এলাকার বাসিন্দা নিহত জাহানারা বেগমের স্বামী তসলীম আহম্মদ বলেন, আমি স্ত্রীকে হারিয়েছি। স্বজন হারানোর বেদনা- যে হারায়, সেই বোঝে। আমার বলার আর ভাষা নেই। শুধু বলব, আমাদের মতো আর যাতে কাউকে এভাবে স্বজন হারাতে না হয়, তা যেন করে সরকার।

বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর চট্টগ্রাম ও পার্বত্য রেঞ্জের উপ-মহাপরিচালক মো. সামছুল আলম বলেছেন, আমাদের পরিবারের যে চার সদস্যকে হারিয়েছি, তাদেরকে আর কখনও ফিরিয়ে আনতে পারব না। তবে তাই বলে তাদের সঙ্গে সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন হবে, তা কখনও নয়। আমরা আপ্রাণ চেষ্টা করব, তাদের পরিবারের সদস্যদের সহায়তায় থাকতে।

এ ঘটনায় নিহত অন্য তিনজন হলেন- বাঘাইছড়ি উপজেলা সদরের পূর্ব লাইল্যাঘোনার বাসিন্দা আবদুল কুদ্দুসের ছেলে নিউ লাইল্যাঘোনা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মো. আবু তৈয়ব, বাঘাইছড়ি উপজেলা সদরের আবু তাহেরের ছেলে কিশলয় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক আমির হোসেন এবং খাগড়াছড়ির দীঘিনালার মেরুন এলাকার বাসিন্দা তপতি চাকমার ছেলে মন্টু চাকমা।

ঘটনার দিন অনুষ্ঠিত বাঘাইছড়ি উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে আবু তৈয়ব ও আমির হোসেন পোলিং অফিসার এবং মন্টু চাকমা নির্বাচিত চেয়ারম্যান প্রার্থী সুদর্শন চাকমার পোলিং এজেন্ট হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন।

জেলার খবর
অনুসন্ধান করুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×