‘টাকা না দিলে রক্ত বমি হবে’ বলে ভিক্ষুকের টাকাও লুট!

  মো. রইছ উদ্দিন, গৌরীপুর (ময়মনসিংহ) প্রতিনিধি ২২ মার্চ ২০১৯, ২২:৪৪ | অনলাইন সংস্করণ

কথার জাদুতে মানুষকে বশ করে শিকর-তাবিজ বিক্রি করে প্রতারণা
কথার জাদুতে মানুষকে বশ করে শিকর-তাবিজ বিক্রি করে প্রতারণা

হালকা গড়নের কালো বর্ণ। লিকলিকে চেহারা। একজন মানুষ দাঁড়ালেন। কাঁধের বাক্স মাটিতে রেখে এদিক-ওদিক তাকান। এরপর মুখে আল্লাহ-ঈশ্বর, রাম-নাম জপা শুরু। সঙ্গে সঙ্গে দু-একজন করে ভিড় বাড়ছে।

বাক্স থেকে বের করেন সাপ আর বেজি। ‘সাপের সঙ্গে বেজির লড়াই’ দেখানোর ফান্দে ছন্দে আনন্দে আটকা পড়েন সাধারণ মানুষ। বিক্রি হয় সর্বরোগের দাওয়াই (ওষুধ) ‘একটি শেকড়’র টুকরা। আল্লাহর কসম ও ওস্তাদের দোহাই দিয়ে শুরু ‘টাকা চাইব না’। টাকা না দিলে রক্ত বমি হবে- জীবনের বিনাশ ঘটবে ভয়-ভীতিতে আচ্ছন্ন করে প্রকাশ্যে চলছে প্রতারণা।

এমন দৃশ্য দেখা হলো শুক্রবার ময়মনসিংহের গৌরীপুর উপজেলার ধানমহালে।

‘একটি গাছের শেকড়ের টুকরা’ হাতে মানুষটির নাম মো. সোহেল মিয়া। বয়স ৪০ ছুঁইছুঁই। তার বাবার নাম মো. মন্টু মিয়া। বাড়ি গাজীপুর জেলার পূবাইল উপজেলার মিরেরবাজার থানার জয়দেবপুর কলের বাজার।

মজমার এ পর্যায়ে এই সোহেল বের করেন একটি গাছের শেকড়। এই শেকড় তালু নামা, শিশুদের রাতে ভয় পাওয়া, বিপদমুক্ত রাখা, সাপে কাটবে না, পানিতে প্রস্রাব ধরবে না বলতে বলতে একপর্যায়ে প্রেমের ব্যর্থতা, স্ত্রীর অমনোযোগী, শক্তি বৃদ্ধিতেও কার্যকর। এরপরেই এ শেকড় ক্যানসার, অশ্ব-দুর্বলতাসহ জীবনের যত বাধা তা অতিক্রম, ছাত্রছাত্রী-ছেলেমেয়েদের পড়ায় অমনোযোগী, স্বামী-স্ত্রী, প্রেমিক-প্রেমিকাকে ভাগে আনা (বস করা) সবকিছুর দাওয়াই (ওষুধ) হিসেবে উপস্থাপিত হয়। মাঝেমধ্যে সাপ আর বেজি নাড়ানাড়ি চলতে থাকে।

সোহেলের মিষ্টি কথার চাতুরিতে ততক্ষণে মজমার লোকজন অন্ধ বিশ্বাসী। সাধারণ মানুষের মনজয় শেষ। এবার সবার হাতেই তুলে দেন সেই গাছের শেকড়। এক পা নড়বেন না, শেকড় নিয়ে চলে গেলে মরে যাবেন, রক্ত বমি হবে, আল্লাহর দোহাই লাগে কেউ নড়বেন না! এমন বক্তব্যে শিশু, বৃদ্ধ আর মহিলারও আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। প্রথমে তিন গ্রামের ৩ জনের কাছে থেকে ৫ টাকা করে নেয়া হয়। এ টাকা নেন সাপের খাবারের জন্য।

এরপরেই বেরিয়ে আসে লোমহর্ষক ভৌতিক কাহিনী। এই শেকড়ের গুণাগুণের সঙ্গে এবার যুক্ত হয় অবহেলা করলে তার ভয়ানক পরিণতির গল্পও! সোহেলের বক্তব্যে গলা শুকিয়ে দর্শকরা বাঁচার চেষ্টা করছেন, কেউ কেউ শেকড় দিয়ে চলে যেতেও চাইছেন।

কিন্তু তার উপায় নেই, হাতে ধরে দেয়া হলো শেকড় যত্নে ব্যবহারের জন্য একটি লোহার তাবিজ। এর মূল্য ৫০ টাকা (যার মূল্য ২-৩ টাকা হবে); সঙ্গে আছে না দিলে ভয়ঙ্কর পরিণতি! পকেটে না থাকলে দাবি নেই।

এমন বক্তব্যে ভীত হয়ে পৌর শহরের পশ্চিম দাপুনিয়ার কদর বানু সঙ্গে থাকা ৪০ টাকাই দিয়ে দেন। পেশায় তিনি ভিক্ষুক, যা ছিল তা দিয়েই এবার বাঁচতে চাইছেন। পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা আরকে সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণির ছাত্র সোহেল ২৫ টাকা তুলে দেন।

ভয়ে মুখ লাল হয়ে গেছে নিয়ামুলের। সঙ্গে থাকা ১৫ টাকা দিয়েই চলে যেতে চাইছেন। সে শহরের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছাত্র। এর মাঝে ৮-১০ জন ব্যবসায়ীও তার ফাঁদে আটকে পড়েন। শেকড়কে বিশ্বাস করেই জরিমানা দেন। তার নাতির জন্য। তবে সঙ্গে আছে ৪০ টাকা। যারা ৫০ দিতে পারেনি তাদের বাকি টাকা মসজিদে দেয়ার হুকুম দেন এই সোহেল। ৩০-৪০ মিনিটের মজমায় শত মানুষের সঙ্গে প্রকাশ্যে এ প্রতারণা চালান।

এ প্রতিনিধি কথা বলতে চাইলে পাশ থেকে ছুটে আসেন তার ওস্তাদ। একই এলাকার আবদুর রশিদের ছেলে মো. বিপ্লব হোসেন। তিনি অবশ্য প্রথমে সাংবাদিকদের দেখে ক্ষেপে যান। অবশেষে স্বীকার করেন এ শেকড় তাদের রুটি-রুজি। ভিক্ষুকের কাছ থেকেও টাকা নেয়ার ঘটনায় শিষ্যকে দু-চারটা থাপ্পড় দেন। এরপর প্রকাশ্যে ভুল স্বীকার করেন।

এ প্রসঙ্গে উপজেলা নির্বাহী অফিসার ফারহানা করিম বলেন, কেউ অভিযোগ করেনি। তবে এ ধরনের প্রতারকদের প্রতারণার খবর পাওয়া গেলে তাদের বিরুদ্ধেও ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে শাস্তির আওতায় আনা হবে।

জেলার খবর
অনুসন্ধান করুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×