বাঘাইছড়িতে ব্রাশফায়ারে নিহত ৭

চালকদের সাহসিকতায় গুলি থেকে রক্ষা পায় অর্ধশতাধিক প্রাণ

  বাঘাইছড়ি (রাঙ্গামাটি) সংবাদদাতা ২৮ মার্চ ২০১৯, ১৫:১৭ | অনলাইন সংস্করণ

চালকদের সাহসিকতায় গুলি থেকে রক্ষা পায় অর্ধশতাধিক প্রাণ
বাঘাইছড়িতে দক্ষ চালক মো. ইসমাই, মো. আল আমিন ও মো. রুবেল। ছবি: যুগান্তর

যে সময়ে চালকদের হঠকারিতা, বেপরোয়া আচরণে প্রতিদিন বেশ কয়েকটি করে তাজা প্রাণ ঝরে পড়ছে, যে মুহূর্তে সারা দেশে চালকদের বেপরোয়া ড্রাইভিংয়ের কারণে ব্যাপক আন্দোলন হচ্ছে; ঠিক সেই সময় দায়িত্ব ও কর্তব্যপরায়ণতার অনুপম দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন বাঘাইছড়ির তিন জিপ চালক।

তাদের কর্তব্যপরায়ণতা ও সাহসিকতার কারণে সন্ত্রাসীদের গুলি থেকে বেঁচে যায় অর্ধশতাধিক প্রাণ।

বাঘাইছড়ি উপজেলা নির্বাচনে সাজেকের কংলাক, বাঘাইহাট ও মাচালং ভোটকেন্দ্রে দায়িত্ব পালন শেষে ফেরার পথে সন্ত্রাসীদের ব্রাশফায়ারে সাতজন নিহত হয়েছেন। আহত হন অনেকেই। প্রাণে বেঁচে যায় অর্ধশতাধিক লোক।

১৮ মার্চ সন্ধ্যা ৬টার দিকে বাঘাইছড়ি ফিরছিলেন ওই তিনটি কেন্দ্রে দায়িত্ব পালন করা কর্মকর্তারা। তাদের বহনকারী তিনটি গাড়ি দীঘিনালা-মারিশ্যা সড়কের ৯ কিলোমিটার এলাকায় পৌঁছানোর পর রাস্তার পাশে ও পাহাড়ের ওপরে ওঁৎ পেতে থাকা অজ্ঞাত বন্দুকধারীরা ব্রাশফায়ার করে বহনকারী জিপগাড়ির ওপর।

তবে তিনজন জিপগাড়ি (স্থানীয় নাম-চাঁন্দের গাড়ি) চালকের বীরত্ব ও সাহসিকতায় অনেক মানুষ প্রাণে বেঁচে যান। ওই তিনজনের নাম মো. রুবেল, আল-আমিন ও ইসমাইল হোসেন।

একান্ত সাক্ষাৎকারে এই নায়করা তাদের সেদিনের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। এ সময় চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি তারা।

সম্প্রতি গুলিবিদ্ধ চালক ইসমাইলের সঙ্গে মোবাইল ফোনে কথা বলার সময় অপর প্রান্তে কান্নায় ভেঙে পড়েন ইসমাইল হোসেন। কান্নাভেজা কণ্ঠে বলছিলেন- আমরা সর্বমোট চারটি গাড়ি একসঙ্গে রওনা দিই। ৯ কিলোমিটার পৌঁছালে আমাদের গাড়িতে বৃষ্টির মতো গুলি আসতে থাকে। আমার সামনে তিনটি গাড়ি, আমার গাড়িটি সবার শেষে। ওই সময় গুলিতে ঘটনাস্থলেই আমার গাড়িতে দুজন নিহত হন এবং আমিও ওই সময় গলায় গুলিবিদ্ধ হই।

তিনি আরও বলেন, গুলিবিদ্ধ অবস্থায় গাড়ি চালাতে অনেক কষ্ট হচ্ছিল। আমি তখন ভেবেছিলাম- আমার গাড়িতে ২৪ জন লোক, যদি নিজের জীবনও চলে যায়, তার পরও যতগুলো প্রাণ বাঁচাতে পারি এমন প্রচেষ্টায় গাড়ি না থামিয়ে চালাতে থাকি এবং গাড়িতে থাকা আহত-নিহত সবাইকে নিয়ে হাসপাতালে যাই।

সেখানে গাড়ি থেকে যখন একের পর এক লাশ বের হচ্ছিল এবং আহতদের রক্তভেজা শরীরে আহজারি দেখে আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। এর পর আর কী হয়েছে আমার মনে নেই। আর এখন ওই দিনের ঘটনা শুধু চোখের সামনে স্মৃতি হিসেবে বারবার ভেসে ওঠে।

সেদিন জীবনবাজি রাখা আরেক চালক মো. আল আমিন। তিনি বলেন, ৯ কিলোতে পৌঁছামাত্র কিছু বুঝে ওঠার আগেই পাহাড়ের পাশ থেকে অতর্কিত গুলি আসতে থাকে। এর মধ্যেই আমার পাশে থাকা পুলিশের এসআই গুলিবিদ্ধ ছাড়াও পরপর গাড়িতে অনেকেই গুলিবিদ্ধ হতে থাকেন। কী করব বুঝে ওঠতে পারছিলাম না। এর মধ্যে আমার গাড়ির হেলপারও গুলিবিদ্ধ হয়। আমি তখন দ্রুতগতিতে গাড়ি নিয়ে হাসপাতালে ছুটে যাই। আর সেদিন আল্লাহর রহমতে আমার কিছু হয়নি।

আরেক চালক রুবেল বলেন, নির্বাচনের দিন দায়িত্বে থাকা আমাদের তিনটি গাড়ি বিজিবির প্রহরায় বাঘাইছড়ি যাচ্ছিলাম। এ সময় গাড়িবহরের মধ্যে বিজিবির গাড়ি সামনে ছিল। বিজিবির গাড়ির পেছনের গাড়ি ছিল আমার। ৯ কিলো পৌঁছামাত্র আমাদের গাড়িবহরের ওপর গুলিবর্ষণ শুরু হয়। তবে গুলিবর্ষণ শুরু হওয়ার আগে ঘটনাস্থল থেকে আমার গাড়ি এবং বিজিবির গাড়ি পার হয়ে যায়।

তবে তারা আমাদের লক্ষ্য করে গুলি চালাতে থাকে। এতে একজন গুলিবিদ্ধ হন। এ সময় পেছনে থাকা দুটি গাড়িতেও তাদের গুলি চলতে থাকে।

ওই ঘটনায় অল্পের জন্য বেঁচে যাওয়া মাথায় গুলি লাগা আনসার-ভিডিপির কমান্ডার কবির হোসেন ও আহত পুলিশের এসআই রজব আলী বলেন, দায়িত্ব পালন শেষে ফেরার পথে পাহাড়ের ওপর এবং দুই পাশ থেকে অতর্কিতভাবে বৃষ্টির মতো গুলি আসছিল। ঘটনাস্থলেই নিহত দুজন এবং ভেতরের সবাই গুলিবিদ্ধ হওয়ায় আমাদের হাতে অস্ত্র থাকলেও পাল্টা জবাব দেয়ার সুযোগ হয়নি।

তিনি বলেন, আমার মাথায় ও পায়ে গুলি লাগে। ভাগ্যের জোরে বেঁচে গেছি। তবে আমাদের এই বেঁচে যাওয়া সৃষ্টিকর্তার পর চালকদের দুঃসাহসেই ছিল প্রধান অবদান।

তিনি আরও বলেন, ওদিন চালকদের সাহসিকতায় অর্ধশতাধিক লোক প্রাণে বেঁচে যায়। তারা যদি ওই সময় ভয়ে গাড়ি থেকে নেমে পালানোর চেষ্টা করত, হয়তো গাড়িতে থাকা সবার প্রাণ যেত বন্দুকধারীদের হাতে। আমার অবাক লাগে, চালক ইসমাইল গুলিবিদ্ধ হওয়ার পরও কীভাবে গাড়ি চালিয়ে আমাদের হাসপাতালে নিয়ে গেল। তার এই সাহসিকতা আমাদের সবার জীবন দানের উছিলামাত্র। আমরা তার দ্রুত সুস্থতা কামনা করছি এবং তাদের এই সাহসিকতার জন্য সরকারের কাছে পুরস্কার ঘোষণার দাবি করছি।

এদিকে চালকদের দুঃসাহসের জন্য বাঘাইছড়ি উপজেলা নির্বাহী অফিসার নাদিম সরোয়ার বলেন, চালকের বীরত্ব ও সাহসিকতায় অনেক মানুষ প্রাণে বেঁচে যান। তাদের সেই বীরত্ব সাহসিকতা এখন উপজেলার সবার মুখে মুখে। আমরা সরকারের পক্ষ থেকে চালকদের এই সাহসিকতার জন্য পুরস্কারের ব্যবস্থা করতে আমি আমার ওপরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলেছি।

ঘটনাপ্রবাহ : উপজেলা নির্বাচন ২০১৯

আরও
জেলার খবর
অনুসন্ধান করুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×