সম্মুখ সমরে জিতলেও জীবনযুদ্ধে পরাজিত সোলায়মান!

  মাহবুব রহমান, রংপুর ব্যুরো ০৩ এপ্রিল ২০১৯, ২২:৩০ | অনলাইন সংস্করণ

বাড়িতে বসে সেলাই মেশিন নিয়ে দর্জির কাজ করেন সোলায়মান মিয়া
বাড়িতে বসে সেলাই মেশিন নিয়ে দর্জির কাজ করেন সোলায়মান মিয়া

একজন মুক্তিযোদ্ধা নাম সোলায়মান মিয়া। বয়সে বৃদ্ধ। মাটির ভাঙা ঘরেই স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে বসবাস। সেখানেই সেলাই মেশিন নিয়ে দর্জির কাজ করেন। আর পাশের শাল্টিরহাট বাজারে ব্রয়লার মুরগি জবাই করেন।

এই তার দৈনন্দিন আয়োর উৎস। তা দিয়ে চলে তার কষ্টের সংসার।

মুক্তিযুদ্ধের সম্মুখ সমরে জয়লাভ করলেও জীবনযুদ্ধে পরাজিত এ মুক্তিযোদ্ধা। বর্তমানে আয় রোজগার ঠিকমতো না থাকায় স্ত্রী, ৮ কন্যা ও ২ পুত্রসন্তানকে নিয়ে তিনি আর কষ্টে টানতে পারছেন না।

সোলায়মান মিয়ার বাড়ি রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার বালুয়া মাসিমপুর ইউনিয়নের হেলেঞ্চা গ্রামে। বাবা মৃত. শেখ বাহার উদ্দিন।

১৯৭১ সালে ১ এপ্রিল শুকুরেরহাট উচ্চ বিদ্যালয়ে দশম শ্রেণিতে অধ্যয়নরত অবস্থায় কয়েকজন বন্ধু মিলে চলে যান ভারতের ত্রিমোহনী মুক্তিযোদ্ধা প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে। সেখানে ৩ মাস প্রশিক্ষণ শেষে দিনাজপুরের হিলি স্থলবন্দর, দাউদপুর ও মিঠাপুকুরের চৌধুরী গোপালপুর এলাকায় ৬ নম্বর সেক্টরের কমান্ডার খাদেমুল বাশারের নেতৃত্বে অংশগ্রহণ করেন সম্মুখযুদ্ধে।

৬ নম্বর সেক্টরে দিনাজপুরের হিলি ও দাউদপুর এলাকায় যুদ্ধ শেষ করে চলে আসেন মিঠাপুকুরের চৌধুরী গোপালপুর এলাকায়। এ সময় সহযোদ্ধারা তাকে পাঠায় গ্রামের বাড়িতে খাবার নিয়ে আসার জন্য। বাড়িতে প্রবেশ করলেই পাক সেনারা তাকে ঘিরে ফেলে। পাকসেনাদের হাতে ধরা পরে বাবা-মায়ের সামনেই নির্মম নির্যাতনের শিকার হন। অবশেষে কৌশলে পালিয়ে আবারও চৌধুরী গোপালপুর এলাকায় সহযোদ্ধাদের সঙ্গে মিলিত হন। তার কয়েক দিন পরেই দেশ স্বাধীন হয়।

শেখ মো. সোলায়মান মিয়া বলেন, মুক্তিযুদ্ধে জয়লাভের পর আমাকে বাড়িতে আটকে রাখে পরিবারের সদস্যরা। কোথাও যেতে দেননি বাবা-মা। খোঁজখবরও রাখিনি কোনো বিষয়ে। অভাবের সংসারের হাল ধরতে হয়েছে। সরকারিভাবে এ পর্যন্ত পাইনি মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি।

তিনি বলেন, সরকারি স্বীকৃতির জন্য আবেদন করেও লাভ হয়নি। সহযোদ্ধা, বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ রংপুর ও মিঠাপুকুর কমান্ড ইউনিট, মুক্তিযোদ্ধা সমাবেশ এবং স্থানীয় সরকারের প্রত্যয়নপত্র থাকলেও অন্তর্ভুক্ত হতে পারিনি মুক্তিযোদ্ধার তালিকায়।

তিনি আরও বলেন, ৮ সন্তানের মধ্যে মাসুদ রানা ও দিলরুবা আক্তার স্নাতক (সম্মান) পড়ছে রংপুর সরকারি কলেজ থেকে। টাকার অভাবে তারা টিউশনি করে চালাচ্ছেন লেখাপড়ার খরচ।

মাসুদ রানা ও দিলরুবা আক্তার বলেন, আমাদের বাবা দেশের জন্য স্বাধীনতা যুদ্ধ করেছেন। তিনি নানাভাবে নির্যাতনের শিকার হয়েছে পাক সেনাদের হাতে। অথচ, সরকার তাকে এখনও স্বীকৃতি দেয়নি। অভাবের সংসারে ঘানি টানছেন তিনি।

সহযোদ্ধাদের মধ্যে সিদ্দিক মাস্টার, হাশেম আলী, সেকেন্দার আলী ও আবু বক্কর জানান, সোলায়মান মিয়াসহ আমরা এক সঙ্গে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছি। পরে দিনাজপুর ও মিঠাপুকুরের অনেক এলাকায় পাকসেনাদের বিরুদ্ধে সম্মুখযুদ্ধে অংশগ্রহণ করি।

স্থানীয় বাসিন্দা নুর আলম মিয়া বলেন, জন্মের পর থেকে আমরা শুনে আসছি সোলেমান মিয়া মুক্তিযোদ্ধা। তিনি আমাদের কাছে মুক্তিযুদ্ধের নানা গল্প বলেছেন। তিনি আজ পরিবারের ১১ সদস্যকে নিয়ে তিনি মানবেতর জীবনযাপন করছেন।

বালুয়া মাসিমপুর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান ময়নুল হক বলেন, সোলায়মান মিয়াকে এলাকায় সবাই মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে চেনে। কিন্তু সরকারিভাবে তাকে এখনো তালিকাভুক্ত করা হয়নি। বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক।

মিঠাপুকুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার মামুন ভূঁইয়া বলেন, প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত করতে সোলায়মান মিয়া আবেদন করেছিলেন। তার বিষয়টি আপিল বিভাগের আওতায় রয়েছে।

জেলার খবর
অনুসন্ধান করুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×