পা দিয়ে লিখেই এসএসসি জয় বেলকুচির সেই প্রতিবন্ধীর

প্রকাশ : ০৬ মে ২০১৯, ২১:৩৭ | অনলাইন সংস্করণ

  শাহজাদপুর (সিরাজগঞ্জ) প্রতিনিধি

পরিবারের সঙ্গে শারীরিক প্রতিবন্ধী ফজলুর রহমান

সিরাজগঞ্জের বেলকুচি উপজেলার ধুকুরিয়াবেড়া ইউনিয়নের চরগোপালপুর গ্রামের সাহেব আলীর ছেলে ও মিটুয়ানী উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্র শারীরিক প্রতিবন্ধী ফজলুর রহমান। জন্মগতভাবে দুই হাত ও একটি পা নেই।

এক পা দিয়ে চলে, এক পা দিয়ে লেখে। এই এক পা দিয়ে বাড়ি থেকে প্রায় ৩ কিলোমিটার রাস্তা হেটে স্কুলে গিয়ে লেখাপড়া করেছে সে। এ বছর এসএসসি পরীক্ষায় সে জিপিএ- ৩.৫৬ পেয়ে পাশ করেছে।

ফজলুর প্রবল ইচ্ছাশক্তির কাছে দারিদ্রতা ও শারীরিক প্রতিবন্ধকতা আজ হার মেনেছে। সে পিএসসিতে জিপিএ- ২.১৭ ও জেএসসিতে জিপিএ-৩.৭৫ পায়।

প্রতিবন্ধী ফজলুর রহমানকে স্কুলে নিয়ে যেতো তার ছোট বোন আসমা। সেও এবার এসএসসিতে জিপিএ- ৩.০৬ পেয়েছে। হতদরিদ্র পরিবারের এ দুই ভাই বোনের সাফল্যে গোটা গ্রামবাসী আনন্দে মেতে উঠেছে।

ফজলুর রহমান বলেন, প্রতিদিন অনেক কষ্ট করে এক পা দিয়ে লাফিয়ে লাফিয়ে ৩ কিলোমিটার রাস্তা পাড়ি দিয়ে স্কুলে গিয়েছি। আমার বই খাতা কলম আমার বোন আসমা নিয়ে গেছে। যে দিন আমার ছোট বোন স্কুলে যায়নি সেদিন আর কেউ আমার বই নেয়নি। ফলে সেদিন আর আমার স্কুলে যাওয়া হয়নি। আবার বৃষ্টি এলে সে দিনও স্কুলে যেতে পারিনি। সবার দোয়া ও সহযোগিতায় আমি এ রেজাল্ট করতে পেরে খুশি। তবে অর্থাভাবে এইচএসসিতে ভর্তি হতে পারবো কি না তা এখনও জানি না।

ফজলুর রহমানের বাবা সাহেব আলী বলেন, আমি একজন হতদরিদ্র দিনমজুর। ক্ষেত-খামারে কমলা দিয়ে যা পাই তা দিয়ে অভাব অনটনের সংসারই ভালোভাবে চলে না। তার উপর প্রতিবন্ধী ছেলে ও মেয়ের ভরণ-পোষণ কষ্টসাধ্য। লেখাপড়ার খরচ জোগাব কীভাবে।

তিনি আরও বলেন, ফজলুর রহমান লেখাপড়া ভালো হলেও টাকার অভাবে কোনো দিন প্রাইভেট পড়াতে দিতে পারিনি। অনেক সময় বইও কিনে দিতে পারিনি। ফজলুর নামে একটি প্রতিবন্ধী ভাতা কার্ড আছে। ওখান থেকে যে টাকা পাওয়া যায় তা দিয়েই ওর লেখাপড়ার খরচ চলে। আমার কোনো জমিজমা নাই।

সাহেব আলী বলেন, ৪ শতাংশ বাড়ির ভিটায় ভাঙ্গা ঘরে ওদের নিয়ে কোনো রকমভাবে বসবাস করি। ৯ সদস্যেও সংসার আমার একার উপার্জনের উপর নির্ভরশীল। আমার ছোট মেয়ে আসমা খাতুনই ফজলুকে স্কুলে যেতে সাহায্য করে। ওরা দুই ভাই বোনই একসঙ্গে এক ক্লাসেই লেখাপড়া করে।

তিনি আরও জানান, ফজলুরা দুই ভাই ও চার বোন। তিন বোনের বিয়ে হয়েছে। বড় ভাই তাঁতের কাজ করে।

ফজলুর মা সারা খাতুন বলেন, ২০০০ সালে ফজলু বিকলাঙ্গ অবস্থায় জন্ম নেয়। আমরা স্বামী-স্ত্রী কেউ লেখাপড়া জানি না। ছোট মেয়ে আসমা ফজলুকে লেখাপড়ায় সাহায্য করে। ফজলুর দুই হাত ও একটি পা জন্মগতভাবেই নেই। কিছু কিছু কাজ নিজেই করতে পারে। কিছু কাজে তাকে সাহায্য করতে হয়।

মিটুয়ানী উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক আইয়ুব আলী বলেন, ২০১৪ সালে ফজলুর এই বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়। সে লেখাপড়ায় ভালো, স্মরণশক্তি তার প্রখর। তারা দুই ভাই বোনই আমাদের স্কুলের শিক্ষার্থী। তাদের রেজাল্টে আমরা সবাই খুশি।

এ ব্যাপারে সমাজকর্মী মামুন বিশ্বাস বলেন,ফজলুর রহমানের লেখাপড়ার প্রবল ইচ্ছা দেখে ফেসবুকের মাধ্যমে ৭৬ হাজার টাকা অনুদান তুলে দেই। এ টাকা দিয়েই তার এতোদিন লেখাপড়া চলেছে। তার আরও লেখোপড়ার ইচ্ছা রয়েছে। সাহায্য সহযোগিতা পেলে সে আরও ভালো রেজাল্ট করতে পারবে।