শ্রীমঙ্গলে ফসলি জমিতে বালু দস্যূদের থাবা

  সৈয়দ সালাউদ্দিন, শ্রীমঙ্গল (মৌলভীবাজার) প্রতিনিধি ০৭ মে ২০১৯, ২০:৫৬ | অনলাইন সংস্করণ

শ্রীমঙ্গলে ফসলি জমিতে বালু দস্যূদের থাবা
শ্রীমঙ্গলে ফসলি জমিতে বালু দস্যূদের থাবা। ছবি-যুগান্তর

মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে প্রায় সাত বছরের বেশি সময় ধরে বালু উত্তোলনে ইজারা বন্দোবস্ত নেই। অথচ উপজেলা জুড়ে পাহাড়ি ছড়া, ছোট নদী ও ফসলি জমি থেকে চলছে অবৈধ বালু উত্তোলন। উচ্চ আদালতে পরিবশেবাদী সংগঠন বেলার এক রিটকে কেন্দ্র করে ইজারা বন্দোবস্ত বন্ধ রয়েছে।

বন্দোবস্ত না থাকার পরও বালু উত্তোলন থেমে নেই। এতে গত ৭ বছরে সরকার এ খাত থেকে কোটি কোটি টাকার রাজস্ব বঞ্চিত হচ্ছে। স্থানীয় প্রভাবশালী ও বালু দস্যুরা প্রশাসনিক নিষেধাজ্ঞা তোয়াক্কা না করে অবাধে বালু উত্তোলন করায় রাস্তা-ঘাট, ব্রীজ কালভার্ট, ছড়া ভাঙ্গন, ফসলি জমি ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছে। তেল-গ্যাস পাইপের জাতীয় গ্রীড লাইন পড়েছে হুমকির মুখে। একই সঙ্গে পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শুধু ছড়ার বালু নয়। বালু দস্যুদের থাবা পড়েছে এবার কৃষি ও সরকারী খাস জমিতে। বালু দস্যুরা এস্কেভেটর ও ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে মাটি কেটে সমতল ও কৃষি ভূমি উজার করছে।

মাটির ৩০-৪০ ফুট গভীরে গর্ত করে মেশিন বসিয়ে বালু উত্তোলন করছে। ফলে এলাকার ফসলি জমি উজার হয়ে যাচ্ছে। উপজেলার ভূনবীর ইউপির জৈতা ছড়ার দু’পাশ ঘেঁষে শাসন, ইসলামপাড়া ও ইছামতি গ্রাম সরেজমিন ঘুরে এ চিত্র দেখা গেছে।

প্রশাসনের কর্মকর্তারা এ ব্যাপারে নীরব দর্শকের ভূমিকা পালনের অভিযোগ করেছে স্থানীয়রা। ইসলামপাড়া এলাকার দয়াল মিয়ার ছেলে তারেক মিয়া, ইদ্রিস মিয়ার ছেলে কবির মিয়া ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘বালু তোলার ফলে রাস্তাঘাটের ক্ষয়ক্ষতি ও কৃষি জমি ধ্বংস হওয়ায় বার বার অভিযোগ করা হলেও প্রশাসনের পক্ষে জোরালো পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে না’।

উপজেলা প্রশাসন থেকে অভিযান চলমান রয়েছে জানালেও কৃষি জমি নষ্ট করে বালু বিক্রির তথ্য জানেনা বলে জানান শ্রীমঙ্গল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. নজরুল ইসলাম।

সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, জৈতা ছড়ার দু’পাশে নোম্যান্সল্যান্ড ও ব্যক্তি মালিকানা জমিতে পুকুর সমান গর্ত করে মেশিন লাগিয়ে বালু মাটি উত্তোলন করছে এক শ্রেণির বালু দস্যূরা। অভিযোগ পাওয়া গেছে উপজেলার ভূনবীর ইউপি চেয়ারম্যান চেরাগ আলী এই বালু মাটির বেচা কেনার মূল হোতা। নো নোম্যান্সল্যান্ড ও স্থানীয় দরিদ্র কৃষকদের মালিকানা জমি থেকে অল্প দামে এসব বালু মাটি ক্রয় করছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা ও স্থানীয় প্রভাবশালীরা।

স্থানীয়দের অভিযোগ চেরাগ আলী ছাড়াও কবির মোল্লা, কদর আলী, আসলম মিয়া, ঠান্ডা মিয়া, মতলিব, আবু নাঈম, কাউছার মিয়া, সিদাম, সামছু, জমির আলী, ইমান আলী, মুসাহিদ মিয়া, মোছাব্বির মিয়া, উজ্জল মিয়া, সাদ্দাম, মুকাইদ, ইয়াবর মিয়া, জামাল মিয়া, দুদু মিয়া, ইব্রাহিম আলীসহ রাজনৈতিক নেতারা এই অবৈধ বালু ব্যবসার সঙ্গে জড়িত রয়েছেন।

এ বিষয়ে লছনা চৌমহনা এলাকায় ব্যক্তিগত অফিসে কথা হয় চেয়ারম্যানের চেরাগ আলীর সঙ্গে। কৃষকদের জমি গর্ত করে বালু তুলে বিক্রি করার কথা স্বীকার করে তিনি বলেন, ‘আমি ছড়া থেকে বালু তুলি না। জমির মালিকদের কাছ থেকে বালু কিনে বিক্রি করি’।

একজন জনপ্রতিনিধি হয়ে পরিবেশ প্রকৃতির ক্ষতি করে কিভাবে অবৈধ বালু ব্যবসা করেন-এমন প্রশ্নের জবাবে চেয়ারম্যান চেরাগ আলী বলেন ‘হ্যাঁ এতে ক্ষতি হচ্ছে, তবে এখানে বালুর সঙ্গে বড় বড় লোকজন জড়িত আছেন’।

বড় বড় লোকজন কারা জড়িত- জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আপনারা তো সবই জানেন। আমাকে জিজ্ঞেস করেন কেন?’

বালু ব্যবসায়ী মোছাব্বির মিয়া বলেন, ‘শুধু আমি নয় এই বালু তোলার সঙ্গে রাজনৈতিক ব্যক্তিরাও জড়িত আছেন।

তিনি বলেন, ‘উপজেলা যুবলীগের নেতা শিপলু ভাই সিন্ডিকেট লিয়াঁজো করে আমাদের বালু তোলার সুযোগ করে দিচ্ছেন। ‘এ সিন্ডিকেটে আমি প্রতি মাসে ১০/১৫ হাজার টাকা দেই’ বলে জানান মোছাব্বির মিয়া।

শ্রীমঙ্গলে এই অবৈধ বালু ব্যাবসাকে কেন্দ্র করে প্রভাবশালীদের নিয়ে গড়ে ওঠা এক শক্তিশালী সিন্ডিকেটের খোঁজ পাওয়া গেছে। ওই সিন্ডিকেটে জড়িয়ে পড়েছে স্থানীয় প্রভাবশালী নেতারা। ক্ষমতাসীন দলীয় লোক হওয়ায় কেউ প্রতিবাদ করার সাহস পাচ্ছে না।

এ ব্যাপারে উপজেলা যুবলীগের সদস্য বদরুল আলম শিপলু এ অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘আমি এখন সিলেটে আছি’ পরে আলাপ করবেন বলে জানান। এরপর আবারো ফোনে যোগাযোগ করার চেষ্টা করলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

সোমবার উপজেলা নির্বাহী অফিসার নজরুল ইসলামকে প্রকাশ্য কৃষি জমি কেটে বালু উত্তোলনের বিষয়টি জানালে, মেশিন দিয়ে গর্ত করে বালু উত্তোলন সম্পূর্ণ অবৈধ উল্লেখ করে তিনি বলেন ‘এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছি, নিয়মিত ধরছি ও জেল জরিমানাও হচ্ছে। দুপুর ১টায় তিনি এ প্রতিবেদকের কাছ থেকে ঘটনাস্থলের তথ্য সংগ্রহ করেন এবং তাৎক্ষণিক এসিল্যান্ড শাহিদুল আলমকে ঘটনাস্থলে অভিযানে প্রেরণ করছেন বলে জানান।

দুপুর পৌনে ২টায় এসিল্যান্ড শাহিদুলের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, ‘ইউএনও সাহেবের নির্দেশে হাইওয়ে ও থানা পুলিশের সহায়তা নিয়ে অভিযান চালিয়ে ৫টি ট্রাক ৩টি বালু তোলার কাছে নিয়োজিত ইঞ্জিনচালিত মেশিন জব্দ ও বেশ কিছু পাইপ ধ্বংস করা হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘অভিযান চলমান থাকবে এবং বালু দস্যুদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে’।

পরিবেশবাদী সংগঠন বেলার সিলেট বিভাগীয় সমন্বয়কারী অ্যাড. সাহেদা বেগম বলেন ‘হাইকোর্টেও নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বে যারা বালু উত্তোলন ও আইন প্রয়োগে ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছেন তারা সবাই আদালত অবমাননা করছেন’।

জেলার খবর
অনুসন্ধান করুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×