প্যারা অলিম্পিকে যাচ্ছে কিশোরগঞ্জের প্রতিবন্ধী কিশোর নাদিম

  এ টি এম নিজাম, কিশোরগঞ্জ ব্যুরো ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ২১:৩৫ | অনলাইন সংস্করণ

নাদিম

কিশোরগঞ্জের নিকলী উপজেলার সাঁতারু পল্লীর সাঁতারুরা ধারাবাহিক সাফল্য ধরে রেখে এবারও বাংলাদেশ যুব গেমস্ ও প্যারা অলিম্পিকে নিজেদের সম্মানের আসন আরও উজ্জ্বল করেছে। এ বছরের জাতীয় যুব গেমসে ৭টি ইভেন্টের মধ্যে বিভাগীয় পর্যায়ে নিকলীর ৪ জল কিশোরী স্বর্ণ ও ৩ জল কিশোরী রৌপ্য পদক লাভের অসামান্য গৌরব অর্জন করে। এ গ্রামেরই প্রতিবন্ধী কিশোর জলমানব নাদিম মার্চে ইন্দোনেশিয়ায় অনুষ্ঠেয় প্যারা অলিম্পিকে অংশ নিতে যাচ্ছে।

জাতীয় যুব গেমসে অংশ গ্রহণকারীদের মধ্যে সেতু আক্তার দুটি স্বর্ণপদক, ঈশা মনি ১টি স্বর্ণপদক ও আঁখি আক্তার ১টি স্বর্ণপদক এবং সুবর্ণা আক্তার, মীম আক্তার ও মীম সুলতানা একটি করে রৌপ্য পদক পেয়েছে।

এ গ্রামের সাঁতারু ও কোচদের দাবি অনুকূল পরিবেশ পেলে তারা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আরও উজ্জ্বল স্বাক্ষর রেখে দেশের জন্য উত্তরোত্তর গৌরব বয়ে আনতে পারবে তারা। স্থানীয় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জানান, প্রতিকূল অবস্থার মধ্যেও তাদরে বিস্ময়কর সাফল্যে বিস্মিত হতে হয়। তিনিও জানান, এখানে একটি আন্তর্জাতিক মানের সুইমিং পুল স্থাপনের পাশাপাশি উপকরণ সরবরাহ ও প্রয়োজনীয় সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার কথা।

কিশোরগঞ্জের হাওর-অধ্যুষিত পশ্চাৎপদ উপজেলার নাম নিকলী। ঘোড়াউত্ররা নদীর তীরে অবস্থিত নিকলী উপজেলার নিকলী সদর গ্রামটি শত বছর ধরেই সাঁতারুদের গ্রাম হিসেবে পরিচিত। এ গ্রামেরই সাঁতারু কারার মিজান ও কারার সামিদুল সাফ গেমসসহ আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের হয়ে স্বর্ণপদক এনে দিয়েছিলেন। সাঁতারের প্রতি অগাধ ভালোবাসা থেকে এ গ্রামে গড়ে ওঠেছে ভাটিবাংলা ও নিকলী সুইমিং ক্লাব। এ দুটি ক্লাবে ৩২০ জন বিভিন্ন বয়সের শিক্ষার্থী নিয়মিত সাঁতার প্রশিক্ষণ নিচ্ছে। আর এদের মধ্যে রয়েছে ৩০ জন নারী শিক্ষার্থী। বাংলাদেশ সুইমিং ফেডারেশন থেকে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ২ জনসহ মোট ৮ জন কোচ তাদের প্রশিক্ষক হিসেবে বলতে গেলে বিনা বেতনে কাজ করছেন।

নিকলী সাঁতারু পল্লীর সাঁতারুদের অধিকাংশই দরিদ্র ও কৃষক পরিবারের সন্তান। প্রয়োজনীয় উপকরণ কেনার সামর্থ্য না থাকলেও নিজেদের অদম্য ইচ্ছাশক্তি আর পরিবার ও ক্লাবের অনুপ্রেরণাই তাদের সাফল্যের সিঁড়ি হিসেবে কাজ করছে।

মঙ্গলবার নিকলী সাঁতারু পল্লী সরেজমিন পরিদর্শনকালে কথা হয় ইন্দোনেশিয়ায় অনুষ্ঠেয় প্যারা অলিম্পিকের জন্য মনোনীত মেধাবী ক্ষুদে প্রতিবন্ধী স্থানীয় জেসি মডেল হাইস্কুলের ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র সাঁতারু নাদিমের সঙ্গে। দীর্ঘ আলাপচারিতায় ওঠে আসে তাদের যাপিত জীবনের সুখ-দুঃখের পাঁচালি। এ সময় দরিদ্র পরিবারের সন্তান নাদিম গর্ব করে জানায়, ইন্দোনেশিয়ায় বাংলাদেশের পতাকা ওড়ানোর সুযোগকে কাজে লাগাবে সে। সেদিনের বিজয় অর্জনের স্বপ্নই কেবল তাকে হাতছানি দিচ্ছে। আর সে স্বপ্নের পাখায় ভর করে এখন কাটছে তার প্রতিটি মুহূর্ত। আর এর জন্য চালিয়ে যাচ্ছে নিরন্তর কঠোর অনুশীলন। তবে একই সময় সে জানায়, এখানে যদি একটি আন্তর্জাতিক মানের সুইমিং পুল থাকত এবং প্রয়োজনীয় উপকরণ সরবরাহ করা হতো-তাহলে এ গ্রাম থেকে আরও অনেক প্রতিভাবান সাঁতারু বেরিয়ে এসে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করত।

একই সময় কথা হয় এ গ্রামের ভাটিবাংলা ও নিকলী সুইমিং ক্লাবের কর্মকর্তা ও কোচদের সঙ্গে। জানা যায়, বাংলাদেশ সুইমিং ফেডারেশন থেকে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কারার মোহাম্মদ এনামুল হক ও আব্দুল জলিলসহ ৮ জন কোচ এ সাঁতারু পল্লীর ৩২০ জন প্রশিক্ষণার্থীকে সাঁতার প্রশিক্ষণ দিয়ে আসছেন। এ সময় তারা মুখভরে এ পল্লীর সাঁতারুদের গৌরবময় ইতিহাস ও সাফল্যের কাহিনি তুলে ধরলেন। সযত্নে এড়িয়ে গেলেন নিজেদের অভাব-অনটনের কথা। শেষ পর্যন্ত জিজ্ঞেস করে জানা যায় বলতে গেলে বিনা পারিশ্রমিকে তারা দীর্ঘদিন ধরে প্রশিক্ষণ দিয়ে যাচ্ছেন। শিক্ষার্থীদের সাফল্য আনন্দের নিচেই চাপা থাকে তাদের অভাব-অনটন ও ব্যক্তিগত সুখ-দুঃখের কাহিনি।

নিকলী উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ ইয়াহ্ ইয়া খাঁনের সঙ্গে কথা হলে তিনিও জানান, নিকলী সাঁতার পল্লীর সাঁতারুরা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করছে। তবে এখানে কোনো সুইমিং পুল কিংবা সাঁতারুদের প্রয়োজনীয় উপকরণ নেই। ঐতিহ্যগতভাবেই এখানে কীর্তিমান সাঁতারুদের জন্ম হচ্ছে। তারা প্রতিকূল অবস্থার মধ্যেও নিজেদের সেভাবে গড়ে তোলে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে মেলে ধরছে। এ সময় তিনি আরও জানান, এখানে সরকারি উদ্যোগে একটি আন্তর্জাতিক মানের সুইমিং পুল গড়ে তোলা এবং সাঁতারুদের মধ্যে প্রয়োজনীয় উপকরণ সরবরাহ খুবই জরুরি হয়ে দেখা দিয়েছে। একই সঙ্গে সাঁতার শিক্ষা প্রদানকে যারা পেশা হিসেবে নিয়েছেন তাদের জীবিকা নির্বাহের বিষয়টি বিশেষ বিবেচনায় রাখতে হবে।

জেলার খবর
অনুসন্ধান করুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter
×