কুমিল্লায় জীবনের নিরাপত্তা চাইতে গিয়ে শিক্ষার্থী কারাগারে!

  তানভীর সাবিক, কুবি প্রতিনিধি ২৬ মে ২০১৯, ১৯:৪০ | অনলাইন সংস্করণ

শিক্ষার্থী ময়নুল।
শিক্ষার্থী ময়নুল। ছবি সংগৃহীত

হিন্দু ধর্ম নিয়ে কটূক্তির অভিযোগে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) আইন বিভাগের শিক্ষার্থী মো. ময়নুল হোসেনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। মামলার নথিতে উল্লেখ করা হয়, পুলিশ তাকে সুকৌশলে থানায় নিয়ে এসে আটক করে। তবে একাধিকসূত্র জানায়, ময়নুল নিজের নিরাপত্তা চেয়ে কুমিল্লার কোতোয়ালী মডেল থানায় সাধারণ ডায়েরি করতে গেলে তাকে জিজ্ঞাসাবাদের কথা বলে আটকে রাখা হয়। পরে ওই মামলায় তাকে গ্রেফতার দেখানো হয়। এছাড়াও যে কমেন্ট নিয়ে মামলা তা নিয়েও সৃষ্টি হয়েছে ধুম্রজাল।

জানা যায়, ১৯ মে রাতে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন গ্রুপে ‘শ্যামল চন্দ্র দাস’ নামের একটি ফেসবুক একাউন্টের একটি পোস্টের স্ক্রিনশট ছড়িয়ে পড়ে। যাতে দেখা যায়, ময়নুল ইসলাম আবির নামের একাউন্ট থেকে একটি পেজে হিন্দু ধর্ম নিয়ে অবমাননাকর মন্তব্য করা হয়।

তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী ময়নুল নিজের ফেসবুকে একটি পোস্ট দিয়ে দাবি করেন, এই মন্তব্যটি তিনি করেননি। কেউ তার নাম এবং ছবি ব্যবহার করে ভুয়া একাউন্ট খুলে এমন মন্তব্য করে তাকে ফাঁসাতে চাচ্ছেন। পরবর্তীতে স্ক্রিনশট ভাইরাল করা ‘শ্যামল চন্দ্র দাস’ নামক একাউন্ট ঘুরে দেখা যায়, একাউন্টটির ইউজার নেইম ‘moynulislam.abir.35’ এবং একাউন্টের অন্যান্য তথ্যও সঠিক নয়।

ময়নুলের দাবি, তাকে ফাঁসিয়ে একটি সাম্প্রদায়িক সংঘাত তৈরির জন্যই একটি মহল ইচ্ছাকৃতভাবে তার নামে একাউন্ট খুলে তা দিয়ে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করার চেষ্টা করছে।

এদিকে ওই রাতেই ২৫ থেকে ৩০ জন অজ্ঞাতনামা লোক ময়নুলের খোঁজে তার বাসায় যায়। এ ঘটনার পর সোমবার (২০ মে) ময়নুল কুমিল্লা কোতোয়ালী মডেল থানায় নিরাপত্তা চেয়ে সাধারণ ডায়রি করতে যান। সেখানে তিনি জিডি লিখে জমা দেওয়ার শেষ মুহূর্তে জিডি না নিয়ে তাকে ডিবি অফিসে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। এসময় তার সঙ্গে কাউকে দেখা করতে বা কথা বলতে দেয়নি পুলিশ।

জিডি করতে যাওয়ার সময় তার সঙ্গে থাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৭ম ব্যাচের শিক্ষার্থী মাজহারুল ইসলাম হানিফ বলেন, ‘২০ মে দুপুরে ময়নুল জিডি করতে যায়। পরে পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ময়নুলকে রেখে দেন। এরপর রাতে খোঁজ নিলে জিজ্ঞাসাবাদে আরও সময় লাগবে বলে জানায়। পরে জানতে পারি তাকে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে গ্রেফতার করা হয়েছে।’

এদিকে ময়নুলের বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে করা মামলার এজহারে বর্ণিত আছে, ‘গত ১৯ মে রাত আনুমানিক ১০.৫২ ঘটিকায় ময়নুল ‘আশিকুর রহমান রাব্বানী’ এর ফেসবুকের একটি স্ট্যাটাসের কমেন্ট বক্সে হিন্দু ধর্ম নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য করেন। কিন্তু যে শ্যামল চন্দ্র দাশ নামের আইডি থেকে কমেন্টটি ছড়ানো হয়েছিল সেই আইডির ভাষ্য ও স্ট্যাটাস অনুযায়ী জানা যায়, ময়নুল তার ফেসবুক আইডি ব্যবহার করে ‘পশ্চিমবঙ্গ মুসলিম সম্প্রদায়’ নামক একটি ফেসবুক পেজে ‘মোদী সরকারের আমলে মুসলমানরা কেন ভবিষ্যত নিয়ে আতঙ্কিত’ শিরোনামের একটি পোস্টে উক্ত কমেন্টটি করে।

ওই পেজ ঘুরে স্ট্যাটাস, অন্যান্য মন্তব্যের সত্যতা পাওয়া গেলেও ময়নুলের কমেন্টের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। শ্যামল চন্দ্র দাশ নামের আইডির অন্য এক স্ট্যাটাসের ভাষ্য অনুযায়ী ময়নুল নামের একাউন্ট থেকে করা কমেন্টটি মুছে দেয়া হয়।

কিন্তু ‘আশিকুর রহমান রাব্বানী’ ফেসবুক আইডিটির মালিক বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের ২০১২-১৩ সেশনের শিক্ষার্থী আশিকুর রহমান রাব্বানী বলেন, ‘মামলার এজহারে যে স্ট্যাটাসের কথা বলেছে সেটি আমি ময়নুল নামক একাউন্ট থেকে কমেন্ট ভাইরাল হওয়ার পরে দেখেছি। সেক্ষেত্রে সেই কমেন্ট কীভাবে আমার স্ট্যাটাসের হয়? এমনকি ময়নুলকে আমি চিনিও না এমনকি সে আমার ফেসবুক ফ্রেন্ড লিস্টেও নেই। সে আমার কোন স্ট্যাটাসে কমেন্ট করেনি।’

এদিকে শ্যামল চন্দ্র দাশ নামের আইডিটিও একটি ফেক বলে জানা যায়। মামলার তদন্তের নথিসূত্রে আরও বলা হয়, ‘প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে ময়নুল ঘটনার সত্যতা স্বীকার করেছেন। আসামী সাম্প্রদায়িক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে হিন্দু সম্প্রদায় ও হিন্দু সম্প্রদায়ের দেবী দুর্গাকে নিয়ে কটূক্তি করেছেন বলে প্রাথমিকভাবে প্রমাণিত হয়। মামলাটির তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।’ ময়নুলের মেস সদস্য শুভ’র দাবি, ‘ঘটনার দিন (২০ মে) ময়নুল মেসে ছিলো না। আর মেস থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়নি।’

এদিকে ময়নুল ইসলাম আবিরকে ‘নিরপরাধ’ দাবি করে তার নিঃশর্ত মুক্তি ও শ্যামল চন্দ্র দাশ নামের ফেসবুক আইডির আসল পরিচয় উদঘাটনের দাবিতে বৃহস্পতিবার (২৩ মে) দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের কাঁঠাল তলায় মানববন্ধন করে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীবৃন্দ।

শিক্ষার্থীদের দাবি ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্প্রীতি সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষের চেষ্টা চলছে। শ্যামল চন্দ্র দাশের আইডি ফেক হওয়ার পরেও কেন আবিরকে আটক করা হবে! শ্যামলের পরিচয় আগে প্রকাশ করা হোক। শ্যামল নামের সেই ফেক আইডির কে বা কারা চালাচ্ছে সেটি বের করা আমাদের প্রশাসনের পক্ষে সম্ভব। অথচ তা না করে আবিরকে উদ্দেশ্যমূলকভাবে মামলা দেওয়া হয়েছে।’

মামলার এজহারে কমেন্টের বিষয়ে কেন ‘আশিকুর রহমান রাব্বানী’ ব্যবহার করা হয়েছে এবং একটি উড়ো কমেন্টের স্ট্যাটাসের ওপর ভিত্তি করে ময়নুলকে কেন গ্রেফতার করা হয়েছে এমন প্রশ্নের জবাবে ময়নুলের মামলার দায়িত্বে থাকা কুমিল্লার ডিবি পুলিশের সাব ইন্সপেক্টর মো. ইকতেয়ার উদ্দিন যুগান্তরকে বলেন, ‘আমরা মামলাটি সিআইডিতে তদন্তের জন্য এক্সপার্ট অপিনিয়নে পাঠিয়েছি। সেখানে মামলাটি চলমান আছে। ময়নুল কমেন্টটি কোথায় করেছে সেটা গুরুত্বপূর্ণ না; কমেন্ট করেছে কিনা সেটা গুরুত্বপূর্ণ। সে আমাদের কাছে বলেছে সে কমেন্টটি করে নাই। হয়তো কেউ তার আইডি হ্যাক করে কমেন্টটি করেছে। এসব কিছুই তদন্তের পর বেরিয়ে আসবে।’

জেলার খবর
অনুসন্ধান করুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×