আর কোনো দিন ঈদ আসবে না নুসরাতের পরিবারে

  সোনাগাজী (ফেনী) প্রতিনিধি ০৫ জুন ২০১৯, ২০:৫৬ | অনলাইন সংস্করণ

আর কোনো দিন ঈদ আসবে না নুসরাতের ঘরে
নিহত নুসরাত জাহান রাফি। ফাইল ছবি

গত বছরের রোজা ও ঈদের আনন্দ পরিবারের সঙ্গে ভাগ করে নিয়েছিলেন সোনাগাজীর মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি। তবে এবছর তিনি নেই। নিজের সঙ্গে হওয়া অন্যায়ের প্রতিবাদ করে নৃশংস হত্যাকারীর আগুনে ঝলসে প্রাণ দিয়েছেন তিনি।

তাকে হারিয়ে ভালো নেই তার পরিবারের সদস্যরা। একমাত্র আদরের মেয়েকে ছাড়া ঈদ করতে গিয়ে শোকে বিহ্বল নুসরাতের মা শিরিন আক্তার ও বাবা এ কে এম মুসা।

নুসরাতের বড় ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান, ছোট ভাই রাশেদুল হাসান রায়হানও বোন হারানোর বেদনায় কাতর।

মঙ্গলবার ঈদের দিন বিকালে ফোনে কথা হয় নুসরাত জাহান রাফির মা শিরিন আক্তারের সঙ্গে। পরিচয় দিয়ে ‘ঈদ মোবারক’ বলতেই ফোনের অপরপাশ থেকে শোনা যায় কান্নার শব্দ।

শিরিন আক্তার কাঁদতে কাঁদতে জানালেন, নুসরাতের শোকে তার দুই ছেলে ও বাবা গতকাল সারারাত ঘুমাননি। মেয়ে ও বোনের জন্য শোকে তারা কাতর। বাবা কোরআন তেলাওয়াত করেছেন। কিছুক্ষণ পর পর মা-মা, নুসরাত-নুসরাত বলে ডাকছেন।

শিরিন আক্তারের নিজের কণ্ঠও ভারী। কে কাকে দেবেন সান্ত্বনা। তাই ফোনে শিরিন আক্তারের কথা ছাপিয়ে আসছিল কান্নার শব্দ।

ঈদের নামাজ পড়ে নুসরাতের কবর জিয়ারত করতে গিয়ে কবরস্থানে অঝরো কেঁদেছেন দুই ভাই ও নুসরাতের পিতা। তাদের কান্নায় আশপাশের লোকজনও অশ্রু দমিয়ে রাখতে পারেননি।

কবর জিয়ারত শেষে বাড়িতে গেলে নুসরাতের পরিবারের সদস্যদের আহাজারিতে আকাশ বাতাস ভারী হয়ে উঠে।

নুসরাতের বড় ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান বলেন, ‘বোনের কথা আমরা কোনোভাবেই ভুলতে পারছি না। ঈদের দিন বলে নুসরাতকে আরও বেশি মনে পড়ছে। কোনোভাবেই তাদের কান্না আমি থামাতে পারছি না। আসলে আমাদের বুকের ভেতরে আগুন জ্বলছে। কী অসহ্য কষ্ট, আপনাকে বোঝাতে পারবো না। আমাদের জীবনে আর কোনোদিন ঈদ আসবে না।’

কথায় কথায় স্মৃতিকাতর হয়ে পড়েন নুসরাতের বড় ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান। জানালেন, প্রতিবছর রমজানে ইফতার তৈরি থেকে শুরু করে সবাই মিলে ইফতার করার স্মৃতি কোনোভাবে আমরা ভুলতে পারছি না।

তিনি বলেন, প্রতি ঈদে নুসরাতকে নিয়ে ১০ রমজানের মধ্যে নতুন জামা কিনতে মার্কেটে যেতাম মায়ের সঙ্গে। তার পছন্দের কাপড় প্রথম কিনে তারপর আমাদের জন্য ঈদ বাজার শুরু করতাম। প্রতিবছর নুসরাত আমার ও মা এবং বাবার জন্য জামা পছন্দ করে কিনতো। বাবা ও মা সাধ্যমতো নুসরাত ও রায়হানের আবদার মেটানোর চেষ্টা করতেন।

‘যে বোন ছিল আমাদের আশার বাতি, ভয়াবহ নির্যাতনের বিচার চাইতে গিয়ে ও নির্যাতনের প্রতিবাদ করতে গিয়ে সেই বোনকে মৃত্যুবরণ করতে হলো।’

নুসরাতের বাবা মুসা বলেন, আমাদের এবারের ঈদে কোনো আনন্দ নেই। সব আনন্দ শোকে পরিণত হয়েছে। নুসরাতের শূন্যতা আমাদের অনেক কষ্ট দিচ্ছে। জানি না সামনের দিনগুলোতে কীভাবে এই শোক কাটিয়ে উঠবো।

তিনি আরও বলেন, ‘নিজে বেশি পড়ালেখা করতে পারিনি। খুব ইচ্ছে ছিল মেয়েটাকে মানুষ করবো। কিন্তু আর হলো না। সবাই পরিজন নিয়ে ঈদ করছে। আর আমি একমাত্র মেয়েকে হারিয়ে কাঁদছি। আল্লাহ কেনো আমাকে এই শাস্তি দিলেন, জানি না।’

গত ৬ এপ্রিল সকাল ৯টার দিকে আলিমের আরবি প্রথমপত্র পরীক্ষা দিতে সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসাকেন্দ্রে যান নুসরাত। এরপর কৌশলে তাকে পাশের ভবনের ছাদে ডেকে নেওয়া হয়। সেখানে ৪-৫ জন বোরকা পরিহিত ব্যক্তি তার শরীরে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়। এতে তার শরীরের ৮৫ শতাংশ পুড়ে যায়।

পরে ওই ছাত্রীকে উদ্ধার করে তার স্বজনরা প্রথমে সোনাগাজী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেন। পরে চিকিৎসকরা তাকে ফেনী সদর হাসপাতালে পাঠান। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়ার পর তাকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে পাঠানো হয়।

১০ এপ্রিল রাতে নুসরাত মারা যান। এ ঘটনায় নুসরাতের বড় ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান বাদী হয়ে অধ্যক্ষ সিরাজ উদ্দৌলাসহ আট জনের নাম উল্লেখ করে সোনাগাজী মডেল থানায় মামলা দায়ের করেন।

মামলার এজাহারভুক্ত আট আসামিসহ ১৬ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট দিয়েছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন(পিবিআই)। একইসঙ্গে মামলাটি ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন বিশেষ ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তর করা হয়েছে।

ঘটনাপ্রবাহ : পরীক্ষা কেন্দ্রে ছাত্রীর গায়ে আগুন

আরও
জেলার খবর
অনুসন্ধান করুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×