এভাবে কি ঈদ করতে আসা যায়?

প্রকাশ : ১১ জুন ২০১৯, ২২:৪১ | অনলাইন সংস্করণ

  একরাম তালুকদার, দিনাজপুর প্রতিনিধি

ঈদ শেষে আবার কর্মস্থল ঢাকায় ফিরতে টার্মিনালে ভিড়

‘ভোগান্তি আর বিড়ম্বনার মধ্যে দিনাজপুরের বাড়িতে এসেছি ঈদ করতে। ঈদ শেষে আবার কর্মস্থল ঢাকায় ফিরতে একই ঝামেলা। টিকিট পাই নাই। ঢাকায় ফিরবো কিভাবে? এই টেনশনে আছি। এত্তসব ঝামেলার মধ্যে পরিবার-পরিজনের সঙ্গে ঈদের আনন্দটাই যেনো ভুলে গিয়েছি। এভাবে কি ঈদ করতে বাড়িতে আসা যায়?’

ঈদ শেষে কর্মস্থল ঢাকায় ফেরার জন্য দিনাজপুর রেলওয়ে স্টেশনে টিকিট কাটতে আসা মুরসালিন ব্যক্ত করছিলেন এমন প্রতিক্রিয়া।

তিনি জানান, বাবা-মায়ের সঙ্গে ঈদ করবো বলে অনেক ঝামেলা অতিক্রম করে দিনাজপুরে এসেছিলাম। এখন কর্মস্থলে ফিরতে হবে। ছুটিও প্রায় শেষ হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু যাবো কিভাবে-ট্রেন, বাস কোথাও টিকিট পাচ্ছি না। এই নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছি। কর্মস্থলে ফেরার দুশ্চিন্তায় ঈদের আনন্দটাই যেনো ভুলে গিয়েছি।

শুধু মুরসালিন নয়, টিকিটের জন্য দিনের পর দিন দিনাজপুর রেলওয়ে স্টেশনে অপেক্ষমাণ অনেক যাত্রীই এমন প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন।

অনেকে জানান, লাইনে দাঁড়ালে টিকিট পাওয়া যায় না। আবার সাইডে গেলেই টিকিট পাওয়া যায় বেশি দাম দিয়ে।

ঢাকায় বেসরকারি কোম্পানিতে কর্মরত বিরল উপজেলার হামিদুর রহমান জানান, ঈদে বাড়িতে আসার জন্য ঢাকায় টিকিট না পেয়ে সামর্থের বাইরে থাকার পরও বিমানে এসেছি। এরপর টিকিট কাটতে এসেছি রেলওয়ে স্টেশনে। 

তিনি বলেন, লাইনে দাঁড়িয়ে টিকিট পাই নাই। লাইন থেকেই একজন ডেকে বললো-টিকিট নিলে সাইডে আসেন। সাইডে গিয়ে ঢাকার একটি টিকিটের দাম চাচ্ছে ১ হাজার ৫শ’ টাকা। অথচ ভাড়া ৪৮৫ টাকা। এরপর দাম দর করে বাধ্য হয়েই একতা এক্সপ্রেসের ৩টি টিকিট নিলাম ৩ হাজার টাকায়।

কী করবো কর্মস্থলে সময়মতো না পৌঁছাতে পারলে চাকরি থাকবে না। কিন্তু এভাবে কি ঈদ করতে বাড়িতে আসা যায়? প্রশ্ন করেন তিনি।

ঠাকুরগাঁওয়ের হরিপুর উপজেলার রুহুল ইসলাম জানান, ঠাকুরগাঁও, পীরগঞ্জ ও দিনাজপুর রেলওয়ে স্টেশনে এসেও টিকিট পাইনি। ঈদ করতে বাড়িতে এসে আরেক ঝামেলায় পড়েছি। বাধ্য হয়েই সাধ্যের বাইরে থাকলেও বিমানের টিকিট কাটতে হলো। স্ত্রী, সন্তানসহ ৩ জনের বিমানের টিকিট কাটতে ১০ হাজার টাকা লেগেছে। যা মেটাতে হিমসিম খেতে হচ্ছে। কিন্তু উপায় নেই।

দিনাজপুরসহ এই অঞ্চলে ঈদ করতে আসা ঢাকায় কর্মজীবীদের কাছে ট্রেন বা বাসের টিকিট এখন সোনার হরিণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দিনের পর দিন রেলওয়ে স্টেশনে দাঁড়িয়ে থেকেও টিকিট পাচ্ছেন না ঈদ শেষে কর্মস্থলে ফেরা যাত্রীরা।

লাইনে দাঁড়িয়ে টিকিট না পেয়ে কেউ কেউ আবার অধিক দামে টিকিট সংগ্রহ করছে কালোবাজারিদের হাত থেকে। 

টিকিট নিয়ে অভিযোগ রয়েছে রেলওয়ের কিছু অসাধু কর্মকর্তা ও কালোবাজারীদের বিরুদ্ধে।

টিকিট কালোবাজারী নিয়ে দিনাজপুর কোতয়ালী থানায় দুটি মামলাও দায়ের হয়েছে। বেশ কয়েকজন গ্রেফতারও হয়েছে বলে জানান দিনাজপুর কোতয়ালী থানার ওসি (তদন্ত) বজলুর রশীদ।

যাত্রীর তুলনায় টিকিট সংকটের কথা স্বীকার করে দিনাজপুর রেলওয়ে স্টেশনের ভারপ্রাপ্ত সুপারিনটেনডেন্ট আনোয়ার হোসেন মঞ্জু মঙ্গলবার যুগান্তরকে জানান, দিনাজপুর থেকে প্রতিদিন ঢাকায় যায় ৩টি ট্রেন। এরমধ্যে সকাল সোয়া ৯টায় ছাড়ে দ্রুতযান এক্সপ্রেস, দুপুর ৩টা ২০ মিনটে ছাড়ে পঞ্চগড় এক্সপ্রেস এবং রাত ১১টায় ছাড়ে একতা এক্সপ্রেস।

তিনি জানান, দিনাজপুর রেলওয়ে স্টেশনে দ্রুতযান এক্সপ্রেসের জন্য ২৬০টি সিট, পঞ্চগড় এক্সপ্রেসের জন্য ২৬৬টি সিট এবং একতা এক্সপ্রেসের জন্য ২৬০টি সিট বরাদ্দ। এসব সিটের ৫০ শতাংশ টিকিট দেয়া হয় কাউন্টার থেকে এবং বাকি ৫০ শতাংশ টিকিট দেয়া হয় অনলাইনের মাধ্যমে। কিন্তু প্রতিদিন কাউন্টারে টিকিট সংগ্রহ করতে আসে ৫ শতাধিক যাত্রী। তাই অধিকাংশ যাত্রীকেই টিকিট দেয়া সম্ভব হয় না।

কালোবাজারিতে টিকিট বিক্রির কথা অস্বীকার করে জানান, আগামী ১৭ জুন পর্যন্ত ঢাকাগামী কোনো টিকিট নাই।

এদিকে বাস কাউন্টারের ম্যানেজাররাও জানান, একদিনে যে পরিমাণ যাত্রী বহন করা সম্ভব, তার তিনগুণ যাত্রী এসে ভিড় করছে।

ফুলবাড়ী উপজেলার হানিফ এন্টার প্রাইজের ম্যানেজার আজিজার রহমান বলেন এই কাউন্টার থেকে প্রতিদিন দিন-রাত ২০টি বাস ছেড়ে যায়, ঈদ উপলক্ষে প্রতিদিনের জন্য আরও ৫টি বাস অতিরিক্ত নামানো হয়েছে, তবুও যাত্রী চাহিদা পূরণ করা যাচ্ছে না। একই অবস্থা, নাবীল, শ্যামলী, রাহবারসহ অন্য বাস কাউন্টারগুলোতে।