মাতৃগর্ভে আঘাত পাওয়া মাগুরার সেই শিশুর মৃত্যু

  মাগুরা প্রতিনিধি ২৬ জুন ২০১৯, ২২:৩০ | অনলাইন সংস্করণ

হাসপাতালে চিকিৎসাধীন মুক্তা পারভিন
হাসপাতালে চিকিৎসাধীন মুক্তা পারভিন

মাগুরায় আবারও মাতৃগর্ভে থাকা শিশুর ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে। নির্ধারিত সময়ের ৩ মাস আগে মায়ের গর্ভে আঘাতপ্রাপ্ত শিশুটি ভূমিষ্ট হলেও মঙ্গলবার রাতে তার মৃত্যু হয়েছে।

ঘটনাটি মাগুরার মহম্মদপুর উপজেলার পলাশবাড়িয়া ইউনিয়নের নারিকেল বাড়িয়া গ্রামে।

স্থানীয় রাজনৈতিক দলাদলি এবং অর্থনৈতিক লেনদেনের জেরে ৭ মাসের প্রসূতি মায়ের ওপর এই হামলার ঘটনা ঘটেছে বলে পুলিশ ও স্থানীয় বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে।

এলাকাবাসী জানান, মহম্মদপুর উপজেলার মান্দারবাড়িয়া গ্রামের নব্য আওয়ামী লীগ নেতা সৈয়দ সিকান্দর আলি আগামীতে পলাশবাড়িয়া ইউনিয়ন পরিষদ থেকে চেয়ারম্যান নির্বাচন করতে চান। সে জন্যে তিনি এবারের ঈদের আগে শুভেচ্ছা দিতে অনেক রঙিন ব্যানার তৈরি করেন।

সেগুলো প্রদর্শনের জন্যে বাঁশের প্রয়োজন। সৈয়দ সিকান্দর আলি নারিকেল বাড়িয়া গ্রামের সাইফুর রহমান খানের বিধবা স্ত্রী মনজিলা বেগমের ঝাড় থেকে ১৫টি বাঁশ ক্রয় করেন। কিন্তু মাত্র ৫শ’ টাকা দিলেও প্রাপ্য বাকি ৩ হাজার টাকা দিচ্ছিলেন না। নিরুপায় মনজিলা ১৪ জুন বিকালে টাকার জন্যে সিকান্দারের বাড়িতে যাওয়ায় তিনি খুবই অপমানিত বোধ করেন।

এজন্য ওইদিন সন্ধ্যায় লোকজন নিয়ে মনজিলা বেগমের বাড়িতে গিয়ে চড়াও হন সৈয়দ সিকান্দর আলি। তিনি অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করতে থাকেন। এ সময় চিৎকার চেঁচামেচি শুনে মনজিলার ৭ মাসের অন্তঃসত্ত্বা মেয়ে মুক্তা পারভিন ঘর থেকে বেরিয়ে আসলে তার উপর হামলা চালানো হয়। এতে মারাত্মক অসুস্থ হয়ে পড়লে মুক্তাকে মাগুরা ২৫০ শয্যা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

এদিকে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২২ জুন তারিখে ৭ মাসের অন্তঃসত্ত্বা মুক্তা অপূর্ণাঙ্গ ও কম ওজনের একটি কন্যা সন্তান প্রসব করেন। কিন্তু ৬ দিন ধরে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়তে থাকে শিশুটি।

অবশেষে শারীরিক অবস্থা নাজুক হওয়ায় জন্মের ৬ দিন পর মঙ্গলবার ফরিদপুর মেডিকেল হাসপাতালে রেফার্ড করা হয়। সেখানে যাবার পথেই রাতে শিশুটির মৃত্যু হয়।

মৃত্যুর পর ময়নাতদন্ত জন্যে শিশুটিকে রাখা হয়েছে লাশ ঘরে। অথচ দীর্ঘ ৯ বছরের অপেক্ষার পর মুক্তা গর্ভে সন্তানটি ধারণ করলেও ভূমিষ্ট হওয়ার পর তাকে কোলে পর্যন্ত নিতে পারেননি একটিবারের জন্যেও। হাসপাতালের গাইনি ওয়ার্ডের ফ্লোরে সেই আক্ষেপ নিয়ে চোখের জল ফেলছেন চিকিৎসাধীন মুক্তা পারভিন।

মুক্তার মা মনজিলা বেগম জানান, মেয়ের সন্তান হবে। ওষুধপথ্য কিনতে টাকার দরকার। যে কারণে সিকান্দারের বাড়িতে যাওয়া। এতে সে রেগে গিয়ে টাকা তো দিলই না উলটো অনেক লোকজন জুটিয়ে মারতে চলে আসে। সিকান্দার আর সাগরেদ জাহাঙ্গীর আমার মেয়ের চুলের মুঠি ধরে উঠানে ফেলে পেটে লাথি ও ঘুষি মারে।

মুক্তা বলেন, অনেকদিন পর মাকে দেখতে শ্বশুরবাড়ি ঝিনাইদহ থেকে মাগুরা আসা। কিন্তু সিকান্দার ভাই আমার সন্তানের জম হয়ে বাড়িতে আসবেন জানলে ঘুর্ণাক্ষরেও ঈদে মায়ের বাড়িতে আসতাম না।

শিশুটির মৃত্যুর বিষয়ে মাগুরা ২৫০ শয্যা হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডের কর্তব্যরত চিকিৎসক জয়ন্ত কুণ্ডু বলেন, আঘাত জনিত কারণেই নির্ধারিত সময়ের আগেই শিশুটি কম ওজন নিয়ে ভূমিষ্ট হয়েছে। শ্বাসকষ্টসহ অন্যান্য কিছু জটিলতাও দেখা যায়। শেষদিকে এসে শিশুটির শরীর নীল হয়ে যাচ্ছিল। যে কারণে তাকে রেফার্ড করা হয়। কিন্তু ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই তার মৃত্যু হয়েছে।

তবে আওয়ামী লীগ নেতা সৈয়দ সিকান্দার আলী পুরো ঘটনাটিকে তার বিরুদ্ধে চক্রান্ত বলে দাবি করেছেন। তিনি বলেন, দীর্ঘ দুই বছর যাবত এই পরিবারটিকে আর্থিকভাবে সহায়তা দিয়ে এসেছি। মুক্তার ভাই আহাদ খান আমার সঙ্গেই চলাফেরা করতো। কিন্তু কিছুদিন ধরে পলাশবাড়িয়া ইউনিয়নের বর্তমান চেয়ারম্যান রবিউল তাকে কাছে টেনে নিয়ে আমার বিরুদ্ধে চক্রান্ত চালাচ্ছে। অথচ এ ঘটনার সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্কই নেই।

এদিকে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন গুরুতর অসুস্থ মুক্তা ও গর্ভস্থ সন্তানের ওপর হামলার ঘটনায় বিচার চেয়ে মুক্তার স্বামী মোসলেম মোল্যা আওয়ামী লীগ নেতা সৈয়দ সিকান্দার আলি এবং তার সহযোগী জাহাঙ্গীর খানসহ ৬ জনকে অভিযুক্ত করে মহম্মদপুর থানায় একটি মামলা দায়ের করেছেন।

এ বিষয়ে মহম্মদপুর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) লিটন সরকার বলেন, বাঁশ কেনাবেচা এবং জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধের জের ধরেই মারামারির সূত্রপাত বলে প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে। তবে মুক্তার আহত হওয়া এবং শিশুর মৃত্যুর সঙ্গে কার কতটা সম্পৃক্ততা সেটি তদন্ত শেষ না হলে বলা সম্ভব নয়।

উল্লেখ্য, এর আগে ২০১৫ সালের ২৩ জুলাই মাগুরা শহরের দোয়ারপাড়ায় প্রকাশ্যে স্থানীয় প্রভাবশালী দুটি গোষ্ঠীর মধ্যে গুলি বিনিময়ের ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনায় মাতৃগর্ভে শিশুসহ গুলিবিদ্ধ হন নাজমা পারভিন এবং তার কন্যা। গুলিতে শিশুটি ক্ষতবিক্ষত হলেও এখনো তারা সুস্থ আছেন।

জেলার খবর
অনুসন্ধান করুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×