আগেও প্রতিবেশীকে কোপান বরগুনার সেই খুনি

প্রকাশ : ২৭ জুন ২০১৯, ১৪:০৭ | অনলাইন সংস্করণ

  যুগান্তর ডেস্ক

ডানে খুনি রিফাত ফরাজী

প্রকাশ্যে স্বামীকে খুন হতে দেখলেন স্ত্রী। শতচেষ্টা করেও বাঁচাতে পারলেন না খুনির ধারালো অস্ত্রের কোপ থেকে।

গতকাল বরগুনা সরকারি কলেজের সামনে এমন নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ভিডিও দেখে হতবাক দেশবাসী।

ইতিমধ্যে ভিডিওটি ভাইরাল হয়ে পড়েছে। নিন্দা ও ক্ষোভের ঝড় উঠেছে সোশ্যাল মিডিয়ায়। সেই সঙ্গে প্রশ্ন উঠেছে- দেশটা কি মগের মুল্লুক? দিন-দুপুরে এভাবে খুন সিনেমার নৃশংসতাকেও হার মানায়।

যে দুই যুবক এই প্রকাশ্যে হত্যালীলা চালালেন, তারা কারা? কী তাদের পরিচয়? তাদের এমন ক্ষমতার পেছনে কে আছেন? এসব জানতে উন্মুখ দেশবাসী।

ইতিমধ্যে হত্যাকারী দুই যুবকেরই পরিচয় জানা গেছে এবং চন্দন নামে তাদের একজন সহযোগীকে গ্রেফতার করেছে স্থানীয় পুলিশ।

পুলিশসূত্রে জানা গেছে, হত্যাকারী দুজনের মধ্যে একজনের নাম নয়ন বন্ড (২৫)। অন্যজনের নাম রিফাত ফরাজী।

তারা দুজনই অপরাধজগতের বেশ পরিচিত মুখ বলে জানিয়েছে বরগুনা পুলিশ।

স্থানীয়রা এ দুই সন্ত্রাসীর তাণ্ডবে বেশ অতিষ্ঠ বলে জানিয়েছেন। তাদের ভয়ে অনেকেই স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারছিলেন না। প্রায়ই নানা অজুহাতে লাঞ্ছিত হতেন স্থানীয়রা। প্রতিবেশীদের কাছে রীতিমতো আতঙ্ক বিরাজ করত এ দুজনের নাম শুনলে।

এলাকাবাসীর ওপর এসব অত্যাচার করে বিভিন্ন সময় তাদের জেল খাটতে হয়েছে বলে জানান স্থানীয়রা। কিন্তু খুব অল্প সময়েই হাজত থেকে বের হয়ে আসতেন অদৃশ্য কারণে। আর ফিরেই তাদের তাণ্ডবলীলার পরিমাণ আরও বেড়ে যেত।
 
এ ঘটনার অন্যতম আসামি রিফাত ফরাজীর বিষয়ে পুলিশসূত্রে জানা গেছে, মাদক ব্যবসা, মাদক সেবন ও ছিনতাইসহ নানা অপকর্মে যুক্ত ছিলেন খুনি রিফাত ফরাজী। নানা ছুঁতোয় স্থানীয়দের ওপর হামলা, মারধর করা ছিল রিফাতের কাছে নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার।

এসব ঘটনায় কয়েকবার গ্রেফতার করা হয় রিফাতকে।  

জানা গেছে, ২০১৭ সালের ১৫ জুলাই তরিকুল ইসলাম (২১) নামে এক প্রতিবেশীকে কুপিয়ে মারাত্মক যখম করেন রিফাত ফরাজী।

ভুক্তভোগী তরিকুল বলেন, সামান্য এক বিষয়ে রিফাত ফরাজীর সঙ্গে বাকবিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়ি।  ওই সময় রিফাত ফরাজী তাকে কুপিয়ে যখম করার হুমকি দেন। সেই ভয়ে আমি দেড় মাস রিফাত ফরাজীর বাসার সামনে দিয়ে যাইনি।  কর্মস্থল থেকে প্রতিদিন আধা কিলোমিটার পথ ঘুরে বাসায় যাওয়া-আসা করতাম।  

তিনি যোগ করেন, হুমকি দেয়ার দেড় মাস পার হয়ে গেলে এ নিয়ে আর কোনো ভয় নেই ভেবে আধা কিলোমিটার না ঘুরে একদিন সন্ধ্যায় রিফাতের বাসার সামনে দিয়েই যাচ্ছিলাম। আর সে সন্ধ্যায়ই দেশীয় ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে আমায় মাথায় গুরুতর যখম করে রিফাত।


একই বছর মোবাইল ছিনতাইয়ের ঘটনায় আটক হয় রিফাতের বাবা।

স্থানীয় পুলিশ জানায়, রিফাত বরগুনার হোমিও চিকিৎসক ডা. আলাউদ্দিন আহমেদের ডিকেপি রোডের বাসার ছাত্র মেসে যান এবং অস্ত্রের মুখে সব ছাত্রকে জিম্মি করে তাদের ১৪টি মোবাইল ছিনতাই করে।  

এ ঘটনায় থানায় অভিযোগ করা হলে পুলিশ রিফাতের বাবাকে আটক করে মোবাইলগুলো উদ্ধার করেন।

এ বিষয়ে ডা. আলাউদ্দিন আহমেদের ছেলে ডা. মো. মোয়াজ্জেম হোসেন জানান, ‘রিফাতের কাছ থেকে ছিনতাই করা ১৪টি মোবাইলের মধ্যে ১১টি উদ্ধার করা হয়। আর বাকি তিনটি নতুন মোবাইল কিনে দিলে থানা থেকে রিফাতের বাবাকে ছেড়ে দেয়া হয়।’

এ ছাড়া রিফাতের জন্য দামি, আকর্ষণীয় মোবাইল ব্যবহার করতে ভয় পেতেন এলাকাবাসীর অনেকেই। কারও হাতে দামি স্মার্টফোন দেখলেই সেটি ছিনতাই করতে উদ্যত হতো রিফাত।

বিদেশ থেকে প্রাইম মডেলের একটি স্যামসাং মোবাইল মেহেদী নামের এক যুবকের থেকে ছিনিয়ে নেয় রিফাত। পরে সেই সেট ফিরিয়ে দেয়া নিয়ে প্রতিবাদ করলে তাকে হত্যার হুমকি দিত রিফাত। প্রাণ বাঁচাতে এলাকা ছাড়েন মেহেদী।  

এমনটাই জানালেন মেহেদীর বোন বরগুনার বেতাগী উপজেলার কাজিরাবাদ ইউনিয়নের বাসিন্দা মারজানা মনি।


প্রসঙ্গত গতকাল বরগুনা সরকারি কলেজের সামনে প্রকাশ্য দিবালোকে শত শত মানুষের উপস্থিতিতে রিফাত শরীফকে (২৫) কুপিয়ে হত্যা করা হয়।

বুধবার সকাল ১০টার দিকে নয়নের নেতৃত্বে ৪-৫ জন সন্ত্রাসী রিফাতকে দা দিয়ে কুপিয়ে রক্তাক্ত অবস্থায় রাস্তায় ফেলে যায়।

স্ত্রীকে উত্ত্যক্ত করার প্রতিবাদ করায় প্রকাশ্যে রিফাত শরীফকে এভাবে খুন হতে হয় বলে অভিযোগ করেছে নিহতের পরিবার।