জীবন দিয়ে হলেও অধ্যক্ষের অপকর্মের প্রতিবাদ করতে চেয়েছিলেন নুসরাত

  ফেনী প্রতিনিধি ১৬ জুলাই ২০১৯, ২২:৪৩:৪৮ | অনলাইন সংস্করণ

অধ্যক্ষ সিরাজউদ্দৌলা। ফাইল ছবি

ফেনীর সোনাগাজী মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফিকে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনায় দায়ের করা মামলার ২১তম সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ ও জেরা শেষ হয়েছে।

মঙ্গলবার দুপুরে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মামুনুর রশিদের আদালতে সোনাগাজী মাদ্রাসার ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ও পরীক্ষা কেন্দ্রের কেন্দ্র সচিব মাওলানা ফারুকী, রাফির সহপাঠী তানজিনা বেগম সাথি, বিবি জাহেদা বেগম তামান্নার সাক্ষ্য এবং জেরা শেষ হয়েছে।

এদিকে বিকাল ৩টায় অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আদালতে এক কোটি ৩৯ লাখ টাকা আত্মসাতের চেক জালিয়াতির মামলায় মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজউদ্দৌলাকে হাজির করা হয় পরে সিরাজের উপস্থিতে ওই মামলায় বাদীর জেরা শুরু করেন বিচারক।

অধ্যক্ষ সিরাজ ২০১৬ সালে উম্মুল কুরা ডেভেলপার্স লিমিটিডে ও উম্মুল কুরা ইন্টারন্যাশনাল ক্যাডেট মাদ্রাসা স্থাপনের নামে ১১০ সদস্য থেকে জনপ্রতি লাখ টাকা করে তহবিল সংগ্রহ করে টাকা আত্মসাৎ করেন। টাকার হিসাব চাইলে অধ্যক্ষ সিরাজ তাদেরকে চেক দেন।

এ মামলায় এখন পর্যন্ত ২১ জন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়েছে। এর আগে কঠোর নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে মামলার চার্জশিটভুক্ত ১৬ আসামিকে আদালতে হাজির করা হয়।

বুধবার মাদ্রাসার নারী শিক্ষক বেবী রানী দাস, রাফির সহপাঠী খুজিস্তা খানম, আকলিমা আক্তার ও মো. কাওসারের সাক্ষ্যগ্রহণ করা হবে।

মামলার বাদীপক্ষের আইনজীবী এম শাহজাহান সাজু বলেন, এ পর্যন্ত ১৮ জনের সাক্ষ্য ও জেরা শেষ হয়েছে।

এর আগে গত ২৭ জুন মামলার বাদী ও প্রথম সাক্ষী নুসরাতের বড় ভাই মাহমুদুল হাসান নোমানের সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়।

পরে রাফির বান্ধবী নিশাত সুলতানা ও সহপাঠী নাসরিন সুলতানা, মাদ্রাসার পিয়ন নুরুল আমিন, নৈশপ্রহরী মো. মোস্তফা, কেরোসিন বিক্রেতা লোকমান হোসেন লিটন, বোরকা দোকানদার জসিম উদ্দিন ও দোকানের কর্মচারী হেলাল উদ্দিন ফরহাদ, নুসরাতের ছোট ভাই রাশেদুল হাসান রায়হান, জহিরুল ইসলাম, হল পরিদর্শক বেলায়েত হোসেন, নুসরাতের মা শিরিন আখতার ও শিক্ষক আবুল খায়ের, শেখ আবদুল হালিম মামুন ও মো. ইউসুফ সোনাগাজী মাদ্রাসার ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মো. হোসাইন, সোনাগাজী পৌরসভার ২নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর মো. ইয়াছিন ও ড্রাইভার নুরুল করিম এবং মো. হোসাইনের সাক্ষ্যগ্রহণ ও জেরা শেষ হয়।

মামলার রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী হাফেজ আহম্মদ ও মামলার বাদীপক্ষের আইনজীবী এম শাহজাহান সাজু বলেন, মাদ্রাসার পরীক্ষা কেন্দ্রের দায়িত্বে থাকা কেন্দ্র সচিব মাওলানা ফারুকী আদালতকে বলেন- আমি পরীক্ষার প্রশ্নপত্রের কাজে ব্যস্ত ছিলাম। রাফির গায়ে আগুন দেয়ার সংবাদ শুনে ঘটনারস্থলে গিয়েছিলাম। পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে বোরকার পোড়া অংশ, দিয়াশলাইসহ বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করতে তিনি উপস্থিত ছিলেন বলে জানান।

তানজিনা বেগম সাথী ও বিবি জাহেদা বেগম তামান্না জানান, তারা যৌন নিপীড়নের কথা রাফির মুখ থেকে শুনেছেন। রাফি তাদেরকে বলেছেন অনেকেই তার অপকর্মের প্রতিবাদ করেনি। আমার জীবন দিয়ে হলেও অধ্যক্ষ সিরাজের বিভিন্ন অপকর্ম প্রতিবাদ করবো।

আসামিপক্ষের আইনজীবী হিসেবে সাক্ষীদের পক্ষে জেরা করেন সিনিয়র আইজীবী গিয়ান উদ্দিন নান্নু, কামলুল হাসান, নয়ন ও বেঙ্গল প্রমুখ।

অভিযোগ গঠনের ছয়দিনের মাথায় ৯২ জন সাক্ষীর মধ্যে বাদীপক্ষের তিনজন সাক্ষীকে সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য উপস্থাপন করা হয়। ২০ জুন সাক্ষ্যগ্রহণের আদেশ দেন আদালত। মামলার চার্জশিট জমা দেয়ার আগে সাতজন সাক্ষী আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।

গত ৬ এপ্রিল ফেনীর সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসায় আলিম পরীক্ষা কেন্দ্রে গেলে নুসরাতকে ছাদে ডেকে নিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়।

মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজউদ্দৌলার বিরুদ্ধে করা শ্লীলতাহানির মামলা তুলে না নেয়ায় তাকে পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে বলে মৃত্যুশয্যায় নুসরাত বলে গেছেন। ১০ এপ্রিল ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় নুসরাত মারা যান।

পরে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) ফেনীর পরিদর্শক মো. শাহ আলম আদালতে ১৬ জনকে আসামি করে চার্জশিট জমা দেন।

চার্জশিটভুক্ত ১৬ আসামি হলেন- মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজউদ্দৌলা, নূর উদ্দিন, শাহাদাত হোসেন শামীম, সোনাগাজীর পৌর কাউন্সিলর মাকসুদ আলম, সাইফুর রহমান মোহাম্মদ জোবায়ের, জাবেদ হোসেন ওরফে সাখাওয়াত হোসেন জাবেদ, হাফেজ আবদুল কাদের, আবছার উদ্দিন, কামরুন নাহার মনি, উম্মে সুলতানা ওরফে পপি ওরফে তুহিন ওরফে শম্পা ওরফে চম্পা, আব্দুর রহিম শরীফ, ইফতেখার উদ্দিন রানা, ইমরান হোসেন ওরফে মামুন, মোহাম্মদ শামীম, মাদ্রাসার গভর্নিং বডির সহসভাপতি রুহুল আমীন ও মহিউদ্দিন শাকিল।

এ মামলায় মোট ২১ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। তদন্তে সম্পৃক্ততা না পাওয়ায় অন্য পাঁচজনকে অব্যাহতি দেয়ার সুপারিশ করে পিবিআই। আদালত তা অনুমোদন করেন।

এ ছাড়া যৌন নিপীড়নের মামলার পর নুসরাতের জবানবন্দি গ্রহণের সময় ভিডিও ধারণ করে তা ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেয়ার অভিযোগে সাইবার অপরাধ আইনে মামলা হয়। ওই মামলায় সোনাগাজী থানার তৎকালীন ওসি মোয়াজ্জেম হোসেনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। বর্তমানে তিনি কারাগারে রয়েছেন।

জেলার খবর
অনুসন্ধান করুন

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত