‘অধ্যক্ষের অপকর্মের প্রতিবাদ করেও কোনো লাভ হয়নি’

  ফেনী প্রতিনিধি ১৭ জুলাই ২০১৯, ২২:৩৭ | অনলাইন সংস্করণ

নুসরাত জাহান রাফি
নুসরাত জাহান রাফি। ফাইল ছবি

ফেনীর সোনাগাজী মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফিকে পুড়িয়ে হত্যা মামলায় বুধবার আরও ৪ জন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ ও জেরা সম্পন্ন হয়েছে।

দুপুরে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মামুনুর রশিদের আদালতে সোনাগাজী মাদ্রাসার বাংলা বিভাগের শিক্ষিকা খুজিস্তা খানম, মাদ্রাসার অফিস সহায়ক বেবী রানী দাস, রাফির সহপাঠী আকলিমা আক্তার ও মো. কাওসারের সাক্ষ্য ও জেরা হয়।

মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী হাফেজ আহম্মদ ও বাদীপক্ষের আইনজীবী এম শাহজাহান সাজু বলেন, বাংলা বিভাগের শিক্ষিকা খুজিস্তা খানম আদালতকে বলেছেন- তিনি ১৯৯৯ সালে প্রভাষক হিসাবে উক্ত মাদ্রাসায় যোগদান করেছেন। ২০০০ সালে সিরাজ উদদ্দৌলা অধ্যক্ষ হিসাবে উক্ত মাদ্রাসায় যোগদান করেন।

খুজিস্তা খানম আদালতকে বলেন, যোগদানের পর থেকে অধ্যক্ষ সিরাজ উদদ্দৌলা ছাত্রীদের সঙ্গে অশালীন আচরণ করতেন এবং ছাত্রীদের শরীরের বিভিন্ন স্পর্শকাতর স্থানে হাত দিতেন। ছাত্রীরা এ সব অভিযোগ সবসময় তাকে জানাতো।

খুজিস্তা খানম আদালতকে আরও বলেন, আমি ব্যক্তিগতভাবে অধ্যক্ষকে ছাত্রীদের সঙ্গে পিতার মত আচরণ করতে বলেছিলাম। তিনি আমাকে নাজেহালমূলক কথা বলতেন। পরে আমি বিষয়টি আমার সহকর্মীদেরকে জানালে তিনি আমার উপর ক্ষিপ্ত হন।

তিনি আদালতকে বলেন, অধ্যক্ষ সিরাজ আমাকে বিভিন্ন অজুহাতে হেনস্তা করতেন। বিনা দ্বিধায় মাদ্রাসার অভ্যন্তরীণ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র সরবরাহের প্রলোভন, উপবৃত্তি প্রদান, পরীক্ষার ফি, বেতন মওকুফ করানোর লোভ দেখিয়ে ছাত্রীদের কবজা করতেন। আমি ও আমার কয়েক সহকর্মী এসব কাজের প্রতিবাদ করলে আমাদেরকে নানা অজুহাতে হেনস্থা করতেন।

শিক্ষিকা খুজিস্তা খানম আদালতকে বলেন, অনেক ছাত্রী তার এসব নির্যাতন মুখ বুঝে সহ্য করত। অধ্যক্ষ সিরাজের টার্গেট থাকতো অপেক্ষাকৃত কম মেধাবী, দরিদ্র ও সুন্দরী মেয়েরা। যাতে দারিদ্র্যের সুযোগে তিনি তার অপকর্ম অব্যাহত রাখেন।

তিনি বলেন, অধ্যক্ষ সিরাজ তার এ অপকর্ম চালাতে তিনি তার অফিসকক্ষকে শিক্ষক মিলনায়তনের পাশ থেকে সাইক্লোন সেন্টারের দোতলায় নিয়ে যান। পরবর্তীতে তিনি ছাত্রীদের শ্রেণি কক্ষটিও তার অফিস কক্ষের পাশে নিয়ে যান। যাতে করে ছাত্রীদেরকে যখন-তখন তার অফিস কক্ষে ডাকতে পারেন। ছাত্রীদের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে আমরা তাদেরকে কখনো একা অধ্যক্ষের কক্ষে না গিয়ে ২-৩ জন দলবদ্ধভাবে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছি।

তিনি আরও বলেন, অধ্যক্ষ সিরাজের এমন আচরণ নিয়ে শিক্ষকদের সভা ও মাদ্রাসা পরিচালনা কমিটির সভায় একাধিক বার আলোচনা হলেও কমিটি বিষয়টিকে আমলে নিতেন না। অধ্যক্ষ সিরাজ স্থানীয় প্রশাসনকে তার পক্ষে রাখতে কয়েকজন সংবাদকর্মীকেও ব্যবহার করতেন।

শিক্ষিকা আদালতকে বলেন, তাদের কাজ ছিল স্থানীয় প্রশাসনের কাছে অধ্যক্ষ সিরাজের সুনাম করা। সিরাজ তাদেরকে নিয়ে মাদ্রাসায় দুপুরের খাবার খেয়ে স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতেন। কয়েক সংবাদকর্মী সিরাজকে প্রশাসনের সামনে ফেরেশতার সঙ্গে তুলনা করতেন।

শিক্ষিকা খুজিস্তা খানম জানান, রাফির গায়ে আগুন দেয়ার সংবাদ শুনে তিনি পরীক্ষার হলের দায়িত্ব থেকে ঘটনাস্থলে ছুটে যান। এ সময় পুলিশও ঘটনাস্থল ছুটে আসে। পুলিশ যখন বোরকার পোড়া অংশ, দিয়াশলাইসহ বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করছিলেন, তখন তিনি সেখানে উপস্থিত ছিলেন।

বিকালে মাদ্রাসার আয়া বেবী রানী দাস, আকলিমা আক্তার, মো. কাওসার আদালতকে বলেন, রাফির ওপর অধ্যক্ষ সিরাজের যৌন নিপীড়নের কথা আমরা রাফিসহ অনেকের মুখেই শুনেছি।

তারা বলেন, অধ্যক্ষের আচরণে রাফি ভীষণ ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছিলেন। রাফি তাদের বলেছিলেন- অনেকেই অধ্যক্ষের অপকর্মের প্রতিবাদ করেনি। আমি জীবন দিয়ে হলেও অধ্যক্ষ সিরাজের বিভিন্ন অপকর্মের প্রতিবাদ করবো।

পরে আসামিপক্ষের আইনজীবী হিসেবে সাক্ষীদের জেরা করেন সিনিয়র আইনজীবী গিয়াস উদ্দিন নান্নু, কামরুল হাসান, ফরিদ উদ্দিন নয়ন, আহছান উলহক বেঙ্গল প্রমুখ।

সাক্ষীদের জেরা করেন সিনিয়র আইজীবী গিয়াস উদ্দিন নান্নু, কামরুল হাসান।

তারা বলেন খুজিস্তা খানম আদালতে যে সাক্ষ্য দিয়েছে তাতে তিনি বলেছেন, তিনি কিছুই দেখেননি। তিনি বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে দেখে ও শুনে এমন কথা বলেছেন। তার এমন বক্তব্য বিচার কাজের সহায়ক নয়। এমন সাক্ষ্য দিয়ে বিচার কাজ চলে না। এই বক্তব্যে অনেক গরমিল পাওয়া যায়। এখন তারা নতুন নতুন আসামির নাম বলছেন। এটি পরিকল্পিত সাক্ষ্যগ্রহণ।

এ মামলায় এ পর্যন্ত ২৫ জন সাক্ষী সাক্ষ্য দিয়েছে। মামলার শুনানি শুরু হওয়ার আগেই কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে চার্জশিটভুক্ত ১৬ আসামিকে আদালতে হাজির করা হয়।

বৃহস্পতিবার মাদ্রাসার নারী শিক্ষক ফাহামিদা আক্তার হামদুন, সহপাঠী নাসরিন সুলতানা ও কবির আহম্মদ সাক্ষ্যগ্রহণ করা হবে।

৬ এপ্রিল রাফি পরীক্ষা কেন্দ্রে গেলে নুসরাতকে ছাদে ডেকে নিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়। ১০ এপ্রিল ঢাকার হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়।

এ ঘটনায় রাফির ভাই বাদী হয়ে মামলা করেন। পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) ফেনীর পরিদর্শক শাহ আলম আদালতে ১৬ জনকে আসামি করে অভিযোগপত্র জমা দেন।

ঘটনাপ্রবাহ : পরীক্ষা কেন্দ্রে ছাত্রীর গায়ে আগুন

আরও
জেলার খবর
অনুসন্ধান করুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×