ক্রস ফায়ারের ভয় দেখিয়ে টাকা আদায়, ব্যবসায়ীর স্ত্রীর ভিডিও ভাইরাল

প্রকাশ : ১২ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ২৩:১৭ | অনলাইন সংস্করণ

  নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি

ব্যবসায়ী মিঠুর স্ত্রী দিলারা

ক্রস ফায়ারের ভয় দেখিয়ে ব্যবসায়ীর কাছ থেকে ২ লাখ ৭০ হাজার টাকা আদায়ের অভিযোগ উঠেছে সিদ্ধিরগঞ্জ থানার দুই পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে।

টাকা আদায়ের পর ওই ব্যবসায়ীকে ইয়াবা দিয়ে মাদক মামলায় আদালতে প্রেরণের ঘটনায় কঠোর সমালোচনার ঝড় উঠেছে সাধারণ মানুষের মাঝে।

মিঠু নামের ওই ব্যবসায়ীর স্ত্রীর দেয়া অভিযোগের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার পর থেকে এ নিয়ে চলছে তোলপাড়।

তবে অভিযুক্ত সিদ্ধিরগঞ্জ থানার ২ পুলিশ কর্মকর্তা এখন আছেন বহাল তবিয়তেই।

বিষয়টি নিয়ে তদন্ত চলছে, এমন মন্তব্য ছাড়া এ ব্যাপারে মুখ খুলতেও নারাজ জেলা পুলিশের কর্তা ব্যক্তিরা।

সম্প্রতি সিদ্ধিরগঞ্জ থানায় এক পুলিশ কর্মকর্তার স্বাক্ষর জালিয়াতের মাধ্যমে হত্যা মামলা দায়েরের ঘটনা জাতীয় গণমাধ্যমে ফাঁস হওয়ার পর ব্যবসায়ীর কাছ থেকে টাকা আদায়ের বিষয়টি জেলা পুলিশের ভাবমূর্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে বলে মনে করছেন সাধারণ মানুষ।

ঘটনা সূত্রে জানা গেছে, মুন্সিগঞ্জ জেলার গজারিয়া থানা এলাকা থেকে গত শুক্রবার সন্ধায় প্রথমে র‌্যাব, পরে নারায়ণগঞ্জ ডিবি পরিচয়ে ব্যবসায়ী মিঠুকে তুলে নিয়ে আসে সিদ্ধিরগঞ্জ থানার এসআই কামাল হোসেন ও এএসআই  মোমেন আলম। মিঠুর স্ত্রী দিলারার কাছ থেকে নগদ ২ লাখ ৭০ হাজার টাকা নিয়ে বাকি টাকা ভোর ৫টার মধ্যে পরিশোধ না করলে মিঠুকে ক্রসফায়ার দিয়ে বাসায় লাশ পাঠিয়ে দেয়া হবে মর্মে হুমকি দেয় এসআই  কামাল হোসেন।

কিন্তু সিদ্ধিরগঞ্জ থানা পুলিশের দাবি মিঠুকে গ্রেফতার করা হয়েছিল সিদ্ধিরগঞ্জ এলাকা থেকেই।

মিঠুর বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলায় জানা গেছে, মুন্সিগঞ্জ জেলার গজারিয়া থানার তেতৈইতলা গ্রামের স্থায়ী বাসিন্ধা জাফর আলীর ছেলে মিঠু (২৫) বর্তমানে নারায়ণগঞ্জ জেলার সিদ্ধিরগঞ্জ থানার সানারপাড় এলাকার সাত্তারের বাড়ির ভাড়াটিয়া।

গোপন সংবাদের ভিত্তিতে গত শনিবার বেলা সোয়া ১১টায় এনায়েতনগর তাঁতখানা বাজারের সামনে পাকা রাস্তার উপর থেকে জাফর আলীর ছেলে মিঠুকে ৫২ পিছ ইয়াবা ট্যাবলেটসহ সিদ্ধিরগঞ্জ থানার এএসআই  মোমেন আলম সঙ্গীয় ফোর্সসহ গ্রেফতার করে।

অপরদিকে এ ব্যাপারে মিঠুর স্ত্রী দিলারা বলেন, আমার স্বামী মিঠুকে মুন্সিগঞ্জ জেলার গজারিয়া থানার তেতৈইতলা এলাকা থেকেই কালো রংয়ের হাইছ গাড়িতে র‌্যাব পরিচয়ে জোর করে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে আমার স্বামী মিঠু মোবাইল আমাকে ফোন করে ৭ লাখ টাকা আনতে বলে।

তিনি বলেন, আমি কারণ জানতে চাইলে প্রথমে র‌্যাব পরিচয়ে পরে নারায়ণগঞ্জ জেলা ডিবি পুলিশ পরিচয়ে সিদ্ধিরগঞ্জ থানার এসআই  কামাল হোসেন টাকা না দিলে আমার স্বামীকে ক্রস ফায়ার দিবে বলে ভয় দেখায়। পরে আমি ২ লাখ ৭০ হাজার টাকা জোগাড় করে আমার স্বামী মিঠুর নাম্বারে ফোন দেই।

দিলারা বলেন, ফোনে আমাকে টাকার জোগাড় হয়েছে কিনা জানতে চাইলে আমি টাকা কোথায় আসবো জানতে চাই। তারা আমাকে চিটাগাং রোডে আসতে বলে। আমি চিটাগাং রোডে আসলে তারা আমাকে সিদ্ধিরগঞ্জ থানার দিকে আসতে বলে। আমি থানার সামনে গেলে কালো রংয়ের হাইছ গাড়িটি গতিরোধ করে আমাকে উঠিয়ে নেয়।

তিনি বলেন, গাড়িতে থাকা এসআই  মো. কামাল হোসেন ও এএসআই  মোমেন আলম টাকা এনেছি কিনা জানতে চায়। এ সময় আমি আমার স্বামীকে দেখতে চাইলে তারা আমাকে পিছনে ফিরতে বলে। পিছনে ফিরে দেখি হাইছ গাড়ির কোনায় চোখ বাঁধা অবস্থায় আমাব স্বামী মিঠু বসে আছেন।

দিলারা বলেন, এ সময় গাড়িতে থাকা লোকজন আমার কাছে থাকা ব্যাগটি ছিনিয়ে নিয়ে ব্যাগের ভিতরে থাকা ২ লাখ ৭০ হাজার টাকা নিয়ে নেয় এবং বলে মিঠুকে ক্রসফায়ার থেকে বাঁচাতে হলে ভোর ৫টার মধ্যে আরও ৩ লাখ টাকা নিয়ে আসবি। এই বলে আমাকে গাড়ি থেকে নামিয়ে দেয়। আমি সকালে নারায়ণগঞ্জ ডিবি অফিসে গেলে আমার স্বামীকে দেখতে না পেয়ে ক্রস ফায়ার দিয়েছে মর্মে আতৎকে উঠি।

তিনি বলেন, পরে ডিবি পুলিশের এসআই  আবদুল জলিল আমাকে শান্তনা দিয়ে সিদ্ধিরগঞ্জ থানার সামনে আসলে আমি গাড়িটি চিনতে পারি। এ সময় আমার কাছে বাকি টাকা দাবি করে, আমি টাকা নিয়ে লোক আসতেছে বললে তারা আমাকে অকথ্য ভাষায় গালি-গালাজ করে আমার স্বামীকে থানা হাজতে নিয়ে যায়। আমার স্বামীকে মিথ্যা মাদক মামলায় ফাঁসিয়ে আদালতে পাঠায়।

এদিকে মিঠুকে যে ইয়াবার মামলা দিয়ে আদালতে পাঠানো হয়েছে সে মামলায় উল্লিখিত আসামির (মিঠুর) বর্তমান ঠিকনার বাড়ির মালিক সাত্তার মিয়ার স্ত্রী জানায় মিঠু নামে কোনো ভাড়াটিয়া আমাদের বাসায় ভাড়া থাকে না।

এ ব্যাপারে অভিযুক্ত এসআই  কামাল হোসেন জানান, তার ব্যাপারে আনিত অভিযোগ মিথ্যা।

আর এএসআই  মোমেন এ ব্যাপারে কোনো কথা বলতে রাজি হননি গণমাধ্যমের কাছে।

বিষয়টি নিয়ে জেলা পুলিশের কোনো পদক্ষেপ রয়েছে কিনা জানতে চাইলে জেলা পুলিশের মিডিয়া উইংয়ের প্রধান ডিআইও ২ সাজ্জাদ রুমন জানিয়েছেন, একজন পুলিশ পরিদর্শককে পুরো বিষয়টি তদন্ত করতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। তবে কাকে তদন্ত করতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে তিনি তা প্রকাশ করতে অস্বীকৃতি জানান।

এদিকে এই ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও সাধারণ মানুষের মাঝে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। অনেকেই এ ঘটনায় জড়িতদের শাস্তি দাবি করে বলেছেন, জেলা পুলিশের ভাবমূর্তি প্রশ্নবিদ্ধ হয় এমন কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া উচিত।