বগুড়ার ক্লাব-হোটেল যেন মিনি ক্যাসিনো!

  বগুড়া ব্যুরো ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ২৩:০২ | অনলাইন সংস্করণ

বগুড়ার ক্লাব-হোটেল যেন মিনি ক্যাসিনো
বগুড়ার ক্লাব-হোটেল যেন মিনি ক্যাসিনো

বগুড়ার বিভিন্ন স্থানে গড়ে ওঠা নামিদামি ক্লাব ও আবাসিক হোটেল যেন মিনি ক্যাসিনো। কারো নজরদারি না থাকায় সেখানে অবাধে মদ, নারী ও জুয়ার আসর বসে।

শহরের জিরোপয়েন্ট সাতমাথা, অভিজাত জলেশ্বরীতলা, কাটনারপাড়া, সেউজগাড়ি, নবাববাড়ি সড়কসহ বিভিন্ন এলাকায় গড়ে ওঠা এসব ক্লাব ও হোটেলে রাতভর জুয়া, মাদক সেবন, বিক্রি এবং অসামাজিক কার্যকলাপ চলে।

কিছু উপজেলা পর্যায়েও একই অবস্থা। শুধু তাস দিয়ে নয়; কেরাম বোর্ড ও লুডুর মাধ্যমেও জুয়া চলে।

তবে জেলা পুলিশ ও গোয়েন্দা পুলিশের দায়িত্বশীল কর্মকর্তা দাবি করেছেন, জেলার কোথাও কোনো ক্যাসিনো নেই, জুয়ার আসরও বসে না। এরপরও এসব ব্যাপারে অনুসন্ধান চলছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, বগুড়া শহরের বিভিন্ন এলাকায় কিছু নামিদামি ক্লাব রয়েছে। আগে খেলাধুলা চললেও এখন বন্ধ। ক্লাবে কোনো ক্রীড়া সামগ্রী নেই। কোনো প্রতিযোগিতাতেও অংশ নেয়া হয় না। এসব ক্লাবে সবার প্রবেশাধিকার নেই। শুধু জুয়াড়ি ও নির্দিষ্ট ব্যক্তিরা এসব ক্লাবে ঢুকতে পারেন। সামনে ক্লাবের সাইনবোর্ড থাকলেও ভিতরে জুয়া চলে।

অন্যতম ক্লাব হল শহরের জিরো পয়েন্ট সাতমাথায় টেম্পল রোডে পুলিশের অস্থায়ী ক্যাম্পের সামনে বগুড়া টাউন ক্লাব, নবাববাড়ি সড়কে বগুড়া রাইফেল ক্লাব, জলেশ্বরীতলায় আলতাফুন্নেছা খেলার মাঠ সংলগ্ন ইউনাইটেড ফ্রেন্ডস ক্লাব (ইউএফসি), শহরের কাটনারপাড়ায় শহীদ তারেক সংঘ।

এ ছাড়া শহরের সেউজগাড়িতে একটি বাড়িতে, তিনমাথা এলাকায় ভাড়া ভবনে ও বিভিন্ন উপজেলায় নানা নামে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ছত্রছায়ায় জুয়া চলে আসছে।

১৮৯৬ সালে শহরের সাতমাথায় গড়ে ওঠে বগুড়া টাউন ক্লাব। ঐতিহ্যবাহী এ ক্লাবে মাহবুবর রহমান বড় কালু, সারোয়ার মাস্টারের মতো কিংবদন্তি ফুটবলার সৃষ্টি হয়। পরবর্তীকালে ওই ক্লাব জুয়াড়ি ও মাদকসেবিদের ঘাঁটি হয়ে যায়।

গত ১৯ বছর সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালনকারী শামীম কামাল শামীমের নেতৃত্বে দুপুর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত জুয়ার আসর বসে। প্রতিদিন এ ক্লাবে শিক্ষক, রাজনীতিকসহ বিভিন্ন পেশার বিপুলসংখ্যক মানুষ জুয়া খেলতে আসেন। ভিতরে মাদক সেবনও চলে।

শনিবার রাতে সদর থানা পুলিশ অভিযান চালিয়ে সাধারণ সম্পাদক শামীমসহ ১৫ জুয়াড়িকে গ্রেফতার করে। তাদের বিরুদ্ধে মামলা ও রোববার আদালতের মাধ্যমে তাদের জেলহাজতে পাঠানো হয়েছে।

শহরের কাটনারপাড়ায় ১৯৭২ সালে প্রতিষ্ঠিত শহীদ তারেক সংঘে আগে ক্রিকেট, ফুটবলসহ বিভিন্ন খেলা চলত। এ ক্লাবের অনেক কৃতী খেলোয়াড় এখনও ক্রীড়া জগতে রয়েছেন। মাঝে মাঝে ফুটবল টুর্নামেন্টে অংশ নেয়া হয়।

ঐতিহ্যবাহী ওই ক্লাবে দীর্ঘদিন ধরে রাতভর জুয়া ও মাদক আসর বসে। কয়েক বছর আগে র‌্যাব-১২ বগুড়া ক্যাম্পের সদস্যরা এ ক্লাবে হানা দিয়ে টাকা, জুয়ার সরঞ্জামসহ বেশ কয়েকজনকে গ্রেফতার করেছিলেন। এরপরও সেখানে জুয়া বন্ধ হয়নি।

ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক শাহীনুর ইসলাম শাহীন তার ক্লাবে এখন কোনো জুয়া চলে না বলে দাবি করেছেন।

আলতাফুন্নেছা খেলার মাঠ সংলগ্ন ইউএফসি ক্লাবে এক সময় অনেক কৃতী খেলোয়াড়দের উঠা-বসা ছিল। পরবর্তীকালে এ ক্লাবে জুয়া ছাড়া আর কিছুই চলে না। নবাববাড়ি সড়কে রাইফেল ক্লাবে রাতভর জুয়াড়িদের আড্ডা ও মাদক সেবন চলে বলে অভিযোগ রয়েছে।

তবে রাইফেল ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক মহতাসিম মেহেদী সাংবাদিকদের কাছে অভিযোগটি দৃঢ়তার সঙ্গে অস্বীকার করেন।

তিনি দাবি করেন, তার ক্লাবে বয়স্ক মানুষরা তাস খেলে সময় অতিবাহিত করে থাকেন। শহরের সেউজগাড়ি এলাকায় ওয়ার্ড যুবদল সভাপতি আবদুল জলিলের সহযোগিতায় দীর্ঘদিন জুয়া চলছে। প্রশাসন এটা জানলেও নেপথ্যে প্রভাবশালী কোনো মিডিয়াকর্মী সম্পৃক্ত থাকায় সেখানে অভিযান চালাতে পারে না।

শেরপুর উপজেলার খন্দকারটোলা এলাকায় নুরুল ইসলাম নামে এক ব্যক্তির তত্ত্বাবধানে দীর্ঘদিন জুয়ার আসর বসে। সেখানে পুলিশ ও রাজনীতিকরা সুবিধা পেয়ে থাকেন।

অতিষ্ট ৪-৫ জন এলাকাবাসী এ ব্যাপারে বগুড়ার সাবেক এক এসপির কাছে লিখিত নালিশ করেছিলেন। পরদিন পুলিশ ও জুয়াড়িরা ওইসব ব্যক্তির বাড়িতে গিয়ে শাসিয়ে আসে। ফলে কেউ জুয়ার ব্যাপারে অভিযোগ করতে সাহস করেননি।

এ ছাড়াও আদমদীঘি উপজেলার সান্তাহারের আবদুল জলিল জুয়া ও মাদক ব্যবসা করে থাকেন। এলাকাবাসী জুয়া বন্ধে আদমদীঘি থানা ও বগুড়া জেলা পুলিশকে অবহিত করলেও কোনো লাভ হয়নি। শাজাহানপুর উপজেলার দুরুলিয়া গ্রামের একটি বাঁশঝাড়ে উপজেলা প্রজন্ম লীগের সাধারণ সম্পাদক আবদুল হালিমের নেতৃত্বে রাতভর জুয়ার আসর বসে।

নন্দীগ্রামের ভাটরা ইউনিয়নের কুড়িরা পণ্ডিতপুকুর টাইগার ক্লাবে সন্ধ্যার পর নিয়মিত জুয়া খেলা হয়। সুখানগাড়িতে বেলালের নেতৃত্বে জুয়া বসে। ধুনট উপজেলা সদরে হেদায়েতুল ইসলাম নামে এক স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতার বাড়িতে জুয়া খেলা হয়। তার চাচাতো ভাই ফরহাদ হোসেনের নেতৃত্বে বেলকুচি ও চৌকিবাড়ি গ্রামে জুয়া খেলা হয়ে থাকে।

বানিয়াজান বাঁধ, মানিক পোটল, এলাঙ্গী বাজার, ছোট এলাঙ্গী, বেড়েরবাড়ি গ্রামে জুয়ার আসর বসে। তবে সংশ্লিষ্ট সবা জুয়ার আসর বসানোর কথা দৃঢতার সঙ্গে অস্বীকার করেন।

বগুড়া ডিবি পুলিশের ইন্সপেক্টর আসলাম আলী জানান, তার জানা মতে জেলার কোথায় ক্যাসিনো নেই। কোথাও জুয়ার আসরও বসে না। তারপর তারা এ ব্যাপারে অনুসন্ধান চালিয়ে যাচ্ছেন। কোথাও খোঁজ পেলে অভিযান চালাবেন।

বগুড়ার সদর সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (মিডিয়া) সনাতন চক্রবর্তী একই ধরনের মন্তব্য করেন।

জেলার খবর
অনুসন্ধান করুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×