অগ্নিদগ্ধ মাজেদার আকুতি

মিলমালিক তো ক্ষতিপূরণ পাবে, কিন্ত হামার কি হবে?

  দিনাজপুর ও বিরল প্রতিনিধি ০২ মার্চ ২০১৮, ১৮:১১ | অনলাইন সংস্করণ

মাজেদা

‘মিলত কাম করিবা যাই আগুনত পুড়ি ৪ দিন থাকি হাসপাতালের বিছানত শুতি (শুয়ে) যন্ত্রণায় ছটপটাছি। কিন্তু আইজ পর্যন্ত মালিক তো দূরের কথা-মিলের কেহ হামার খোঁজখবর নিবা আসে নাই। মালিক তো ক্ষতিপূরণ পাবে, কিন্তু হামার কি হবে? হামার তো এখন চিকিৎসাও করা কঠিন। কাজকাম বন্ধ, খামো কী আর চিকিৎসা চালামো কেমন করি।‘

দিনাজপুরের বিরল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে যুগান্তরের কাছে এমন আকুতি জানান বিরল উপজেলার রূপালী বাংলা জুটমিলে অগ্নিকাণ্ডে দগ্ধ শ্রমিক মাজেদা বেগম (২৫)।

মাজেদা বিরল উপজেলার রবিপুর গ্রামের সফিকুল ইসলামের স্ত্রী। গত ৮ বছর আগে তার স্বামী সফিকুল দুই সন্তানকে ছেড়ে চলে যায়। দুই সন্তান মাহফুজ (১০) ও সুমনের (৮) ভরণপোষণ আর লেখাপড়ার খরচ চালাতেই পার্শ্ববর্তী রূপালী বাংলা জুটমিলে শ্রমিকের কাজ করছিলেন মাজেদা। দিনে কাজ করলে সপ্তাহে পেতেন ১ হাজার ২৬০ টাকা এবং রাতে কাজ করলে পেতেন ১ হাজার ৩৩০ টাকা। এখান থেকে আবার প্রতি সপ্তাহে চিকিৎসার জন্য মিল কর্তৃপক্ষ কেটে রাখত ১০ টাকা করে।

রেলওয়ের জায়গায় বসবাস করে এই টাকা দিয়ে কোনোরকম দুই ছেলের ভরণপোষণ আর লেখাপড়ার খরচ চালাতেন মাজেদা। কিন্তু গত মঙ্গলবার বিকালে তার কর্মক্ষেত্র রূপালী বাংলা জুটমিলে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটলে দগ্ধ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন তিনি। কিন্তু হাসপাতালে ভর্তির পর যেই মিলে কাজ করতে গিয়ে এই পরিণতির শিকার, সেই মিলের কেউ এখন পর্যন্ত খোঁজখবর নেয়নি এই অসহায় শ্রমিকের চিকিৎসা তো দূরের কথা।

অগ্নিদগ্ধ মাজেদা বেগম জানান, হাসপাতালে তার সহকর্মী শ্রমিকরা ছাড়া মিলের কেউ খোঁজ নিতে আসেনি তার।

তার খোঁজ নিতে আসা মিলের শ্রমিক মমিনুল ইসলাম জানান, শুধু মাজেদা নয়; অগ্নিদগ্ধ ১২ শ্রমিকের কারও খোঁজ নেয়নি মিল কর্তৃপক্ষ। চিকিৎসা তো দূরের কথা তাদের বকেয়া বেতন ও চিকিৎসার জন্য কেটে নেয়া টাকাও দিচ্ছে না মিলমালিক। এই অবস্থায় অগ্নিদগ্ধ অসহায় শ্রমিকরা কীভাবে তাদের চিকিৎসার খরচ চালাবে?

তিনি জানান, যার কাজ করতে গিয়ে শ্রমিকদের ভাগ্যের এই পরিণতি, তাদের চিকিৎসা ব্যয়ের তো কোনো খবরই নেই, ন্যূনতম সহমর্মিতা জানাতে আসেনি মিলের কেউ। শুধুমাত্র বুধবার স্থানীয় সংসদ সদস্য খালিদ মাহমুদ চৌধুরী ও বিরল পৌরসভার মেয়র আলহাজ সবুজার সিদ্দিক সাগর এসে দেখে গেছেন।

অপর মিল শ্রমিক মমিনুল ইসলাম ও মুক্তা পারভীন জানান, মিলমালিক দগ্ধ রোগীদের খোঁজ না নিয়ে এখন ব্যাংক আর ইন্স্যুরেন্সের লোকজনদের নিয়েই ব্যস্ত। মিলের যা ক্ষতি হয়েছে তার চেয়ে বেশি টাকা আদায়ে এখন ব্যস্ত মিলমালিক ও মিলের কর্মকর্তারা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অগ্নিদগ্ধ ১২ শ্রমিকের কারও খোঁজখবর নেয়নি মিল কর্তৃপক্ষ। অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত মিলের ক্ষতিপূরণের টাকা আদায়ে মিলমালিক ও কর্মকর্তারা ব্যস্ত থাকলেও অগ্নিদগ্ধ শ্রমিকরা কীভাবে আছেন তার খোঁজখবর নিচ্ছেন তারা।

এ ব্যাপারে জানতে শুক্রবার রূপালী বাংলা জুটমিলের মহাব্যবস্থাপক (জিএম) হামিদুর রহমানের মোবাইল ফোনে কল করলে তিনি যুগান্তরকে জানান, আগে মিলটাকে দেখব, না রোগীকে দেখব? আমরা এখন মিলের আগুন নেভানো নিয়েই ব্যস্ত। আর রোগীকে তো উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। সেখানে তাদের চিকিৎসা চলছে।

এদিকে রূপালী বাংলা জুটমিলে অগ্নিকাণ্ডে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ পুরোপুরি নিরূপণ করা না গেলেও মিলের মহাব্যবস্থাপক (জিএম) হামিদুর রহমান জানান, মিলের মধ্যে ২০ কোটি টাকার পাট ও পাটজাত পণ্য এবং ২৫০ কোটি টাকার মেশিনপত্র ছিল।

উল্লেখ্য, গত ২৭ ফেব্রুয়ারি মঙ্গলবার বিকালে দিনাজপুরের বিরল উপজেলার রূপালী বাংলা জুটমিলে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এতে মিলে কর্মরত ১১০০ শ্রমিকের মধ্যে ১২ জন অগ্নিদগ্ধ হন।

জেলার খবর
অনুসন্ধান করুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×