ভোলার ঘটনার যে ব্যাখ্যা দিল পুলিশ সদর দফতর

  যুগান্তর রিপোর্ট ২১ অক্টোবর ২০১৯, ১৪:২৭ | অনলাইন সংস্করণ

ভোলার ঘটনার যে ব্যাখ্য দিল পুলিশ সদর দফতর

ভোলায় পুলিশের সঙ্গে রোববার ‘তৌহিদি জনতা’র সংঘর্ষে সাধারণ মানুষ হতাহতের ঘটনায় নিহতদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছে পুলিশ সদর দফতর।

রোববার (২০ অক্টোবর) রাতে সদর দফতর থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ সমবেদনা জানানো হয়। একই সঙ্গে এ ঘটনার একটি ব্যাখ্যা দেয়া হয়েছে পুলিশ সদর দফতর থেকে।

এ ছাড়া সাধারণ জনগণের প্রতি অনুরোধ জানানো হয়েছে যে, গুজব ছড়িয়ে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট করবেন না এবং কোনো অবস্থাতেই ধর্মীয় উপাসনালয়ে আক্রমণ করবেন না।

এসব বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় ও সামাজিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে পুলিশকে সহায়তা করতে অনুরোধ জানানো হয়েছে।

এ ছাড়া ঘটনাটি তদন্তে গঠন করা হয়েছে ৫ সদস্যের তদন্ত কমিটি।

সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ‘ভোলার বোরহানউদ্দিন উপজেলা ঈদগাহ মাঠে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে পুলিশসহ সাধারণ মানুষের হতাহতের ঘটনায় পুলিশ সমবেদনা জ্ঞাপন করছে। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট ঘটনার বিষয়ে যেকোনো প্রকার বিভ্রান্তি এড়াতে পুলিশ সদর দফতর প্রকৃত ঘটনাটি জনসমক্ষে তুলে ধরার প্রয়োজন মনে করছে।’

এর পর সেখানে বলা হয়, ‘গত ১৮ অক্টোবর নিজ ফেসবুক আইডি হ্যাক হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে বিপ্লব চন্দ্র বৈদ্য (২৫) ওরফে শুভ নামে এক যুবক রাত ৮টা ৫ মিনিটে ভোলা জেলার বোরহানউদ্দিন থানায় জিডি করেন, যার জিডি নং-৪৪০। জিডি করার সময় থানায় অবস্থানের সময়েই বিপ্লব চন্দ্র বৈদ্যের নম্বরে একটি কল আসে এবং তার কাছে চাঁদা দাবি করা হয়।

বিষয়টি তাৎক্ষণিকভাবে তিনি ওসিকে জানান। ওসি বিষয়টি ভোলা জেলার পুলিশ সুপারকে জানান। প্রযুক্তির সাহায্য নিয়ে সেদিন রাতের মধ্যেই বিপ্লব চন্দ্র বৈদ্যের ফেসবুক অ্যাকাউন্ট হ্যাককারী ও তার মোবাইলে কলকারী শরিফ এবং ইমন নামে দুই মুসলিম যুবককে পটুয়াখালী এবং বোরহানউদ্দিন থেকে আটক করে পুলিশ। আটকের পর জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তাদের বোরহানউদ্দিন থানায় নেয়া হয়।

ইতোমধ্যে শুভর ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে দেয়া কথিত ‘কমেন্টের’ জেরে এলাকার ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা উত্তেজিত হতে থাকেন। ফেসবুকে ধর্মীয় মন্তব্যের অভিযোগে মন্তব্যকারীর ফাঁসি দাবি করেন স্থানীয় আলেম সমাজ।

বোরহানউদ্দিন উপজেলা সদরের ঈদগাহ মাঠে রোববার বেলা ১১টায় তারা প্রতিবাদসভার ঘোষণা দেয়। এ ঘোষণার কথা শুনলে শনিবার (১৯ অক্টোবর) সন্ধ্যায় বোরহানউদ্দিন থানায় জেলা প্রশাসক, ইউএনও, থানার অফিসার ইনচার্জ ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিসহ আলেম সমাজের প্রতিনিধিদের নিয়ে দীর্ঘ সময় বিষয়টি আলোচনা করে পুলিশ।

আলেম সমাজের অভিযোগের ভিত্তিতে বিপ্লব চন্দ্র বৈদ্যকে আটক দেখানো হয়। এ বিষয়ে উপযুক্ত আইনিব্যবস্থা গ্রহণের নিশ্চয়তা পেয়ে প্রতিনিধিত্বকারী আলেম সমাজ তাদের পূর্বঘোষিত প্রতিবাদ কর্মসূচি বাতিলের ঘোষণা দেন।

পুলিশ সদর দফতরের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, ‘সমাবেশ বাতিলের ঘোষণা সত্ত্বেও পুলিশ সার্বক্ষণিক সতর্ক থাকে। পর দিন সকাল থেকেই কিছু লোক ঈদগাহ ময়দানে সমবেত হতে থাকেন। ময়দানের বিভিন্ন পয়েন্টে বসানোর জন্য ১৭টি মাইক নিয়ে আসা হয়।

যেকোনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে পুলিশ মোতায়েন করা হয়। সমবেত লোকজনকে সরিয়ে নিতে বললে উপস্থিত আলেমরা নিশ্চিত করেন, লোকজন কোনো রকম বিশৃঙ্খলা করবে না।

এরই মধ্যে পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনায় এবং যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা এড়াতে স্থানীয় পুলিশকে সহায়তা দিতে সকালেই বরিশাল থেকে রেঞ্জ পুলিশের অতিরিক্ত ডিআইজি ভোলায় যান।

অতিরিক্ত ডিআইজি ও ইউএনওকে নিয়ে পুলিশ সুপার ঘটনাস্থলে গিয়ে উপস্থিত জনগণের উদ্দেশে বক্তব্য রাখেন। ঘটনার বিস্তারিত বর্ণনা করে প্রয়োজনীয় সব আইনিব্যবস্থা গ্রহণ করার বিষয়ে তাদের শ্বস্ত করেন। তাদের কথায় আশ্বস্ত হয়ে সমবেত লোকজন ঈদগাহ ময়দান ত্যাগ করেন।

‘উপস্থিত জনগণের উদ্দেশে বক্তব্য শেষে পুলিশ সুপার ও অতিরিক্ত ডিআইজিসহ অন্য কর্মকর্তারা মাদ্রাসার একটি কক্ষে অবস্থান নেন। এরই ধ্যে অন্য একটি গ্রুপ ঈদগাহ ময়দানে প্রবেশ করে সাধারণ ধর্মপ্রাণ মানুষকে উত্তেজিত করতে থাকেন। এর পর একদল লোক বিনা উসকানিতে মাদ্রাসার অফিসকক্ষে অবস্থানরত কর্মকর্তাদের ওপর আক্রমণ করেন।

আক্রমণকারীদের একদল আগ্নেয়াস্ত্রে সজ্জিত হয়ে পুলিশ ও অন্যান্য কর্মকর্তার ওপর আক্রমণ চালান। আক্রমণকারীদের গুলিতে ও হামলায় বরিশাল রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজিসহ পুলিশের তিন সদস্য মারাত্মক আহত হন। এমন পরিস্থিতিতে ইউএনও ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নির্দেশে আত্মরক্ষার্থে ও সরকারি জানমাল রক্ষার্থে ও উত্তেজিত লোকজনকে নিবৃত্ত করার জন্য প্রথমে টিয়ারশেল ও পরে শটগান চালায় পুলিশ।

পরিস্থিতির ভয়াবহতা বেড়ে গেলে একপর্যায়ে ম্যাজিস্ট্রেটের নির্দেশে পুলিশ গুলি চালাতে বাধ্য হয়। আক্রমণকারীদের গুলিতে মারাত্মক আহত পুলিশ সদস্যকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকার সিএমএইচে স্থানাস্তর করা হয়েছে। এ ঘটনায় নিহত চারজনের মধ্যে অন্তত দুজনের মাথা ভোঁতা অস্ত্র দ্বারা থেঁতলানো বলে নিশ্চিত করেছেন কর্তব্যরত চিকিৎসক।’

সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ‘এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তে ডিআইজি বরিশাল রেঞ্জকে প্রধান করে পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। এই কমিটিতে পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স, এসবি, পিবিআই এবং জেলা পুলিশ থেকে একজন করে মোট চারজন কর্মকর্তা সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। কমিটিকে সাত কার্য দিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিল করতে বলা হয়েছে।’

সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, ‘সার্বিক ঘটনা পর্যালোচনায় এটি স্পষ্ট যে, পুলিশ ঘটনার প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটনে শুরু থেকে তৎপর থাকা সত্ত্বেও এবং আলেম সমাজ পুলিশের গৃহীত ব্যবস্থার প্রতি আস্থা রেখে কর্মসূচি স্থগিত করলেও কোনো একটি স্বার্থান্বেষী মহল ধর্মকে পুঁজি করে একটি সামাজিক অস্থিরতা তৈরির অপপ্রয়াস চালিয়েছে। পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। ঘটনাস্থলসহ সারা দেশে পুলিশকে সতর্কাবস্থায় রাখা হয়েছে।’

প্রসঙ্গত রোববার দিবাগত রাতে বোরহানউদ্দিন উপজেলা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের এক যুবকের হ্যাক করা ফেসবুক আইডি থেকে উদ্দেশ্যমূলকভাবে ‘ধর্ম নিয়ে আপত্তিকর পোস্ট’ দেয়া কেন্দ্র করে পুলিশ-জনতা সংঘর্ষের ঘটনায় মামলা হয়েছে।

পুলিশের ওপর হামলার ঘটনায় বোরহানউদ্দিন থানার এসআই আজিজুল হক বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা পাঁচ হাজার জনকে আসামি করে একটি মামলা করেন, যার মামলা নং-১৮, তারিখ: ২০-১০-২০১৯।

ভোলার সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) শেখ সাব্বির হোসেন জানান, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পুরো উপজেলায় পুলিশের পাশাপাশি বিজিবি, কোস্টগার্ডসহ কয়েক স্তরের নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে।

সংঘর্ষের ঘটনায় ৩০ পুলিশ আহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে ১০ জন চিকিৎসাধীন। পুলিশ এখন পর্যন্ত ১৫ জনকে আটক করেছে।

বোরহানউদ্দিন থানার ওসি এনামুল হক বলেন, পুলিশের ওপর হামলার ঘটনায় এ মামলা করা হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত পরিস্থিতি শান্ত রয়েছে।

এদিকে ভোলা পুলিশ সুপার সরকার মোহাম্মদ কাউসার জানান, ফেসবুকে এ কটূক্তির ঘটনায় হিন্দু বিপ্লব চন্দ্র শুভ, মো. শাকিব ও লিমনসহ তিনজনের বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা (নং ১৭) দেয়া হয়। এ মামলায় তাদের ভোলা কোর্টে পাঠানো হয়েছে।

উল্লেখ্য, রোববার সকাল ১০টায় বোরহানউদ্দিন পৌরসভার ঈদগাহ মাঠে সমাবেশ শেষে শুরু হওয়া এ সংঘর্ষে গুলি, টিয়ারশেল ও ইটপাটকেল নিক্ষেপ করা হয়।

সংঘর্ষে আহত ৪৫ জনকে ভোলা সদর ও ৩০ জনকে বরিশাল শেরেবাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং বাকিদের বোরহানউদ্দিন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়। আহতদের বেশিরভাগই গুলিবিদ্ধ।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে চার প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। বিজিবি, পুলিশ ও র্যাবের টহল জোরদার করার পর বিকালেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এ ঘটনায় তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।

নিহতরা হলেন- বোরহানউদ্দিন উপজেলার মহিউদ্দিন পাটওয়ারীর মাদ্রাসাছাত্র মাহবুব (১৪), উপজেলার কাচিয়া ইউনিয়নের ২নং ওয়ার্ডের দেলোয়ার হোসেনের কলেজপড়ুয়া ছেলে শাহিন (২৩), বোরহানউদ্দিন পৌরসভার ৩নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা মাহফুজ (৪৫) এবং মনপুরা হাজিরহাট এলাকার বাসিন্দা মিজান (৪০)।

জেলার খবর
অনুসন্ধান করুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×