বাংলাদেশের সঙ্গে পাবলিক টু পাবলিক সম্পর্ক গড়তে চান মেঘালয়ের মুখ্যমন্ত্রী

প্রকাশ : ০৬ নভেম্বর ২০১৯, ১৭:০৯ | অনলাইন সংস্করণ

  সিলেট ব্যুরো

মতবিনিময় সভায় বক্তব্য রাখেন ভারতের মেঘালয় রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী কনরাড কনভ্যাল সাংমা

ভারতের মেঘালয় রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী কনরাড কনভ্যাল সাংমা বলেছেন, বাংলাদেশ বর্তমানে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ অর্থনীতির দেশ। বাংলাদেশে বিগত কয়েক বছরে শিল্প, বাণিজ্য, সামাজিক, অর্থনৈতিকসহ সবক্ষেত্রে অভূতপূর্ব উন্নয়ন হয়েছে।

তিনি বলেন, ভারত সরকার বাংলাদেশের সঙ্গে বাণিজ্যিক ও সামাজিক সম্পর্ক বৃদ্ধিতে জোর দিচ্ছে। বিশেষ করে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্য সমূহের উন্নয়নে বাংলাদেশের গুরুত্ব অপরিসীম। আমরা বাংলাদেশের সঙ্গে পাবলিক টু পাবলিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে চাই।

মঙ্গলবার রাতে দি সিলেট চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রির (এসসিসিআই) নেতৃবৃন্দের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে কনরাড কনভ্যাল সাংমা এসব কথা বলেন।

তিনি বলেন, পর্যটন খাতের উন্নয়নে বাংলাদেশ ও মেঘালয়ের ট্যুর অপারেটরদের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক বৃদ্ধি করা প্রয়োজন।

কয়লা রফতানি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমরা বাংলাদেশের সঙ্গে আমদানি-রফতানি বাণিজ্য সুন্দরভাবে চালু রাখতে চাই। কিন্তু পরিবেশের ভারসাম্যের কথা বিবেচনা করে মাঝে মধ্যে কয়লা রফতানি বন্ধ করা হয়ে থাকে। এ ব্যাপারে স্থায়ী সমাধান খুঁজে বের করতে ভারত সরকার কাজ করছে।

মেঘালয়ের মুখ্যমন্ত্রী তামাবিলের বিপরীতে ডাউকি এলসি স্টেশনের অবকাঠামোগত উন্নয়নের আশ্বাস প্রদান করেন। বাংলাদেশের সঙ্গে আমদানি-রফতানি বাণিজ্যের প্রসারে নতুন দুটি এলসি স্টেশন চালুর পরিকল্পনা ভারত সরকারের রয়েছে বলে জানান। তিনি সিলেট চেম্বার অব কমার্সের পক্ষ থেকে প্রতিনিধিদলকে শিলং ভ্রমণের আমন্ত্রণ জানান।

সিলেট চেম্বারের সভাপতি আবু তাহের মো. শোয়েবের সভাপতিত্বে মতবিনিময় সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মেঘালয় রাজ্যের বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রী স্নিয়াওভালাং ধর, শিক্ষামন্ত্রী লেকমেন রিম্বুই, কৃষিমন্ত্রী বেনতেইদর লিংডহ।

সভাপতির বক্তব্যে এসসিসিআইয়ের সভাপতি আবু তাহের মো. শোয়েব বলেন, ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য সম্পর্ক অত্যন্ত চমৎকার। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বাংলাদেশি পণ্যের প্রচুর চাহিদা রয়েছে। কিন্তু কিছু নন ট্যারিফ অসুবিধার কারণে চাহিদা অনুযায়ী পণ্য রফতানি করা যাচ্ছে না। এসব সমস্যা সমাধানে ভারত সরকারকে আন্তরিক হতে হবে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের বর্তমান সরকার অত্যন্ত বিনিয়োগবান্ধব। বাংলাদেশে বিনিয়োগের নতুন নতুন ক্ষেত্র সৃষ্টি হয়েছে। তিনি সিলেটের কোম্পানীগঞ্জে নির্মিত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব হাইটেক পার্ক ও গোয়াইনঘাটে নির্মাণাধীন স্পেশাল ইকোনমিক জোনে বিনিয়োগের জন্য ভারতীয় বিনিয়োগকারীদের আহবান জানান।

আবু তাহের মো. শোয়েব বাংলাদেশের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পর্যটন, আইটি, শিল্প ইত্যাদি খাতেও বিনিয়োগের জন্য ভারতীয় বিনিয়োগকারীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।

তিনি বলেন, অনেক বাংলাদেশি অবকাশকালীন সময়ে শিলং ও গৌহাটি ভ্রমণ করেন। কিন্তু সেখানে তাদেরকে হোটেল সংক্রান্ত জটিলতায় পড়তে হয়। তিনি শিলং ও গৌহাটির বিনিয়োগকারীগণ উৎসাহী হলে এবং সরকারের সহযোগিতা পেলে বাংলাদেশের বিনিয়োগকারীগণ শিলং ও গৌহাটিতে যৌথ উদ্যোগে হোটেল নির্মাণ করতে আগ্রহী বলে জানান। তিনি দ্বি-পাক্ষিক ব্যবসা-বাণিজ্যের উন্নয়নে সিলেট চেম্বারের পক্ষ থেকে সার্বিক সহযোগিতার আশ্বাস প্রদান করেন।

মতবিনিময় সভায় মেঘালয় রাজ্যের প্রিন্সিপাল সেক্রেটারি ড. শাকিল আহমদ বলেন, ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল ও বাংলাদেশের মধ্যে বিরাজমান অপার বাণিজ্য সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর এখনই সময়। ভারতকে চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহারের অনুমতি দিলে বাংলাদেশের রাজস্ব আয় যেমন বাড়বে তেমনি ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলও দারুণ লাভবান হবে। কারণ কলকাতা বন্দর ব্যবহার করে ত্রিপুরা ও গৌহাটিতে পণ্য পৌঁছাতে প্রায় ৩৬ ঘণ্টা সময় সড়ক পরিবহনে ব্যয় হয়, সেখানে চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহার করতে পারলে মাত্র ১০-১২ ঘণ্টার মধ্যে পণ্য ওইসব অঞ্চলে পৌঁছানো সম্ভব হবে।

সভায় প্রতিনিধিগণ বলেন, মেঘালয় থেকে প্রচুর পানি বাংলাদেশে প্রবাহিত হয়। এই পানির প্রবাহকে ব্যবহার করে যৌথ উদ্যোগে পানি বিদ্যুৎপ্লান্ট নির্মাণ করতে পারলে সেখান থেকে ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ অত্যন্ত কম খরচে উৎপাদন করা সম্ভব। এছাড়াও দুই দেশে উৎপাদিত কৃষিপণ্য বিক্রয়ের জন্য বর্ডার হাটের সংখ্যা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন।

সিলেট চেম্বারের পক্ষ থেকে বক্তাগণ ভারতে থেকে কয়লা রফতানি নিরবচ্ছিন্নভাবে চালু রাখা, বাংলাদেশ থেকে পণ্য রফতানির ক্ষেত্রে আইন-কানুন শিথিল করা, পণ্যের মান যাচাইয়ের ক্ষেত্রে বিএসটিআইয়ের সার্টিফিকেট গ্রহণ করা অথবা সীমান্তবর্তী এলাকায় ল্যাব স্থাপন করে তা যাচাই করা, ডাউকি এলসি স্টেশনের অবকাঠামোগত উন্নয়নসহ বিভিন্ন প্রস্তাবনা তুলে ধরেন।

সভায় অন্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন সিলেট চেম্বারের সিনিয়র সহ সভাপতি চন্দন সাহা, সহ সভাপতি তাহমিন আহমদ, পরিচালক মো. এমদাদ হোসেন, বারাকা পাওয়ার লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফাহিম আহমদ চৌধুরী, লিডিং ইউনিভার্সিটির সহযোগী অধ্যাপক রুমেল এম এস রহমান পীর।

উপস্থিত ছিলেন মেঘালয় সরকারের শিল্প ও বাণিজ্য সচিব মেবানশাই আর সিনরেম, পরিকল্পনা সচিব ড. বিজয় কুমার ডি, ভৌগলিক ও খনিজ সম্পদ সচিব ড. মানজুয়ান্তা, ভারতীয় সহকারী হাই কমিশনার এল কৃষ্ণমূর্তি, দৈনিক সিলেটের ডাকের ব্যবস্থাপনা সম্পাদক ওয়াহিদুর রহমান ওয়াহিদ, সিলেট চেম্বারের পরিচালক মো. মামুন কিবরিয়া সুমন, মো. সাহিদুর রহমান, ফালাহ উদ্দিন আলী আহমদ, আলীমুল এহছান চৌধুরী, ওয়াহিদুজ্জামান চৌধুরী (রাজিব), মো. আমিনুজ্জামান জোয়াহির, ফখর উস সালেহীন নাহিয়ান, সাবেক সিনিয়র সহ সভাপতি শাহ আলম, এফবিসিসিআইয়ের সাবেক পরিচালক মো. হিজকিল গুলজার, সিলেট চেম্বারের পরিচালক মুকির হোসেন চৌধুরী প্রমুখ।

এর আগে ভারতের মেঘালয় রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীসহ ২৪ সদস্যের এই প্রতিনিধি দল চার দিনের সফরে বাংলাদেশে এসেছেন। মঙ্গলবার বিকালে গোয়াইনঘাট উপজেলার তামাবিল ইমিগ্রেশন দিয়ে প্রতিনিধি দলের সদস্যরা বাংলাদেশে প্রবেশ করলে তাদের অভ্যর্থনা জানান বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতীয় সহকারী হাইকমিশনার এল কৃষ্ণ মূর্তি।

একইসঙ্গে গোয়াইনঘাট উপজেলা প্রশাসন ও তামাবিল স্থলবন্দরের ব্যবসায়ী সংগঠনের পক্ষ থেকেও তাদেরকে ফুলেল শুভেচ্ছা জানানো হয়।

এ সময় গোয়াইনঘাট উপজেলা নির্বাহী অফিসার বিশ্বজিৎ কুমার পাল, থানার ওসি (তদন্ত) হিল্লোল রায়, পূর্ব জাফলং ইউপি চেয়ারম্যান লুৎফর রহমান লেবু, তামাবিল চুনাপাথর, পাথর ও কয়লা আমদানিকারক গ্রুপের সহ সভাপতি জালাল উদ্দিন, সাধারণ সম্পাদক সরোয়ার হোসেন সেদু, যুগ্ম সম্পাদক ইলিয়াস উদ্দিন লিপু, কার্যকরী কমিটির সদস্য ও বিশিষ্ট ব্যবসায়ী জাকির হোসেন খান উপস্থিত ছিলেন।

মুখ্যমন্ত্রীসহ প্রতিনিধি দল ঢাকায় ও সিলেটে একাধিক যৌথসভায় অংশগ্রহণ শেষে আগামী শুক্রবার বিকালে ময়মনসিংহের ডলু সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশ ত্যাগ করবেন।