ছাত্রলীগ নেতার নামে অনুপ্রবেশের অভিযোগ

  যুগান্তর ডেস্ক    ০৫ নভেম্বর ২০১৯, ১৯:৫১ | অনলাইন সংস্করণ

ছাত্রলীগ নেতার নামে অনুপ্রবেশের অভিযোগ

২০১৬ সাল পর্যন্তও ঢাকায় মেয়েদের চোখের লেন্সের ব্যবসা করতেন। ব্যবসার পাশাপাশি বিএনপির পরিবার থেকে আসা সক্রিয়ভাবে ছাত্রশিবিরের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। কুষ্টিয়া দৌলতপুর আসনের বর্তমান সংসদ সদস্যের সঙ্গে খাতির জমিয়ে দৌলতপুর উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতির পদটি বাগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। এসব অভিযোগ কুষ্টিয়া ছাত্রলীগের সহসভাপতি তাশফীন আবদুল্লাহর বিরুদ্ধে।

তবে এ অভিযোগ পুরোপুরি অস্বীকার করেছেন ছাত্রলীগের ওই নেতা। এ বিষয়ে তার বক্তব্য হলো-তিনি ছাত্রলীগের উপজেলা সভাপতি হতে পারেন এমন খবরে তার প্রতিপক্ষ গ্রুপ তাকে ও তার পরিবারকে জড়িয়ে এডিট করা স্ক্রিনশট দিয়ে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছেন। তিনি এসবের বিরুদ্ধে আইসিটি আইনে মামলা করতেন কিন্তু উর্ধ্বতন নেতৃবৃন্দের পরামর্শে তিনি এখন পর্যন্ত তা থেকে বিরত রয়েছেন।

অভিযোগকারীদের বক্তব্য হলো- কুষ্টিয়া জেলার দৌলতপুর উপজেলার আড়িয়া ইউনিয়নের চক ঘোগা গ্রামের সাবেক বিএনপি নেতা মৃত আবুল কাসেম বিশ্বাসের ছেলে। আবুল কাসেম বিশ্বাস আড়িয়া ইউনিয়ন বিএনপির ১ নং সম্মানিত সদস্য ছিলেন। কিছুদিন আগে তিনি মৃত্যুবরণ করেছেন।

এদিকে মাদ্রাসা থেকে পাস করে ঢাকায় ছাত্রশিবির ও ব্যবসার সঙ্গে জড়িত থাকলেও ১৪ নভেম্বর ২০১৭ সালে কুষ্টিয়া জেলা ছাত্রলীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে সহসভাপতির পদ পেয়ে যান তাশফীন আব্দুল্লাহ।

অভিযোগ আছে, আওয়ামী লীগের এক আত্মীয় নেতার সুপারিশে বর্তমান জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদকের হাত ধরে তাসফিন জেলা ছাত্রলীগের এই গুরুত্বপূর্ণ পদটি পেয়ে যান। ছাত্রলীগের কোনো ইউনিটের সঙ্গে আগে সংশ্লিষ্টতা না থেকেও সরাসরি জেলা ছাত্রলীগের এত বড় পদ পাওয়াটা অনেকই বিস্ময় প্রকাশ করেন সেই সময়। তাসফিনের শিবির সংশ্লিষ্টতার কথা জেলা ছাত্রলীগের অনেক নেতা জানলেও প্রমাণের অভাবে বিষয়টি নিয়ে মুখ খোলেননি তখন।

হঠাৎ করেই কয়েকদিন আগে এই তাশফীন আব্দুল্লাহর ফেসবুক থেকে পাওয়া শিবির ও হেফাজত ইসলামীর সংশ্লিষ্টতার কিছু তথ্য প্রমাণের স্ক্রিনশট সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে জেলা ছাত্রলীগ নড়েচড়ে বসে। তাঁর নিজ এলাকা দৌলতপুরেও রাজনীতি সচেতন মানুষের মধ্যে চাঞ্চল্য তৈরি হয়।

ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া স্ক্রিনশটে দেখা গেছে, ২০১২ সাল থেকে ২১০৩ সালের মধ্যে ইসলামি শিবির ও হেফাজত ইসলামের বিভিন্ন পেজে তার সংশ্লিষ্টতা।বাঁশেরকেল্লা পেজে শিবিরের পক্ষে লেখা শেয়ার, আওয়ামী লীগের মন্ত্রীকে ব্যঙ্গ করে লেখা ছাত্রশিবির ও হেফাজতের স্ট্যাটাস তাসফিনের নিজ ফেসবুকে শেয়ার দেওয়া আছে। ইসলামী ছাত্রশিবিরের ক্যালেন্ডারও তার ফেসবুক টাইম লাইনে শেয়ার করা। এছাড়া শিবির ও হেফাজতের পেজ ‘নাগরিক হুশিয়ার, ‘ইসলামের কলম, কাণ্ডারি হুশিয়ার, ‘নাস্তিকরা হুশিয়ারসহ একাধিক ফেসবুক পেজের পক্ষে তাসফিন আব্দুল্লাহর সংশ্লিষ্টতা দেখা গেছে।

শিবির থেকে কিভাবে ছাত্রলীগের কমিটিতে প্রবেশ করলো? জানতে চাইলে কুষ্টিয়া জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি ইয়াছির আরাফত তুষার বলেন, আমি তাসফিনকে আগে চিনতাম না। কমিটিতে আসার পরে চিনলাম। তবে জেলা ছাত্রলীগের কমিটিতে ঢুকেছে আমাদের কমিটির সাধারণ সম্পাদকের সুপারিশে। সে ভালো বলতে পারবেন।

যখন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজের দলের মধ্যেই শুদ্ধি অভিযান শুরু করেছেন। অনুপ্রবেশকারীদের সারা দেশের কমিটি থেকে বের করে দিতে বলছেন। তাশফীন আব্দুল্লাহকে ছাত্রশিবিরের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার প্রমাণও মিলেছে। এই অবস্থায় তাকে বহিষ্কার করা হবে কি না— এ ব্যাপারে কুষ্টিয়া জেলা ছাত্রলীগের এই সভাপতি বলেন, ‘ছাত্রশিবির ও হেফাজতের সঙ্গে তার যে সংশ্লিষ্টতা ছিল, তা সে গোপন করে ছাত্রলীগের কমিটিতে ঢুকেছে। তথ্য প্রমাণ দিয়ে বহিষ্কারের জন্য কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের কাছে পাঠাবো।

এদিকে তাসফিনের বিষয়ে জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক সাদ আহমেদ বলেন, সে যদি ছাত্রশিবিরের কোনো পদে থাকেন, প্রমাণ পেলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কিন্তু সভাপতি বলেছেন, তাসফিনের কোন এক আত্মীয়ের সুপারিশে আপনি নাকি তাকে জেলা ছাত্রলীগ নেতা বানিয়েছে?— এমন প্রশ্নে সরাসরি কোনো জবাব দেননি সাদ আহমেদ। তিনি বলেন, এ ব্যাপারে কিছু বলতে চাই না।

তাসফিনের ছাত্রশিবির ও হেফাজতের সংশ্লিষ্টতা ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ার পর জেলা ছাত্রলীগের অনেক নেতাই এখন মুখ খুলেছেন। জেলা ছাত্রলীগের বর্তমান সহ-সভাপতি ও সাবেক সদস্য সাগর মাহমুদ বলেন, এই তাসফিনের বাড়ি আমাদের গ্রামে। সে মূলত বিএনপি পরিবারের ছেলে। তাঁর বাবা ইউনিয়ন বিএনপির নেতা ছিলেন। তাসফিন আব্দুল্লাহ মাদ্রাসা থেকে পাস করে ঢাকায় ব্যবসা করতেন। পাশাপাশি ছাত্র ছাত্রশিবিরের রাজনীতি সঙ্গে জড়িত ছিলেন বিষয়টি অনেকই জানতেন।

এই নেতা আরও বলেন, আমাদের নেত্রী যখন নিজ দলের কর্মীদের মধ্যে শুদ্ধি অভিযান চালাচ্ছেন তখন জামাত শিবির ও বিএনপির এই সব অনুপ্রবেশকারীদের এখনই দল থেকে বের করে দিতে হবে। তা না হলে এক সময় দল ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

তাসফিনের নিজ উপজেলা দৌলতপুর ছাত্রলীগের আহবায়ক চঞ্চল হোসেন বলেন, আগেই শুনেছিলাম তাসফিন ছাত্রশিবির করত। এখন তা প্রমাণ হয়ে গেল। এটি একটি ভয়াবহ ঘটনা। তাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হোক।

তাসফিনের ছাত্রশিবিরের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক নাজমুল হক সিদ্দিকী বলেন, তাসফিনের সম্পর্কে কিছু তথ্য আমার কাছে জেলা থেকে পাঠানো হয়েছে। আমার বাড়িও কুষ্টিয়া। কয়েকবার তার সঙ্গে দেখা হয়েছে। এখন জেলা কমিটি তার বিরুদ্ধে এ সব অভিযোগ নামা কেন্দ্র বরাবর পাঠালে কেন্দ্র তদন্ত করে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে।

শুধু তাসফিন আব্দুল্লাহই নয়, তাঁর বড় ভাই সায়ীদ আনছারী বিপ্লবের কপালও খুলে গেছে। দীর্ঘদিন সৌদি আরবে চাকরি করে দেশে ফেরেন। কোনো রাজনীতির সঙ্গে ছিলেন না। দলের দীর্ঘদিনের ত্যাগী নেতাদের পেছনে ফেলে কোনো এক অদৃশ্য শক্তির জোরে নৌকার প্রতীক পেয়ে ২০১৬ সালে ফাঁকা মাঠে আড়িয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান হয়ে যান।

অভিযোগের বিষয়ে তাশফীন আব্দুল্লাহর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি যুগান্তরকে বলেন, আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র চলছে। ফেসবুকে প্রকাশিত স্ক্রিনশটগুলো এডিট করা। বিষয়টি এমন নোংরামি পর্যায়ে চলে গেছে যে, আমার প্রতিপক্ষরা আমার মৃত বাবার নামেও মিথ্যা অপবাদ দিচ্ছে। এজন্য আমি রাগে ও ক্ষোভে ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাসও দিয়েছি।

তাশফীন আবদুল্লাহ জানান, তিনি এসএসসি পিপুল বাড়িয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে এসএসসিতে জিপিএ ৪.৯৪ পেয়ে উত্তীর্ণ হন। খলিশাকুন্ডি ডিগ্রি কলেজ থেকে এইচএসসিতে জিপিএ ৪.৮০ পেয়ে পাস করে রাজধানীর বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ডেফোডিল ইউনিভার্সিটি থেকে কম্পিউটার সায়েন্সের অনার্স-মাস্টার্স করেন।

এদিকে তার নামে এসব স্ক্রিনশট ছড়িয়ে পড়ার পর ফেসবুক স্ট্যাটাসে তিনি লিখেছেন, আমাকে আমার প্রাণের সংগঠন ছাত্রলীগ থেকে অব্যাহতি দেয়া হোক। ব্যক্তি আক্রোশের জন্য আমি চাই না আমার প্রিয় সংগঠনের নামে কালিমা লাগুক। আমার প্রিয় নেতার নামে কেউ কালিমা লাগাক।

যুগান্তরকে তিনি বলেন, আমার নামে ২০১২/১৩ সালের কিছু ছবি এডিট করে হেফাজতের পোস্ট বলে ফেসবুকে দিয়ে আমাকে শিবির বলা হয়েছে। অথচ আমি সেই সময়ে জামাত শিবির ও যুদ্ধপরাধীদের বিরুদ্ধে শাহবাগে আন্দোলনে সক্রিয় ছিলাম। আমি সে সময় যে সক্রিয় ছিলাম সেটার ছবিসহ লিংক ফেসবুকে দিয়েছি।

আপনার বাবা বিএনপির সঙ্গে জড়িত ছিলেন কিনা জানতে চাইলে তাশফিন আবদুল্লাহ বলেন, এটা যে ভুয়া তা সচেতন যে কোনো ব্যক্তিই বুঝবেন। আমার বাবার নামে যে বিএনপির কমিটির তালিকা দেয়া হয়েছে সেটিতে বিএনপি উপজেলা কমিটির সভাপতি বা সেক্রেটারির কোনো স্বাক্ষর ও সিলে নেই। এটা ভুয়া কম্পিউটার কপি।

তাশফিন আবদুল্লাহ বলেন, যারা আমার নামে গুজব ছড়াচ্ছে তারা আসলে রাজনৈতিকভাবেও সচেতন নয়। কেউ যদি ওই এডিট করা হেফাজতের স্ক্রিনশটগুলো বিশ্বাসও করেন তবুও তো আমাকে শিবির কর্মী হিসেবে প্রমাণ করা যায় না। হেফাজত আর জামায়াত-শিবির দুইটা তো দুই মেরুর।

সবচেয়ে বড় কথা- আমার পরিবারে ১২ জন মুক্তিযাদ্ধা, আমি কী করে শিবির করি?

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে কুষ্টিয়া-১ দৌলতপুর আসনের এমপি আ. ক. ম. সরওয়ার জাহান বাদশাহ্ যুগান্তরকে বলেন, তাশফিন আবদুল্লাহকে আমি ভালোভাবেই চিনি, দীর্ঘদিন ধরে চিনি। সে শিবির করতো এমন কোনো তথ্য আমার জানা নেই। বরং, বিএনপি-জামায়াতের আগুন সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে মাঠে খুবই ভালো ভূমিকা রেখেছে। গত নির্বাচনে সে নৌকার পক্ষে খুবই ভালো কাজ করেছে। এখন তার বিরুদ্ধে বাজে কথা ফেসবুকে ছড়ানো হচ্ছে। এটা ঠিক নয়। আমাদের দলের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে খুবই সক্রিয়।

আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য সরওয়ার জাহান বাদশাহ্ আরও বলেন, আসলে ও (তাশফিন আবদুল্লাহ) একটা ক্রিয়েটিভ ছেলে। সম্প্রতি ডেঙ্গু সচেতনতায়ও সে দলের জন্য মাঠ পর্যায়ে নানা সচেতনতামূলক কর্মসূচির নেতৃত্ব দিয়েছে।

জেলার খবর
অনুসন্ধান করুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×