৬৭ বছর বয়সে রুসিয়ার লেখাপড়া!

প্রকাশ : ১৪ নভেম্বর ২০১৯, ১৩:২৬ | অনলাইন সংস্করণ

  মিজানুর রহমান, ঝিনাইদহ থেকে

হরিণাকুন্ডের শিশুকলী বিদ্যানিকেতন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে লেখাপড়া করছেন ৬৭ বছর বয়সী রুসিয়া বেগম। ছবি: যুগান্তর

ইচ্ছেশক্তি দিয়ে স্বপ্নপূরণ করা যায়। মনকে শক্ত করে ধরে রাখতে পারলেই হলো। এর জন্য বয়স বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে না। এ সত্য আজ প্রতিষ্ঠিত। রুসিয়া বেগম সেটি প্রমাণ করেছেন। তার বয়স এখন ৬৭ বছর। হার না মানা ইচ্ছেশক্তি দিয়ে স্বপ্নপূরণের পথে হাঁটছেন তিনি। 

রুসিয়া ঝিনাইদহের হরিণাকুন্ডু উপজেলাসংলগ্ন শিশুকলী বিদ্যানিকেতন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হন ৪র্থ শ্রেণিতে। ছোট ছোট শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নিয়মিত ক্লাস করেন তিনি। প্রতিযোগিতাও করছেন তিনি। ক্লাস পরীক্ষায় এগিয়ে যাচ্ছেন।

২০১৭ সালে রুসিয়া দ্বিতীয় শ্রেণিতে প্রথম হন। তবে পরের বছর তৃতীয় শ্রেণীর পরীক্ষায় তাকে টপকে ১০ বছর বয়সের জান্নাতুল ফেরদৌস প্রথম হয়েছিল। দ্বিতীয় হয়ে যায় সে। পঞ্চম শ্রেণীর সমাপনী পরীক্ষায় ভালো ফল করার জন্য ইতিমধ্যে প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছেন। আশা আছে উচ্চতর ডিগ্রি নেয়ার।

রুসিয়া ঝিনাইদহের হরিণাকুন্ডু উপজেলা শহরের আবুল হোসেন মালিতার স্ত্রী। এক ছেলে ও এক মেয়ের মা। তারা বিবাহিত। ছেলে গোলাম মোস্তফার ছেলে-মেয়েও স্কুলে পড়ে।। 

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, রুসিয়া শিশুকলী বিদ্যানিকেতন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রথম বেঞ্চে বসেছেন। তার পাশে বসা ক্লাসের ফাস্টগার্ল জান্নাতুল ফেরদৌস ও মেধাবী রিমি রহমান। ক্লাস নিচ্ছেন শিক্ষক ইলিয়াস হোসেন। 

রুসিয়া বেগম যুগান্তরকে বলেন, বয়স বেশি হলেও অন্য শিশুদের মতোই আচরণ করেন। স্যার বলে সম্মোধন করেন তাদের।  

তিনি জানান, কুষ্টিয়ার বৃত্তিপাড়া এলাকার ভগবাননগর গ্রামের তাহাজ উদ্দিনের কন্যা তিনি। ১৫ বছর বয়সে বিয়ে হয়। তাদের গ্রামে কোনো প্রাথমিক বিদ্যালয় ছিল না। বাবা-মা দূরের স্কুলে যেতে দিতেন না। বিয়ের পর সংসার জীবন শুরু হয়ে যায়। ছোট চাকরিজীবী স্বামী তার। ঘর আলো করে ছেলেমেয়ের জন্ম হয়। বড় হতে থাকে তার সংসার। 

তিনি আরও জানান, তার স্বামী কিছুটা পড়ালেখা জানেন। নিজে কোনো চিঠি পড়তে পারেন না। এমনকি পবিত্র কোরআন পড়ে অর্থ বোঝেন না। সিদ্ধান্ত নেন পড়ালেখা শিখবেন। অক্ষরজ্ঞান নিয়ে মরতে চান তিনি। নিরক্ষর হয়ে মৃত্যুবরণ করতে চান না। সিদ্ধান্ত নেন ২০১৫ সালের দিকে। শিশু শ্রেণীতে ভর্তি হন। 

এক বছর পর প্রথম শ্রেণিতে উন্নিত হন। নিয়মিত ক্লাস করেন, বাড়িতেও ঠিকমতো পড়ালেখা করেন। টপকে গেছেন আরও দুটি ক্লাস। এখন ৪র্থ শ্রেণিতে। আসছে বছর ৫ম শ্রেণিতে উঠবেন। রুসিয়ার ভাষায় পড়ালেখার জন্য বয়স লাগে না। ইচ্ছেশক্তি দিয়ে স্বপ্নপূরণ করা যায়। এ জন্য মনকে শক্ত করে প্রস্তুত করতে হয়। 

চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রী জান্নাতুল ফেরদৌস জানায়, সহপাঠী হলেও বয়সের কারণে তারা রুসিয়াকে দাদি বলে ডাকেন। এবার তিনি দাদিকে পেছনে ফেলে প্রথম হয়েছেন। 

আরেক ছাত্রী রিমি রহমান জানায়, দাদি তাদের অনেক ভালোবাসেন, তারাও দাদিকে ভালো বাসেন। 

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবদুল মজিদ জানান, অন্যদের মতো রুসিয়া ক্লাস করেন। বাড়ি থেকে ক্লাসের পড়া করে আসেন। সহপাঠীদের বড় ভাব তার। রুসিয়ার মতো একজন ছাত্রী পেয়ে তিনি খুশি।