পরের ক্ষেতে কামলা দেয়া সোবহান কুল চাষে লাখপতি
jugantor
পরের ক্ষেতে কামলা দেয়া সোবহান কুল চাষে লাখপতি

  শাহরিয়ার আলম সোহাগ, কালীগঞ্জ (ঝিনাইদহ) প্রতিনিধি  

২৬ জানুয়ারি ২০২০, ১৪:২৪:১৫  |  অনলাইন সংস্করণ

ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলায় বল সুন্দরী জাতের কুল।
ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলায় বল সুন্দরী জাতের কুল। ছবি: যুগান্তর

লেখাপড়ার প্রতি আগ্রহ ছিল কবিরুস সোবহানের। কিন্তু সে সময়ে কৃষক বাবার পরিবারে বাধা ছিল অভাব। তাই ইচ্ছা থাকলেও ৮ম শ্রেণি পাসের পর আর এগোতে পারেননি তিনি। বাধ্য হয়ে অন্য ভাইদের সঙ্গে নামতে হয়েছে কৃষিকাজে।

বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পৃথক হয়ে সংসার পাততে হয়েছে তাকে। তখন তার সম্পদ বলতে পৈতৃক সূত্রে পাওয়া মাত্র দেড় বিঘা চাষের জমি।

সেই সময়ে অভাব তাকে জাপটে ধরার কারণে পরের ক্ষেতে কামলার কাজ করতে হয়েছে। কিন্তু কখনও হতাশ হননি কবিরুস সোবহান।

এখন পরিশ্রমের ফলে সেই দেড় বিঘা থেকে সাড়ে সাত বিঘা জমি করেছেন তিনি। বর্তমানে তিনি লাখপতি বনে গেছেন বলে জানা গেছে।

এমন সফল ফলচাষি ঝিনাইদহের কালীগঞ্জের ত্রিলোচনপুর গ্রামের কবিরুস সোবহান। তার বাবার নাম ওয়াহেদুস সোবহান।

জানা যায়, কবিরুস সংসারকে মনে করেছেন একটি যুদ্ধক্ষেত্র। তাই দৃঢ় মনোবলকে পুঁজি করে পরিশ্রমের মাধ্যমে আজ হয়েছেন উপজেলার মধ্যে সফল ফলচাষি।

মাত্র ২০ বছরের ব্যবধানে তিনি ১২ বিঘা জমি কিনেছেন। সুন্দর একটি বসতবাড়ি তৈরি করেছেন। ফল রাখার জন্য ১২ লাখ টাকা খরচ করে মাঠেই নির্মাণ করেছেন কোল্ডস্টোরেজ। বর্তমানে নিজের ও লিজ নেয়া মিলে ২৪ বিঘা জমিতে বিভিন্ন ফলের চাষ রয়েছে।

এর মধ্যে প্রায় সাড়ে ৭ বিঘা জমিতে বল সুন্দরী ফলের চাষ করে ক্ষেতের কুল সবার নজর কেড়েছে। অতীত ও বর্তমান জীবনের হিসাব-নিকাশ মিলিয়ে এলাকার মানুষের কাছে তিনি জীবনযুদ্ধে জয়ী একযোদ্ধা হিসেবে পরিচিত।

সরেজমিন কবিরুস সোবহানের ফল বাগানে গেলে দেখা যায়, মাটির সামান্য ওপর থেকেই সব কুলগাছের ডালপালা চারদিক ছড়িয়ে পড়েছে। প্রতিটি ডালে প্রচুর পরিমাণে কুল ধরে মাটিতে নুয়ে পড়ছে। অবস্থাটা এমন গাছের পাতার চেয়ে গাছে কুল বেশি দেখা যাচ্ছে।

কুলগুলো দেখতে ঠিক অস্ট্রেলিয়ান আপেলের মতো। কিন্তু আকারে একটু ছোট। ক্ষেতের পাখি ঠেকাতে সারা ক্ষেতের ওপর দিয়ে টানানো রশিতে বেঁধে দেয়া হয়েছে বিশেষ ধরনের বোতল।

ক্ষেতের পাহারাদার ক্ষেতের মাঝখানে কুড়ের মধ্য থেকে রশি ধরে খানিক পর পর টানছে আর ছাড়ছেন এতে এক ধরনের শব্দ তৈরি হচ্ছে। এতে কোনো পাখিই ক্ষেতের কুল নষ্ট করতে পারছে না।

ওই মাঠের একটু দূরে আরেকটি ক্ষেতে রয়েছে একই জাতের কুল। সে ক্ষেতটিতেও একইভাবে চাষ করা হয়েছে বল সুন্দরী জাতের কুল। এ ক্ষেতটিতে কুলের ধরটা আরও বেশি। রঙটাও বেশ আকর্ষণীয়।

এর পাশেই রয়েছে তার ড্রাগন ক্ষেত। এর অল্প দূরেই থাইল্যান্ডের-৫ ও ৭ জাতের পেয়ারা। পেয়ারা ক্ষেতের পাশেই রয়েছে থাইল্যান্ডের বারোমাসি জাতের আম। যেখানে ছোট ছোট আমগাছে মাটি থেকে একটু ওপরে ছোট-বড় আম ধরে আছে।

 আবার কিছু কিছু আমগাছে সবেমাত্র মুকুল আসছে। সব ফলের ক্ষেতেই আগাছামুক্ত পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। ক্ষেতের ফলগুলো এবং ক্ষেত দেখলে প্রাণ জুড়িয়ে যাচ্ছে।

ক্ষেতেই দেখা হয় কৃষক কবিরুস সোবহানের সঙ্গে। তিনি বলেন, সাংসারিক জীবনে অভাবের তাণ্ডবে খুব কষ্ট করেছেন। কিন্তু তার বিশ্বাস ছিল পরিশ্রম করেই সফল হবেন। অর্থ না থাকলেও আত্মবিশ্বাসকে পুঁজি করে ২০০০ সালে প্রথমে কিছু ধারদেনার মাধ্যমে নিজের দেড় বিঘা জমিতে গাঁদা ফুলের চাষ শুরু করেন।

লাভ পেয়ে এ চাষেই জমি বর্গা নিয়ে ফুলচাষ বাড়াতে থাকেন। এভাবে ১২ বছর ফুলের চাষের মাধ্যমে বেশ সফল হন তিনি। এর পর ফল চাষে আরও সফলতা ধরা দেয়।

তিনি বলেন, বর্তমানে তার সাড়ে সাত বিঘা জমিতে এ এলাকার জন্য প্রথম বল সুন্দরী জাতের কুল, ১০ বিঘা থাই পেয়ারা, তিন বিঘা জমিতে ড্রাগন, তিন বিঘা জমিতে বারোমাসি জাতের আমের চাষ রয়েছে।

কৃষক কবিরুস সোবহানের ভাষ্য, এ পর্যন্ত জীবনে যত ফল ও ফসলের চাষ করেছেন, প্রায় সবই লাভবান হয়েছেন। কিন্তু বেশি সাড়া জাগিয়েছে বল সুন্দরী জাতের কুলে। ক্ষেতে যে পরিমাণে কুল ধরেছে, তা দেখতে মানুষ আসছে। অন্য কৃষকরাও উৎসাহিত হচ্ছেন।

তিনি আরও জানান, মাত্র ১৪ মাস আগে যশোরের ঝুমঝুমপুর থেকে বল সুন্দরী জাতের কুলের চারা প্রতি পিস ৫০ টাকা দরে ৬০০ চারা কিনে সাড়ে ৭ বিঘা জমিতে রোপণ করেন। এ বছরই সব কুলগাছে কুল ধরেছে।

কুলের শাখা-প্রশাখায় তারার মতো ধরে আছে। অবস্থাটা এমন পাতার চেয়ে কুল বেশি।

এ উপজেলায় অনেক জাতের কুল চাষ হয়েছে; কিন্তু বল সুন্দরী জাতের কুল চাষ এই প্রথম। এ জাতের কুলের আকার রঙ ও ধরার দৃশ্যটা বেশ ভিন্ন। বল সুন্দরী কুল দেখতে অস্ট্রেলিয়ান ছোট আপেলের চেয়ে একটু ছোট। কিন্তু স্বাদে কড়া মিষ্টি।

কুল বয়সে পরিপূর্ণ হয়নি। এখনও কমপক্ষে ২০ দিন পর ক্ষেতের কুল বিক্রি উপযোগী হবে। কয়েক দিন আগে সারাক্ষেত একটু আগে ধরা অল্প কিছু কুল স্থানীয় কালীগঞ্জ শহরে বিক্রি করতে এনেছিলেন।

অন্যান্য জাতের কুল বাজারে ২০-২৫ টাকা দরে বিক্রি হলেও তার বল সুন্দরী কুল স্বাদের জন্যই প্রতিকেজি ৮০ টাকা দরে বিক্রি করতে পেরেছেন। ফলে তিনি বুঝতে পারছেন এ কুল থেকে বেশ লাভ আসবে।
তার আশা, সাড়ে সাত বিঘা কুল থেকে কমপক্ষে ২০ লাখ টাকা আসবে। এ বাগান থেকে কমপক্ষে ৫-৬ বছর ভালোভাবে কুল পাবেন।

এ ছাড়া বারোমামি আম, ড্রাগন ও পেয়ারা মিলে এ বছর কমপক্ষে ৬০ লাখ টাকা আসবে বলে মনে করছেন তিনি।

তিনি আরও জানান, মাঠে নিজের ১২ বিঘা আর বাকি জমি প্রতিবিঘা বছরে ১২ হাজার টাকায় দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে নেয়া জমিতে এসব ফলের চাষ করেছেন। এর মধ্যে বল সুন্দরী কুল সবার দৃষ্টি কেড়েছে।

কৃষক কবিরুস সোবহান আরও জানান, তার ফল বাগানে মাসিক বেতন চুক্তিতে ১৪ জন লোক সারা বছর কাজ করে তারাই বাগান টিকিয়ে রাখে। কোনো কোনো সময় বাজারজাতও তারা করেন। তারা অনেক ভালো বলেই বিশ্বস্ত হয়ে উঠেছে। বিনিময়ে তাদের সুযোগ-সুবিধাগুলোও নিজের মতো করে দেখা লাগে।

তার ফল বাগান তদারকির দায়িত্ব পালনকারীদের একজন ওই গ্রামের পরিতোষ দাস জানান, দীর্ঘ ১৮ বছর তার সঙ্গে আছি। আমরা ১৪ জন শ্রমিক সারাবছরের জন্য তার ফল বাগানে কাজ করি।

উপজেলার ত্রিলোচনপুর ইউনিয়নের দায়িত্বপ্রাপ্ত কৃষি কর্মকর্তা মতিয়ার রহমান জানান, এ এলাকায় যেন ফলের বিপ্লব ঘটে গেছে। কবিরুস সোবহান অনেক পরিশ্রম করে বিভিন্ন ধরনের ফলের চাষ করেছেন। তার মধ্যে বল সুন্দরী কুল যেভাবে গাছে ধরে আছে দেখলে চোখ জুড়িয়ে যাচ্ছে।

কালীগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা জাহিদুল করিম জানান, কয়েক দিন আগে তিনি কবিরুস সোবহানের বল সুন্দরী কুলসহ তার সব ফলের বাগান ঘুরে এসেছেন। যেভাবে কুল ধরে আছে তা দাঁড়িয়ে দেখার মতো।

তিনি বলেন, ফলচাষি কবিরুস সোবহান নিজে একসময়ে কষ্ট করেছেন। আর এখন হয়েছেন এলাকার মধ্যে একজন আদর্শ কৃষক। কৃষিকাজ করে যে ভাগ্যের উন্নয়ন ঘটানো যায়, এ কৃষক তার উদাহরণ। কড়া মিষ্টির বল সুন্দরী কুল তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেবে বলে যোগ করেন এই কৃষিবিদ।

পরের ক্ষেতে কামলা দেয়া সোবহান কুল চাষে লাখপতি

 শাহরিয়ার আলম সোহাগ, কালীগঞ্জ (ঝিনাইদহ) প্রতিনিধি 
২৬ জানুয়ারি ২০২০, ০২:২৪ পিএম  |  অনলাইন সংস্করণ
ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলায় বল সুন্দরী জাতের কুল।
ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলায় বল সুন্দরী জাতের কুল। ছবি: যুগান্তর

লেখাপড়ার প্রতি আগ্রহ ছিল কবিরুস সোবহানের। কিন্তু সে সময়ে কৃষক বাবার পরিবারে বাধা ছিল অভাব। তাই ইচ্ছা থাকলেও ৮ম শ্রেণি পাসের পর আর এগোতে পারেননি তিনি। বাধ্য হয়ে অন্য ভাইদের সঙ্গে নামতে হয়েছে কৃষিকাজে।

বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পৃথক হয়ে সংসার পাততে হয়েছে তাকে। তখন তার সম্পদ বলতে পৈতৃক সূত্রে পাওয়া মাত্র দেড় বিঘা চাষের জমি।

সেই সময়ে অভাব তাকে জাপটে ধরার কারণে পরের ক্ষেতে কামলার কাজ করতে হয়েছে। কিন্তু কখনও হতাশ হননি কবিরুস সোবহান।

এখন পরিশ্রমের ফলে সেই দেড় বিঘা থেকে সাড়ে সাত বিঘা জমি করেছেন তিনি। বর্তমানে তিনি লাখপতি বনে গেছেন বলে জানা গেছে।

এমন সফল ফলচাষি ঝিনাইদহের কালীগঞ্জের ত্রিলোচনপুর গ্রামের কবিরুস সোবহান। তার বাবার নাম ওয়াহেদুস সোবহান।

জানা যায়, কবিরুস সংসারকে মনে করেছেন একটি যুদ্ধক্ষেত্র। তাই দৃঢ় মনোবলকে পুঁজি করে পরিশ্রমের মাধ্যমে আজ হয়েছেন উপজেলার মধ্যে সফল ফলচাষি।

মাত্র ২০ বছরের ব্যবধানে তিনি ১২ বিঘা জমি কিনেছেন। সুন্দর একটি বসতবাড়ি তৈরি করেছেন। ফল রাখার জন্য ১২ লাখ টাকা খরচ করে মাঠেই নির্মাণ করেছেন কোল্ডস্টোরেজ। বর্তমানে নিজের ও লিজ নেয়া মিলে ২৪ বিঘা জমিতে বিভিন্ন ফলের চাষ রয়েছে।

এর মধ্যে প্রায় সাড়ে ৭ বিঘা জমিতে বল সুন্দরী ফলের চাষ করে ক্ষেতের কুল সবার নজর কেড়েছে। অতীত ও বর্তমান জীবনের হিসাব-নিকাশ মিলিয়ে এলাকার মানুষের কাছে তিনি জীবনযুদ্ধে জয়ী একযোদ্ধা হিসেবে পরিচিত।

সরেজমিন কবিরুস সোবহানের ফল বাগানে গেলে দেখা যায়, মাটির সামান্য ওপর থেকেই সব কুলগাছের ডালপালা চারদিক ছড়িয়ে পড়েছে। প্রতিটি ডালে প্রচুর পরিমাণে কুল ধরে মাটিতে নুয়ে পড়ছে। অবস্থাটা এমন গাছের পাতার চেয়ে গাছে কুল বেশি দেখা যাচ্ছে।

কুলগুলো দেখতে ঠিক অস্ট্রেলিয়ান আপেলের মতো। কিন্তু আকারে একটু ছোট। ক্ষেতের পাখি ঠেকাতে সারা ক্ষেতের ওপর দিয়ে টানানো রশিতে বেঁধে দেয়া হয়েছে বিশেষ ধরনের বোতল।

ক্ষেতের পাহারাদার ক্ষেতের মাঝখানে কুড়ের মধ্য থেকে রশি ধরে খানিক পর পর টানছে আর ছাড়ছেন এতে এক ধরনের শব্দ তৈরি হচ্ছে। এতে কোনো পাখিই ক্ষেতের কুল নষ্ট করতে পারছে না।

ওই মাঠের একটু দূরে আরেকটি ক্ষেতে রয়েছে একই জাতের কুল। সে ক্ষেতটিতেও একইভাবে চাষ করা হয়েছে বল সুন্দরী জাতের কুল। এ ক্ষেতটিতে কুলের ধরটা আরও বেশি। রঙটাও বেশ আকর্ষণীয়।

এর পাশেই রয়েছে তার ড্রাগন ক্ষেত। এর অল্প দূরেই থাইল্যান্ডের-৫ ও ৭ জাতের পেয়ারা। পেয়ারা ক্ষেতের পাশেই রয়েছে থাইল্যান্ডের বারোমাসি জাতের আম। যেখানে ছোট ছোট আমগাছে মাটি থেকে একটু ওপরে ছোট-বড় আম ধরে আছে।

আবার কিছু কিছু আমগাছে সবেমাত্র মুকুল আসছে। সব ফলের ক্ষেতেই আগাছামুক্ত পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। ক্ষেতের ফলগুলো এবং ক্ষেত দেখলে প্রাণ জুড়িয়ে যাচ্ছে।

ক্ষেতেই দেখা হয় কৃষক কবিরুস সোবহানের সঙ্গে। তিনি বলেন, সাংসারিক জীবনে অভাবের তাণ্ডবে খুব কষ্ট করেছেন। কিন্তু তার বিশ্বাস ছিল পরিশ্রম করেই সফল হবেন। অর্থ না থাকলেও আত্মবিশ্বাসকে পুঁজি করে ২০০০ সালে প্রথমে কিছু ধারদেনার মাধ্যমে নিজের দেড় বিঘা জমিতে গাঁদা ফুলের চাষ শুরু করেন।

লাভ পেয়ে এ চাষেই জমি বর্গা নিয়ে ফুলচাষ বাড়াতে থাকেন। এভাবে ১২ বছর ফুলের চাষের মাধ্যমে বেশ সফল হন তিনি। এর পর ফল চাষে আরও সফলতা ধরা দেয়।

তিনি বলেন, বর্তমানে তার সাড়ে সাত বিঘা জমিতে এ এলাকার জন্য প্রথম বল সুন্দরী জাতের কুল, ১০ বিঘা থাই পেয়ারা, তিন বিঘা জমিতে ড্রাগন, তিন বিঘা জমিতে বারোমাসি জাতের আমের চাষ রয়েছে।

কৃষক কবিরুস সোবহানের ভাষ্য, এ পর্যন্ত জীবনে যত ফল ও ফসলের চাষ করেছেন, প্রায় সবই লাভবান হয়েছেন। কিন্তু বেশি সাড়া জাগিয়েছে বল সুন্দরী জাতের কুলে। ক্ষেতে যে পরিমাণে কুল ধরেছে, তা দেখতে মানুষ আসছে। অন্য কৃষকরাও উৎসাহিত হচ্ছেন।

তিনি আরও জানান, মাত্র ১৪ মাস আগে যশোরের ঝুমঝুমপুর থেকে বল সুন্দরী জাতের কুলের চারা প্রতি পিস ৫০ টাকা দরে ৬০০ চারা কিনে সাড়ে ৭ বিঘা জমিতে রোপণ করেন। এ বছরই সব কুলগাছে কুল ধরেছে।

কুলের শাখা-প্রশাখায় তারার মতো ধরে আছে। অবস্থাটা এমন পাতার চেয়ে কুল বেশি।

এ উপজেলায় অনেক জাতের কুল চাষ হয়েছে; কিন্তু বল সুন্দরী জাতের কুল চাষ এই প্রথম। এ জাতের কুলের আকার রঙ ও ধরার দৃশ্যটা বেশ ভিন্ন। বল সুন্দরী কুল দেখতে অস্ট্রেলিয়ান ছোট আপেলের চেয়ে একটু ছোট। কিন্তু স্বাদে কড়া মিষ্টি।

কুল বয়সে পরিপূর্ণ হয়নি। এখনও কমপক্ষে ২০ দিন পর ক্ষেতের কুল বিক্রি উপযোগী হবে। কয়েক দিন আগে সারাক্ষেত একটু আগে ধরা অল্প কিছু কুল স্থানীয় কালীগঞ্জ শহরে বিক্রি করতে এনেছিলেন।

অন্যান্য জাতের কুল বাজারে ২০-২৫ টাকা দরে বিক্রি হলেও তার বল সুন্দরী কুল স্বাদের জন্যই প্রতিকেজি ৮০ টাকা দরে বিক্রি করতে পেরেছেন। ফলে তিনি বুঝতে পারছেন এ কুল থেকে বেশ লাভ আসবে।
তার আশা, সাড়ে সাত বিঘা কুল থেকে কমপক্ষে ২০ লাখ টাকা আসবে। এ বাগান থেকে কমপক্ষে ৫-৬ বছর ভালোভাবে কুল পাবেন।

এ ছাড়া বারোমামি আম, ড্রাগন ও পেয়ারা মিলে এ বছর কমপক্ষে ৬০ লাখ টাকা আসবে বলে মনে করছেন তিনি।

তিনি আরও জানান, মাঠে নিজের ১২ বিঘা আর বাকি জমি প্রতিবিঘা বছরে ১২ হাজার টাকায় দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে নেয়া জমিতে এসব ফলের চাষ করেছেন। এর মধ্যে বল সুন্দরী কুল সবার দৃষ্টি কেড়েছে।

কৃষক কবিরুস সোবহান আরও জানান, তার ফল বাগানে মাসিক বেতন চুক্তিতে ১৪ জন লোক সারা বছর কাজ করে তারাই বাগান টিকিয়ে রাখে। কোনো কোনো সময় বাজারজাতও তারা করেন। তারা অনেক ভালো বলেই বিশ্বস্ত হয়ে উঠেছে। বিনিময়ে তাদের সুযোগ-সুবিধাগুলোও নিজের মতো করে দেখা লাগে।

তার ফল বাগান তদারকির দায়িত্ব পালনকারীদের একজন ওই গ্রামের পরিতোষ দাস জানান, দীর্ঘ ১৮ বছর তার সঙ্গে আছি। আমরা ১৪ জন শ্রমিক সারাবছরের জন্য তার ফল বাগানে কাজ করি।

উপজেলার ত্রিলোচনপুর ইউনিয়নের দায়িত্বপ্রাপ্ত কৃষি কর্মকর্তা মতিয়ার রহমান জানান, এ এলাকায় যেন ফলের বিপ্লব ঘটে গেছে। কবিরুস সোবহান অনেক পরিশ্রম করে বিভিন্ন ধরনের ফলের চাষ করেছেন। তার মধ্যে বল সুন্দরী কুল যেভাবে গাছে ধরে আছে দেখলে চোখ জুড়িয়ে যাচ্ছে।

কালীগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা জাহিদুল করিম জানান, কয়েক দিন আগে তিনি কবিরুস সোবহানের বল সুন্দরী কুলসহ তার সব ফলের বাগান ঘুরে এসেছেন। যেভাবে কুল ধরে আছে তা দাঁড়িয়ে দেখার মতো।

তিনি বলেন, ফলচাষি কবিরুস সোবহান নিজে একসময়ে কষ্ট করেছেন। আর এখন হয়েছেন এলাকার মধ্যে একজন আদর্শ কৃষক। কৃষিকাজ করে যে ভাগ্যের উন্নয়ন ঘটানো যায়, এ কৃষক তার উদাহরণ। কড়া মিষ্টির বল সুন্দরী কুল তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেবে বলে যোগ করেন এই কৃষিবিদ।