স্কুলে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পড়ছে মৌমাছিরাও!

  খোন্দকার রুহল আমিন, টেকেরহাট (মাদারীপুর) প্রতিনিধি ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ১৪:৪৪:২৯ | অনলাইন সংস্করণ

মাদারীপুর সদর উপজেলায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মৌমাছির চাক। ছবি: যুগান্তর

মাদারীপুর সদর উপজেলায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি মৌমাছির স্কুলে পরিণত হয়েছে। বিদ্যালয়ে প্রায় ৭০টি মৌমাছির চাক রয়েছে। কয়েক হাজার মৌমাছিতে সঙ্গে নিয়ে পড়াশোনা করছে শিক্ষার্থীরা।

দোতলা বিদ্যালয়টির চারদিক ঘিরে রয়েছে মৌমাছির বাসাগুলো। ছাত্রছাত্রীরা যখন ক্লাসে বসে পড়াশোনা করে, তখন মৌমাছিও তাদের সঙ্গে কক্ষে প্রবেশ করছে এবং ঘোরাঘুরি করছে।

শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা ও খেলাধুলায় কোনো বাধা বা ক্ষতি করছে না মৌমাছিগুলো। এ যেন এক বিচিত্র দৃশ্য।

সদর উপজেলার পাঁচখোলা ইউনিয়নের চরকালিকাপুর তালুক গ্রামের ১৬নং চরকালিকাপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এ দৃশ্য দেখা যায়।

জানা যায়, ছাত্রছাত্রীরা যখন মাঠে খেলা করে, তখন মৌমাছিকেও দেখা যায় মাঠের ভেতর দিয়ে ছোটাছুটি করতে। শিক্ষক, ছাত্রছাত্রী এবং মৌমাছি যেন একই পরিবারের সদস্যদের মতো অবস্থান করছে সেখানে। বিদ্যালয়ের পুরো ভবনটির চারদিকে বিপুল পরিমাণ মৌমাছির বাসার এ দৃশ্য দেখার জন্য প্রতিদিন দূর-দূরান্ত থেকে আসছেন মানুষ।

আরও জানা গেছে, ১৯৪৫ সালে ১৬নং চরকালিকাপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হয়। বিদ্যালয়ের বর্তমান ভবনটি নির্মিত হয় ২০০২ সালে।

নতুন এ ভবন নির্মিত হওয়ার ৭-৮ বছর পর থেকে শীতের শুরুতে মাঝেমধ্যে কিছু মৌচাক বাসা তৈরি করত এবং ৫-৬ মাস থাকার পর অন্যত্র চলে যেত।

বিগত ৫ বছর ধরে বিদ্যালয়টিতে মৌচাকের বাসা তৈরি বৃদ্ধি পায়। বর্তমানে বিদ্যালয়টির চারদিকে প্রায় সত্তরটি মৌচাকের বাসা রয়েছে। কিছু দুষ্টু প্রকৃতির লোকজন রাতের আঁধারে এসব মৌচাক থেকে মধু সংগ্রহ করায় কিছু মৌচাক অন্যত্র চলে গেছে।

বিদ্যালয়ের সামনে দিয়ে চলাচলকারী পথচারীরা কিছু সময়ের জন্য হলেও বিদ্যালয়ের দিকে তাকিয়ে থেকে মৌচাকের বাসাগুলো দেখেন। মৌচাকগুলো বিদ্যালয়টির সৌন্দর্য অনেকটা বাড়িয়ে দিয়েছে।

জেলার বিভিন্ন স্থান থেকে দর্শনার্থীরা এসে মৌচাকগুলো দেখে যায়। যদি কোনো মানুষ মৌচাকগুলোকে আঘাত করে তা হলে মানুষকে কামড় দেয়। মৌচাকে আঘাত না করলে কাউকে কোনো কামড় দেয় না।

বিদ্যালয়ের ছোট-বড় শিক্ষার্থীরাও আনন্দের সঙ্গে মৌচাকের সামনে দিয়ে যাওয়া-আসার মাধ্যমে ক্লাস করে। নির্ভয়ে শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা করছে।

নয়ন নামের তৃতীয় শ্রেণির এক শিক্ষার্থী জানায়, আমাদের বিদ্যালয়ের চারদিকের দেয়ালে প্রচুর মৌমাছি বাসা বেঁধেছে। মৌমাছির কারণে আমাদের লেখাপড়ায় কোনো ক্ষতি হয় না।

মৌমাছিগুলো খুব ভালো। আমাদের কোনো ছাত্রছাত্রীদের কামড়ও দেয় না। কেউ যদি মৌমাছিদের আঘাত করে তা হলে কামড় দেয়ার চেষ্টা করে।

সাঈম ইসলাম নামের পঞ্চম শ্রেণির আরেক ছাত্র বলেছে, বিদ্যালয়ের চারদিকে যেভাবে মৌচাক বাসা বেঁধেছে, তা দূর থেকে দেখলে ভয় লাগে। অথচ একটা মৌমাছিও আমাদের কাউকে কোনো দিন কামড় দেয়নি। মৌমাছিগুলো আমাদের বন্ধু হয়ে গেছে।

আমরা যখন ক্লাসে বসে লেখাপড়া করি, কিছু মৌমাছি ক্লাসের ভেতর দিয়ে ঘোরাঘুরি করে। দেখলে মনে হবে মৌমাছিগুলো আমাদের সঙ্গে পড়াশোনা করছে।

পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রী মিম জানায়, আমাদের বিদ্যালয়ের মৌমাছিগুলো খুব ভালো। অনেক মৌমাছি বাসার মধ্য দিয়ে আমরা প্রতিদিন বিদ্যালয়ে আসা-যাওয়া করি।

বিদ্যালয়ের বারান্দা দিয়ে ও মাঠ দিয়ে আমরা যখন খেলাধুলা করি, তখন আমাদের শরীরের সঙ্গে মৌমাছির ধাক্কা লাগে; তার পরও কামড় দেয় না। অথচ গ্রামের অন্য কোনো জায়গার মৌমাছি সামান্য আঘাত পেলেই মানুষকে কামড় দেয়।

বিদ্যালয়ের এ মৌমাছিগুলো আমাদের কোনো ক্ষতি করে না। এত মৌমাছি থাকায় আমরা আনন্দে পড়ালেখা করছি। মৌচাক থেকে মধু সংগ্রহ করা হলে মাঝেমধ্যে আমরা মধু খেয়ে থাকি।

মৌচাক দেখতে আসা দর্শনার্থী মাসুদ বলেন, সত্যিই আমি এত মৌচাক দেখে আনন্দিত হয়েছি। দোতলা বিদ্যালয়টির চারদিকে মৌচাকের বাসায় ঘেরা। বিদ্যালয়ের চারপাশ দিয়ে মৌচাক ঘোরাঘুরি করছে।

এর সঙ্গে ছাত্রছাত্রীরাও ক্লাসে বসে পড়ালেখা করছে। অথচ মৌমাছিগুলো কোনো শিক্ষার্থীকে কামড় দিচ্ছে না। আমি বিদ্যালয়ে এত মৌমাছির কথা শুনে দূর থেকে দেখতে এসেছি। শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও মৌমাছির বন্ধন দেখে আমি আনন্দিত।

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা চায়না আক্তার বলেন, দুই বছর হলো আমি এ বিদ্যালয়ে যোগদান করেছি। আমি আশার পর থেকেই দেখি বিদ্যালয়ের চারপাশের দেয়ালে প্রচুর মৌচাক। প্রথমে ভয় লাগত এত মৌমাছির মধ্যে কীভাবে শিক্ষার্থীদের পড়ালেখা করাব। এখন দেখি ভিন্নচিত্র।

মৌমাছিগুলো কোনো শিক্ষক বা ছাত্রছাত্রীদের কামড় দেয় না। যদি কেউ মৌচাকে আঘাত করে তা হলে কামড় দেয়ার চেষ্টা করে।

বিদ্যালয় চলাকালীন কেউ মৌমাছিকে আঘাত করে না, যার ফলে আমাদের কারও কোনো ক্ষতি করে না। মৌমাছি ওদের মতো থাকে, আর আমরা আমাদের মতো করে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা করাই।

চরকালিকাপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি মোত্তাকিন আহমেদ সোহেল বলেন, বিগত প্রায় পাঁচ বছর ধরে আমাদের বিদ্যালয়ের দোতলা ভবনটির চারপাশে প্রচুর মৌমাছি চাক তৈরি করেছে। এলাকায় অনেক কাঁচা-পাকা বাড়ি, গাছপালা রয়েছে, যেখানে তেমন কোনো মৌচাক নেই। অথচ আমাদের বিদ্যালয়ের চারদিকে প্রচুর মৌচাক।

বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ মৌচাকের বাসা দেখতে আসে। মাঝেমধ্যে মৌচাকের বাসা থেকে মধু সংগ্রহ করে শিক্ষার্থীদের খেতে দেয়া হয়। আশপাশের এলাকার লোকজনও মধু খেয়ে থাকে। তবে কিছু দুষ্ট মানুষ আছে যারা রাতের আঁধারে মধু কেটে নিয়ে যায়।

মৌচাকগুলো কোনো শিক্ষক বা ছাত্রছাত্রীদের ক্ষতি করে না। বিদ্যালয়ে এত মৌচাক থাকায় আমরা খুবই আনন্দিত।

 
জেলার খবর
অনুসন্ধান করুন

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত