‘তোরে ছাড়া আমি কেমনে বাঁচব-রে বাজান’

  নগরকান্দা (ফরিদপুর) প্রতিনিধি ২০ মার্চ ২০১৮, ১৯:৩৩ | অনলাইন সংস্করণ

রিমনের মায়ের আহাজারিতে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের সৃষ্টি হয়

নেপালের কাঠমান্ডুতে বাংলাদেশের ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের একটি বিমান বিধ্বস্তের ঘটনায় নিহত এসএম মাহমুদুর রহমান রিমনের (৩২) লাশবাহী ফ্রিজিং গাড়িটি মঙ্গলবার সকাল ৮টায় ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলার লস্করদিয়ায় রিমনের বাড়িতে এসে পৌঁছায়।

রিমনের মা লিলি বেগম একনজর সন্তানকে দেখার জন্য ছুটে যান গাড়ির কাছে। কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি, বারবার মূর্ছা যাচ্ছিলেন, আছড়ে পড়ছিলেন বুকফাটা কান্নায়। বারবার জ্ঞান হারিয়ে ফেলছিলেন। জ্ঞান ফিরতেই স্বজনদের বুকে মাথা রেখে শুধু বিলাপ করছিলেন।

মায়ের আশা ছিল, আদরের রিমন বাড়ির উঠনে এসে হয়তো বলবে ‘মা, মাগো তুমি কোথায়, আমি তোমার রিমন এসেছি, খেতে দাও।’ কিন্তু রিমন আজ আর মাকে ‘মা’ বলে ডাকল না। বাড়ির উঠানে কফিনে লাশ হয়ে ফিরে এল রিমন।

রিমন ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলার লস্করদিয়া ইউনিয়নের লস্করদিয়া গ্রামের শাহ মো. মশিউর রহমান নিরু মিয়া ও লিলি বেগমের বড় ছেলে। রিমনের অকালমৃত্যুতে শোকে পাগল হয়ে শুধুই বিলাপ করছিলেন বাবা নিরু মিয়া ও মা লিলি বিগম।

মা লিলি বেগম শুধু কেঁদে কেঁদে বলছিলেন, ‘তোরে ছাড়া আমি কেমনে বাঁচব-রে বাজান। আল্লাহ আমাগো আগে কেন তোরে নিয়া গেল। কি পাপ করছিলান আমরা। তোর আগে কেন আমাগো নিয়া গেল না। তুই এইভাবে আমাগো ফেলাইয়া থুইয়া চইলা যাইস না। একবার আমারে মা কইয়া ডাক দেরে বাজান, আমার বুকে আয়। আমার বুকের জ্বালা ঠাণ্ডা কইরা দে।’

রিমনের মায়ের আহাজারিতে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের সৃষ্টি হয়। রিমনের লাশ একনজর দেখার জন্য বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা মানুষগুলোও যেন শোকে পাথর হয়ে গেছে। রিমনের বাবা নিরু মিয়া ভালোভাবে হাঁটতে পারেন না। অসুস্থ শরীর নিয়ে তেমন চলতেও পারেন না। তিনি সন্তানের কফিনের চারপাশে ঘুরছেন আর শুধু পাগলের মতো বিলাপ করছেন।

রিমনের একমাত্র ছোট ভাই রূপম হোসেন প্রিয় বড় ভাইকে হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। তার মুখে নেই কোনো ভাষা। শুধু তার দুই চোখ বেয়ে ঝরছে কান্নার নোনাজল। রিমনের স্ত্রী ঝর্ণা বেগম অল্প বয়সে স্বামীকে হারিয়ে শোকে পাথর হয়ে গেছে।

মঙ্গলবার সকাল ৯টায় ফরিদপুরের জেলা প্রশাসক বেগম উম্মে সালমা তানজিয়া, নগরকান্দা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. বদরুদ্দোজা শুভ, উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান সৈয়দ শাহিনুজ্জামান শাহিন যান নিহত রিমনের বাড়িতে। রিমনের বাবা, মা, স্ত্রীকে সমবেদনা জানান। জেলা প্রশাসক আর্থিক সহায়তা হিসেবে তাদের হাতে তুলে দেন নগদ এক লাখ টাকা।

সকাল ১০টায় লস্করদিয়া স্কুল মাঠে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজার ইমাম ছিলেন লস্করদিয়া মিয়াবাড়ি জামে মসজিদের ইমাম মাওলানা মো. কামরুজ্জামান। পরে তাদের পারিবারিক কবরস্থানে রিমনের লাশ দাফন করা হয়।

রিমন লেখাপড়া শেষ করে প্রায় সাত বছর আগে ঢাকায় রানার অটোমোবাইলস লিমিটেড কোম্পানিতে চাকরি নেয়। সে রানারের প্রধান কার্যালয়ে সিনিয়র ম্যানেজার পদে কর্মরত ছিলেন। সেদিন প্রতিষ্ঠানের কাজে রিমন নেপাল যাচ্ছিলেন। সঙ্গে ছিল দুই সহকর্মী। তারাও বেঁচে নেই।

দুই ভাইয়ের মধ্যে রিমন পিতা মাতার বড় ছেলে। ছয় বছর আগে রিমন বিবাহ করে। রিমনের ছোট ভাই রূপম বেকার, অসুস্থ বাবা নিরু মিয়ার তেমন জমিজমা নেই। রিমনের ভালো চাকরি, ভালো বেতনে তাদের সংসারে যখন সুখের আলো আসতে শুরু করেছে, ঠিক তখনই রিমন চলে গেলেন না ফেরার দেশে। সংসারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি রিমনের অকালমৃত্যুতে পরিবারের সদস্যরা ভেঙে পড়েছেন।

ঘটনাপ্রবাহ : নেপালে ইউএস বাংলা বিধ্বস্ত

জেলার খবর
অনুসন্ধান করুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter
×