নিলাম ভণ্ডুলের পর গোপন সমঝোতায় কয়েক কোটি টাকার বালু বিক্রির আয়োজন

  যুগান্তর রিপোর্ট, তাহিরপুর ০৫ আগস্ট ২০২০, ২০:৩৭:১০ | অনলাইন সংস্করণ

সুনামগঞ্জের তাহিরপুরে বিভিন্ন ডাম্পিংয়ে স্তূপ রাখা অবৈধভাবে উত্তোলনকৃত কয়েক কোটি টাকা মূল্যের বালু ইউএনওর সঙ্গে গোপন সমঝোতা করে বিক্রির আয়োজন প্রায় সম্পন্ন করেছে প্রভাবশালী সিন্ডিকেট।

অথচ খনিজসম্পদ উন্নয়ন ব্যুরো সম্প্রতি এসব বালু, পাথর, চুনাপাথর সরকারিভাবে নিলামে বিক্রির জন্য নিলাম আহ্বান করার পর ওই সিন্ডিকেট তা ভণ্ডুল করে দেয়। সরকারিভাবে নিলামে বালু বিক্রিতে ব্যর্থ হলেও এবার সেই সিন্ডিকেটকে অবৈধভাবে বালু বিক্রিতে সায় দিলেন খোদ তাহিরপুরের উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) পদ্মাসন সিংহ।

বুধবার দুপুরে সিন্ডিকেট প্রধান উপজেলা প্রশাসন, থানা পুলিশ, স্থানীয় কয়েকজন সাংবাদিকের কাছ থেকে অবৈধভাবে উক্তোলনকৃত বালু বিক্রির সবুজ সংকেত পেয়েছে বলেও যুগান্তরকে জানান। এ ধরনের কথোপকথনের একটি অডিও রেকর্ড যুগান্তরের কাছে সংরক্ষিত রয়েছে।

বুধবার জেলা-উপজেলা প্রশাসন, থানা পুলিশ ও সরেজমিন যুগান্তরের অনুসন্ধানে জানা গেছে, সম্প্রতি পাহাড়ি ঢল ও ঢলের পূর্বে তাহিরপুরের শান্তিপুরের পছাশইল হাওর, আমতৈল, মাহারাম নদীর শাখা শান্তিপুর, চাঁনপুর, বড়ছড়া, টেকেরঘাট, বুরুঙ্গাছড়া রজনী লাইন, কলাগাঁও, চারাগাঁওসহ বিভিন্ন সীমান্ত ছড়া দিয়ে ভারতের মেঘালয় হতে রাশি রাশি বালু, পাথর ও চুনাপাথর ভেসে আসে। এসব খনিজ বালু, পাথর, চুনাপাথর বিভিন্ন স্থানে ডাম্পিং বা স্তূপ করে রাখে।

কিন্তু তাতে বাদসাধেন জেলা-উপজেলা প্রশাসন ও সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবি। এরপর ক্ষমতাসীন দল ঘেঁষা সিন্ডিকেটের স্বার্থে এসব খনিজসম্পদ বিনা রাজস্বে ছাড়িয়ে নিতে সুনামগঞ্জ-১ আসনের এমপি মোয়াজ্জেম হোসেন রতন ডিও লেটার প্রদান করেন সরকারের খনিজসম্পদ উন্নয়ন ব্যুরোসহ বিভিন্ন দফতরে।

প্রথমে গোপনে এরপর ২৭ জুলাই গভীর রাতে তাহিরপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) ২৮ জুলাই নিলাম আহ্বান করেন।

নিলামে শত শত লোকজন উপস্থিত হলেও কৌশলে ওই সিন্ডিকেট ভুল তথ্য উপস্থাপন ও নানা রকম উস্কানি দিয়ে নিজেরা এমনকি অন্যদেরও নিলামে অংশগ্রহণ করতে দেয়নি।

এদিকে বুধবার সকাল হতেই চাওর হতে থাকে উপজেলা নির্বাহী অফিসার, থানা পুলিশ ও কয়েকজন স্থানীয় সাংবাদিককে ম্যানেজ করে উপজেলার উত্তর বড়দল ইউনিয়নের সাবেক ইউপি সদস্য ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগসহ সভাপতি গোলাম কিবরিয়া ওরফে কিবরিয়া মেম্বার একজন বালু পরিবাহী নৌকার সর্দারের মাধ্যমে মাহারাম নদীর শাখা শান্তিপুর, শান্তিপুর বাজারের পশ্চিমে, আমতৈল এলাকায়, শ্রীপুরের বালিয়াঘাট ডাম্পের বাজার, দুধের আউটায় কবরস্থান এলাকায়, নবাবপুরে নদী তীরে রাখা প্রতি ঘনফুট বালু ২০ টাকা দরে বিক্রির জন্য প্রচারণা করছেন।

এরই প্রেক্ষিতে বিষয়টি জানতে সিন্ডিকেট প্রধান গোলাম কিবরিয়া ওরফে কিবরিয়া মেম্বারের ব্যক্তিগত মোবাইলে বুধবার দুপুরে ফোন করা হলে তিনি বালু বিক্রির আয়োজন সম্পন্নের বিষয়টি যুগান্তরের কাছে স্বীকার করেন। তিনি বলেন, শান্তিপুরের বালু ডাম্পের বাজারের পাটলাই নদী দিয়ে পরিবহন হবে বড় (বলগেট, ট্রলার) নৌকায়। বড় নৌকায় বালু পৌঁছানো হবে প্রতি ঘনফুট ২০ টাকা দরে। সার্ভেয়ার স্টেক মেজারম্যান্ট করে গেছেন ৬৯ হাজার ঘনফুট বালু আছে শান্তিপুরে।

তিনি কথোপকথনের এক পর্যায়ে বলেন, এমপি মহোদয় বলে দিছেন (সুনামগঞ্জ-১ আসনের এমপি মোয়াজ্জেম হোসেন রতন)। এরপর তাহিরপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার, থানা পুলিশ, দুজন স্থানীয় সাংবাদিকের সঙ্গে এ ব্যাপারে সরাসরি আলাপ করে বালু বিক্রির সম্মতি নিয়েছেন বলে দাবি করেন তিনি।

বুধবার এ বিষয়ে জানতে তাহিরপুর থানার ওসি আতিকুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, এসব বিষয়ে আমার সঙ্গে কেউ কোনো ধরনের আলাপ করেননি।

বুধবার দুপুরে তাহিরপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার পদ্মাসন সিংহের সঙ্গে যোগোযোগ করা হলে তিনি মোবাইল ফোনে যুগান্তরকে বলেন, নতুন করে কেউ বালু উত্তোলন করবে না। নতুনভাবে তুললে আমি ধরবই। স্তূপ করা বালু আছে, আমি নীরব ছিলাম। স্তূপ করা বালুগুলো তো আজ হোক কাল হোক চুরি করে নেবেই।

এক পর্যায়ে তিনি কিছুটা অস্পষ্টভাবে তার সঙ্গে কিবরিয়া মেম্বারের বালু বিক্রির আলাপের বিষয়টিও স্বীকার করে বলেন, এমপিও বলছিলেন স্টককৃত বালুগুলো নেয়ার সুযোগ দিতে।

ইউএনও আরও বলেন, এভাবে বালু উত্তোলন করে স্তূপ করাটা অবৈধ। কিন্তু নিয়ম হল নিলামে বালু সরকারিভাবে বিক্রি করা, আসলে আমি নীরব ছিলাম। বলেছি যেভাবে পারেন নিয়ে যেতে কিন্তু আমি তাদের কোনো ধরনের লিখিত অনুমতি দেইনি।

একই বিষয়ে জানতে চাইলে সুনামগঞ্জ-১ আসনের এমপি মোয়াজ্জেম হোসেন রতন বলেন, কিবরিয়া মেম্বার কে? আমি তাকে চিনি-ই না, আমি কোনো ধরনের বালু অবৈধভাবে নেয়ার জন্য কাউকে বলিনি।

প্রসঙ্গত, নবাগত ইউএনও হিসেবে তাহিরপুরে যোগদান করার পর পদ্মাসন সিংহ শান্তিপুরে অবৈধভাবে বালু লুটের সময় হাতেনাতে কিবরিয়া মেম্বার ও হাজি কুদ্দুছ মিয়ার চারটি নৌকা আটক করে ভ্রাম্যমাণ আদালত বসিয়ে অর্ধলাখ টাকা জরিমানা আদায় করেছিলেন।

জেলার খবর
অনুসন্ধান করুন

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত