‘জুমচাষেই’ জীবন কাটে পাহাড়ের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর
jugantor
‘জুমচাষেই’ জীবন কাটে পাহাড়ের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর

  সমির মল্লিক, খাগড়াছড়ি প্রতিনিধি  

০৯ আগস্ট ২০২০, ১৩:৩৩:০৪  |  অনলাইন সংস্করণ

‘জুমচাষেই’ জীবন কাটে পাহাড়ের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর
ছবি: যুগান্তর

বিশ্ব আদিবাসী দিবস আজ। আদিবাসী হিসেবে স্বীকৃতি না মিললেও পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাস করে প্রায় ১৩টি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী।

জুমচাষের ওপর নির্ভরশীল বেশিরভাগ মানুষ চরম দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করে জীবন অতিবাহিত করছেন। বছরের পর বছর জুমচাষই সিংহভাগ পাহাড়ির একমাত্র সম্বল। খাগড়াছড়িতে চাকমা, মারমা ও ত্রিপুরাসহ প্রায় তিন লাখ ২০ হাজার পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর বসবাস।

শিক্ষা, সুপেয় পানি, চিকিৎসা, যোগাযোগ, বিদ্যুৎসহ আধুনিক বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীরা।

জানা যায়, প্রায় ২০০ বছরের বেশি সময় ধরে এরা বংশ পরম্পরায় জুমচাষে জড়িত। জুমের উৎপাদিত ফসল দিয়ে সারা বছরে খাদ্য জোগান দিতে পারেন না পাহাড়িরা। পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিম চাষ পদ্ধতি ‘জুম’। ভৌগোলিক গঠন অনুসারে দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূমিরুফ পাহাড় ও উপত্যকাবেষ্টিত।
 
এখানকার জনগোষ্ঠীর মূল জীবিকা কৃষি। তিন পার্বত্য জেলার আয়তন ১৩ হাজার ১৮৪ বর্গকিলোমিটার। তিন পার্বত্য জেলায় প্রতি বছর ১২ হাজার হেক্টর জমি জুমচাষ করা হয়।

পার্বত্য চট্টগ্রামের বেশিরভাগ ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষই জুমের ওপর নির্ভরশীল। তবে উপর্যুপরি ও বিরতিহীনভাবে জুমে চাষাবাদ হওয়ায় কমছে জুম ভূমির উর্বরতা। ফলে উর্বরতা কমছে। জুমের ফসল না আসা পর্যন্ত অনেক সময় খাদ্য সংকটও দেখা যায়।

জুমিয়ারা জানান, অতীতে এক পাহাড়ে জুমচাষ করার পর ১০-১৫ বছর পর সেই পাহাড় জুমের আবাদ করা হতো। তবে বর্তমানে জনসংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় মাত্র ২ থেকে ৩ বছর পর একই পাহাড়ে জুমের আবাদ করা হচ্ছে। ‘জুমভিত্তিক’ পাহাড়িদের জীবন মানের উন্নয়ন ঘটছে শ্লথগতিতে। জুমের যা উৎপাদিত হয় তা দিয়ে সারা বছরের খাদ্য উৎপাদন সম্ভব হয় না।

এ ছাড়া পার্বত্য চট্টগ্রামের অনেক গ্রাম ও পাড়ায় এখানে পৌঁছেনি নাগরিক সুবিধা। দুর্গম যোগাযোগব্যবস্থার কারণে বঞ্চিত হচ্ছে শিক্ষা, চিকিৎসাসহ বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা থেকে। যোগাযোগব্যবস্থা ভালো না হওয়ায় অনেকে চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত।

স্থানীয় পাড়ার বাসিন্দা নবীন বিকাশ ত্রিপুরা বলেন, আমাদের এখানে বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা নেই। শীতকালে ঝিরি ঝরনা শুকিয়ে যায়। বর্ষাকালে ঝরনার পানি দূষিত হয়ে যায়। অনেকে পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হয়। জুমচাষ করেও আমরা সারা বছর চলতে পারি না। অনেকে দিন আনে দিন খায়। যোগাযোগব্যবস্থা ভালো না হাওয়ায় আমরা চিকিৎসাসেবা পাই না।

পাড়ার বেশ কয়েকজন নারী সদস্য বলেন, পানির জন্য নির্ভর করতে হয় ঝিরি বা কুয়োর ওপর। পানির জন্য সকালে গেলে বিকালে আসতে হয়। সারা বছরই পানি সংকট।

সীমানা পাড়ার কার্বারি চয়ন ত্রিপুরা বলেন, বিকল্প পেশা না থাকায় বংশ পরম্পরায় জুমচাষ করে টিকে আছে পাহাড়ি জনগোষ্ঠী। তবে তা দিয়েও সারা বছর সংসার চলে না।

এখানে ১১০ পরিবারের বসবাস। সবাই জুমের ওপর নির্ভরশীল। জুমচাষ ছাড়া এখানে বেঁচে থাকার কোনো অবলম্বন নেই।

তিনি আরও বলেন, পাড়ার কেউ কেউ নিজেদের উদ্যোগে সৌরবিদ্যুতের ব্যবস্থা করেছে, আবার অনেকের সেই সার্মথ্য নেই। ‘যুগের পর যুগ’ যায় অথচ আমাদের এখানে কোনো পরিবর্তন নেই।

যে পাড়া যত দুর্গম এলাকায়, সেখানকার মানুষ ততবেশি নাগরিক সুবিধা বঞ্চিত।

মৌলিক চাহিদা বঞ্চিত এসব পিছিয়ে থাকা পাহাড়ি এলাকার উন্নয়নে সরকারের সুদৃষ্টি চান স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা।

মেরুং ইউনিয়নের ইউপি সদস্য ঘনশ্যাম ত্রিপুরা জানান, মেরুং ইউনিয়নের প্রায় শতাধিক পাড়া রয়েছে। অধিকাংশ পাহাড়ি এখনও মৌলিক চাহিদা থেকে বঞ্চিত। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিদ্যুৎ বিভিন্ন সুযোগ থেকে বঞ্চিত। তারা জুমের ওপর নির্ভরশীল। সরকার যাতে এসব এলাকার উন্নয়নে বিশেষ দৃষ্টি দেয়।

প্রতি বছর জ্যেষ্ঠ থেকে ভাদ্র পর্যন্ত জুমচাষিদের খাদ্য স্বল্পতা দেখা যায়। এ সময় অনেকে দিন-মজুর বা বনজসম্পদ বিক্রি করে সংসার চালান।

বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা জাবারাংয়ের নির্বাহী পরিচালক মথুরা বিকাশ ত্রিপুরা জানান, পার্বত্য চট্টগ্রামে জীবিকার প্রধান অবলম্বন জুমচাষ। জুমের ফসল ঘরে না তোলা পর্যন্ত অনেক জুমিয়া খাদ্য সংকটে থাকেন।

জুমচাষকে আধুনিকায়ন করাও সময়ের দাবি। জুমচাষকে সাধারণ কৃষি হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে সরকারি ঋণ সহায়তা প্রদান করা উচিত। এ ছাড়া পাহাড়ে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ, বিদ্যুৎসহ নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করার জন্য সরকারি-বেসরকারি সংস্থাগুলোকে এগিয়ে আসতে হবে।

‘জুমচাষেই’ জীবন কাটে পাহাড়ের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর

 সমির মল্লিক, খাগড়াছড়ি প্রতিনিধি 
০৯ আগস্ট ২০২০, ০১:৩৩ পিএম  |  অনলাইন সংস্করণ
‘জুমচাষেই’ জীবন কাটে পাহাড়ের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর
ছবি: যুগান্তর

বিশ্ব আদিবাসী দিবস আজ। আদিবাসী হিসেবে স্বীকৃতি না মিললেও পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাস করে প্রায় ১৩টি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী।

জুমচাষের ওপর নির্ভরশীল বেশিরভাগ মানুষ চরম দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করে জীবন অতিবাহিত করছেন। বছরের পর বছর জুমচাষই সিংহভাগ পাহাড়ির একমাত্র সম্বল। খাগড়াছড়িতে চাকমা, মারমা ও ত্রিপুরাসহ প্রায় তিন লাখ ২০ হাজার পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর বসবাস।

শিক্ষা, সুপেয় পানি, চিকিৎসা, যোগাযোগ, বিদ্যুৎসহ আধুনিক বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীরা।

জানা যায়, প্রায় ২০০ বছরের বেশি সময় ধরে এরা বংশ পরম্পরায় জুমচাষে জড়িত। জুমের উৎপাদিত ফসল দিয়ে সারা বছরে খাদ্য জোগান দিতে পারেন না পাহাড়িরা। পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিম চাষ পদ্ধতি ‘জুম’। ভৌগোলিক গঠন অনুসারে দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূমিরুফ পাহাড় ও উপত্যকাবেষ্টিত।

এখানকার জনগোষ্ঠীর মূল জীবিকা কৃষি। তিন পার্বত্য জেলার আয়তন ১৩ হাজার ১৮৪ বর্গকিলোমিটার। তিন পার্বত্য জেলায় প্রতি বছর ১২ হাজার হেক্টর জমি জুমচাষ করা হয়।

পার্বত্য চট্টগ্রামের বেশিরভাগ ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষই জুমের ওপর নির্ভরশীল। তবে উপর্যুপরি ও বিরতিহীনভাবে জুমে চাষাবাদ হওয়ায় কমছে জুম ভূমির উর্বরতা। ফলে উর্বরতা কমছে। জুমের ফসল না আসা পর্যন্ত অনেক সময় খাদ্য সংকটও দেখা যায়।

জুমিয়ারা জানান, অতীতে এক পাহাড়ে জুমচাষ করার পর ১০-১৫ বছর পর সেই পাহাড় জুমের আবাদ করা হতো। তবে বর্তমানে জনসংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় মাত্র ২ থেকে ৩ বছর পর একই পাহাড়ে জুমের আবাদ করা হচ্ছে। ‘জুমভিত্তিক’ পাহাড়িদের জীবন মানের উন্নয়ন ঘটছে শ্লথগতিতে। জুমের যা উৎপাদিত হয় তা দিয়ে সারা বছরের খাদ্য উৎপাদন সম্ভব হয় না।

এ ছাড়া পার্বত্য চট্টগ্রামের অনেক গ্রাম ও পাড়ায় এখানে পৌঁছেনি নাগরিক সুবিধা। দুর্গম যোগাযোগব্যবস্থার কারণে বঞ্চিত হচ্ছে শিক্ষা, চিকিৎসাসহ বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা থেকে। যোগাযোগব্যবস্থা ভালো না হওয়ায় অনেকে চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত।

স্থানীয় পাড়ার বাসিন্দা নবীন বিকাশ ত্রিপুরা বলেন, আমাদের এখানে বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা নেই। শীতকালে ঝিরি ঝরনা শুকিয়ে যায়। বর্ষাকালে ঝরনার পানি দূষিত হয়ে যায়। অনেকে পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হয়। জুমচাষ করেও আমরা সারা বছর চলতে পারি না। অনেকে দিন আনে দিন খায়। যোগাযোগব্যবস্থা ভালো না হাওয়ায় আমরা চিকিৎসাসেবা পাই না।

পাড়ার বেশ কয়েকজন নারী সদস্য বলেন, পানির জন্য নির্ভর করতে হয় ঝিরি বা কুয়োর ওপর। পানির জন্য সকালে গেলে বিকালে আসতে হয়। সারা বছরই পানি সংকট।

সীমানা পাড়ার কার্বারি চয়ন ত্রিপুরা বলেন, বিকল্প পেশা না থাকায় বংশ পরম্পরায় জুমচাষ করে টিকে আছে পাহাড়ি জনগোষ্ঠী। তবে তা দিয়েও সারা বছর সংসার চলে না।

এখানে ১১০ পরিবারের বসবাস। সবাই জুমের ওপর নির্ভরশীল। জুমচাষ ছাড়া এখানে বেঁচে থাকার কোনো অবলম্বন নেই।

তিনি আরও বলেন, পাড়ার কেউ কেউ নিজেদের উদ্যোগে সৌরবিদ্যুতের ব্যবস্থা করেছে, আবার অনেকের সেই সার্মথ্য নেই। ‘যুগের পর যুগ’ যায় অথচ আমাদের এখানে কোনো পরিবর্তন নেই।

যে পাড়া যত দুর্গম এলাকায়, সেখানকার মানুষ ততবেশি নাগরিক সুবিধা বঞ্চিত।

মৌলিক চাহিদা বঞ্চিত এসব পিছিয়ে থাকা পাহাড়ি এলাকার উন্নয়নে সরকারের সুদৃষ্টি চান স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা।

মেরুং ইউনিয়নের ইউপি সদস্য ঘনশ্যাম ত্রিপুরা জানান, মেরুং ইউনিয়নের প্রায় শতাধিক পাড়া রয়েছে। অধিকাংশ পাহাড়ি এখনও মৌলিক চাহিদা থেকে বঞ্চিত। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিদ্যুৎ বিভিন্ন সুযোগ থেকে বঞ্চিত। তারা জুমের ওপর নির্ভরশীল। সরকার যাতে এসব এলাকার উন্নয়নে বিশেষ দৃষ্টি দেয়।

প্রতি বছর জ্যেষ্ঠ থেকে ভাদ্র পর্যন্ত জুমচাষিদের খাদ্য স্বল্পতা দেখা যায়। এ সময় অনেকে দিন-মজুর বা বনজসম্পদ বিক্রি করে সংসার চালান।

বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা জাবারাংয়ের নির্বাহী পরিচালক মথুরা বিকাশ ত্রিপুরা জানান, পার্বত্য চট্টগ্রামে জীবিকার প্রধান অবলম্বন জুমচাষ। জুমের ফসল ঘরে না তোলা পর্যন্ত অনেক জুমিয়া খাদ্য সংকটে থাকেন।

জুমচাষকে আধুনিকায়ন করাও সময়ের দাবি। জুমচাষকে সাধারণ কৃষি হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে সরকারি ঋণ সহায়তা প্রদান করা উচিত। এ ছাড়া পাহাড়ে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ, বিদ্যুৎসহ নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করার জন্য সরকারি-বেসরকারি সংস্থাগুলোকে এগিয়ে আসতে হবে।