বন্যায় ছড়িয়ে পড়ছে বিভিন্ন রোগ
jugantor
বন্যায় ছড়িয়ে পড়ছে বিভিন্ন রোগ

  কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি  

১০ আগস্ট ২০২০, ১৪:৩৪:৫৮  |  অনলাইন সংস্করণ

বন্যায় ছড়িয়ে পড়ছে বিভিন্ন রোগ
ছবি: যুগান্তর

কুড়িগ্রামে বন্যার ধকল কাটতে না কাটতে পানিবাহিতসহ বিভিন্ন রোগব্যাধি ছড়িয়ে পড়েছে। মানুষের পাশাপাশি আক্রান্ত হচ্ছে গবাদিপশুও।

বানভাসি মানুষ বন্যার ক্ষতি এখনও কাটিয়ে উঠতে পারেনি। এরই মধ্যে রোগব্যাধি নিয়ে চরম দুশ্চিন্তায় পড়েছেন তারা। ‘এ যেন মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’। কিন্তু নেই চিকিৎসাসেবা সহায়তা। এসব মানুষের হাতে কাজ নেই। হাতে নেই টাকা-পয়সা।

জানা যায়, বানভাসিরা ঘরবাড়ি মেরামত করা, ভেঙে পড়া নলকূপ ও ল্যাট্রিন সংস্কার নিয়ে পড়েছে বিপাকে। এ অবস্থায় সরকারিভাবে সহযোগিতা করা হলেও তা ছিল অপ্রতুল। এখনও মানুষ নিজেদের খাদ্য সংকটের পাশাপাশি গবাদিপশুর খাদ্য সংকটেও ভুগছে।  

জেলা প্রাণিসম্পদ অফিসের কর্মকর্তা ডা. মকবুল হোসেন জানান, চলতি বন্যায় তিন হাজার ৮৯২ গরু লাম্পি স্কিন ডিজিজসহ অন্যান্য রোগে আক্রান্ত হয়েছে।

এ ছাড়া বন্যার আগে ২৬ হাজার ৩০০ গরুকে টিকা প্রদান করা হয় বলে জানানো হয়েছে। কিন্তু মাঠের চিত্র ভিন্ন। এখনও সাড়ে চার শতাধিক চরে অসংখ্য গরু লাম্পি স্কিনসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত আছে বলে জনপ্রতিনিধিসহ ভুক্তভোগীরা জানিয়েছেন।

জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা আবদুল হাই সরকার জানান, বন্যায় জেলার ৯ উপজেলার ৭৫ ইউনিয়নের মধ্যে ৫৬ ইউনিয়নের ৪৭৫টি গ্রামের মানুষ পানিবন্দি। নদীভাঙন ও পানিবন্দি মানুষের সংখ্যা আড়াই লাখ। বন্যায় প্রায় ৬৩ হাজার বাড়িঘর পানিতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। রোগব্যাধিতে আক্রান্ত হয়েছে শত শত গবাদিপশু। নলকূপ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৪২ হাজার ২৩৭টি।

বন্যার পানিতে ডুবে মারা গেছেন ২৩ জন। এর মধ্যে শিশুর সংখ্যা ১৮ জন। বন্যার পানি বিপদসীমার ওপর থেকে কমতে শুরু করার পর থেকে দেখা দিয়েছে পানিবাহিত রোগের প্রকোপ। চরাঞ্চলের মানুষের হাত-পা ও আঙুল ফেটে যাচ্ছে।
 
শরীরে বাসা বাঁধছে নানান জটিল রোগ। জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ বন্যাকালীন ৮৫টি মেডিকেল টিম গঠনের কথা বললেও দুর্গম চরাঞ্চলে চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন হাজার হাজার মানুষ।

পানি নেমে যাওয়ার পর এসব সংস্কার নিয়ে বিপাকে রয়েছেন মানুষ। অর্থের অভাবে ভাঙা কুঠিরেই অনেকে অবস্থান নিয়েছেন।

জেলার উলিপুর উপজেলার বেগমগঞ্জ ইউনিয়নের ব্রহ্মপুত্র নদ পরিবেষ্টিত মশালের চরের ইউপি সদস্য সিদ্দিক আলী বলেন, আমার ৯নং ওয়ার্ডে ২৫০ পরিবার রয়েছে। প্রায় প্রত্যেকটি বাড়িতে গরুর রোগ দেখা দিয়েছে।

খোঁজ নিয়ে দেখা গেল বেশিরভাগ গরু লাম্পি স্কিন ডিজিজে আক্রান্ত হয়েছে। এ ছাড়া বাড়ির পুরুষ ও নারীর হাত-পায়ের চর্মরোগে এবং শিশুরা সর্দি, কাশি ও পাতলা পায়খানায় আক্রান্ত হয়েছে।

পার্শ্ববর্তী ৭নং ওয়ার্ডের মেম্বার আবু বক্কর খান বলেন, আমার বতুয়াতুলি ও ফকিরেরচর গ্রামে ১৯৭ পরিবারের মধ্যে প্রায় অর্ধেক পরিবারে গরুর রোগ দেখা দিয়েছে। এ ছাড়া দেখা দিয়েছে নারী-পুরুষের চর্মরোগ। প্রতিটি গরুর চিকিৎসা বাবদ আড়াই হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত ব্যয় হচ্ছে। এতে কর্মহীন মানুষ দিশাহারা হয়ে পড়েছেন।

বেগমগঞ্জ ইউনিয়নের ৬নং ওয়ার্ডের মেম্বার মহু-বাদশা বলেন, আমাদের চরাঞ্চলে সরকারি কোনো পশু ডাক্তার আসে না। আমাদের বাড়তি ব্যয়ে নৌকা ভাড়া করে মোল্লারহাট বা যাত্রাপুরে গিয়ে গরুর চিকিৎসা করতে হয়। চরের সম্পদ হলো গরু। এই গরু না থাকলে আমরা বাঁচব কীভাবে।

এই জনপ্রতিনিধিরা দাবি করেন, আমাদের দুর্দশার কথা চিন্তা করে সরকার যদি সপ্তাহে একবার করে চরগুলোতে ডাক্তার পাঠানোর ব্যবস্থা করে, তা হলে আমাদের ভালো হয়। না হলে আমাদের প্রতারণা করে অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছেন এলাকার পল্লী চিকিৎসকরা।

এ ব্যাপারে জেলা অতিরিক্ত প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মকবুল হোসেন বলেন, লাম্পি স্কিন ডিজিজ মূলত ভাইরাল ডিজিজ। মশা-মাছি থেকে এটি ছড়িয়ে পড়ে। এতে গরু মারা যাওয়ার সম্ভাবনা কম। তবে চিকিৎসায় অবহেলা করলে মারাও যেতে পারে। এখনও যেসব চর এলাকায় আমাদের লোকজন যেতে পারেনি। দ্রুত সেখানে ভ্যাকসিন নিয়ন্ত্রণ ও জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম গ্রহণ করা হবে।

এ ছাড়া তিনি আরও বলেন, বন্যাকালীন গবাদিপশুর খাদ্যের জন্য সরকার এবার ১৪ লাখ টাকা বরাদ্দ দিয়েছে। ইতিমধ্যে বিভিন্ন উপজেলায় ৯ লাখ টাকা উপবরাদ্দ ও বিতরণ সম্পন্ন হয়েছে। এ ছাড়া আরও ৫ লাখ টাকা মজুদ রয়েছে।

রোগব্যাধির বিস্তার সম্পর্কে সিভিল সার্জন ডা. হাবিবুর রহমান বলেন, এ পর্যন্ত ডায়েরিয়া ও নিউমেনিয়াসহ অন্যান্য রোগের সেভাবে প্রাদুর্ভাব দেখা যায়নি। তবে আমাদের আশঙ্কা রয়েছে যে বন্যাপরবর্তী পানি নেমে যাওয়ার পর পানিবাহিত রোগগুলো বিস্তার লাভ করতে পারে। এ জন্য আমাদের ৮৫টি মেডিকেল টিম প্রস্তুত রয়েছে।

বন্যায় ছড়িয়ে পড়ছে বিভিন্ন রোগ

 কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি 
১০ আগস্ট ২০২০, ০২:৩৪ পিএম  |  অনলাইন সংস্করণ
বন্যায় ছড়িয়ে পড়ছে বিভিন্ন রোগ
ছবি: যুগান্তর

কুড়িগ্রামে বন্যার ধকল কাটতে না কাটতে পানিবাহিতসহ বিভিন্ন রোগব্যাধি ছড়িয়ে পড়েছে। মানুষের পাশাপাশি আক্রান্ত হচ্ছে গবাদিপশুও।

বানভাসি মানুষ বন্যার ক্ষতি এখনও কাটিয়ে উঠতে পারেনি। এরই মধ্যে রোগব্যাধি নিয়ে চরম দুশ্চিন্তায় পড়েছেন তারা। ‘এ যেন মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’। কিন্তু নেই চিকিৎসাসেবা সহায়তা। এসব মানুষের হাতে কাজ নেই। হাতে নেই টাকা-পয়সা।

জানা যায়, বানভাসিরা ঘরবাড়ি মেরামত করা, ভেঙে পড়া নলকূপ ও ল্যাট্রিন সংস্কার নিয়ে পড়েছে বিপাকে। এ অবস্থায় সরকারিভাবে সহযোগিতা করা হলেও তা ছিল অপ্রতুল। এখনও মানুষ নিজেদের খাদ্য সংকটের পাশাপাশি গবাদিপশুর খাদ্য সংকটেও ভুগছে।

জেলা প্রাণিসম্পদ অফিসের কর্মকর্তা ডা. মকবুল হোসেন জানান, চলতি বন্যায় তিন হাজার ৮৯২ গরু লাম্পি স্কিন ডিজিজসহ অন্যান্য রোগে আক্রান্ত হয়েছে।

এ ছাড়া বন্যার আগে ২৬ হাজার ৩০০ গরুকে টিকা প্রদান করা হয় বলে জানানো হয়েছে। কিন্তু মাঠের চিত্র ভিন্ন। এখনও সাড়ে চার শতাধিক চরে অসংখ্য গরু লাম্পি স্কিনসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত আছে বলে জনপ্রতিনিধিসহ ভুক্তভোগীরা জানিয়েছেন।

জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা আবদুল হাই সরকার জানান, বন্যায় জেলার ৯ উপজেলার ৭৫ ইউনিয়নের মধ্যে ৫৬ ইউনিয়নের ৪৭৫টি গ্রামের মানুষ পানিবন্দি। নদীভাঙন ও পানিবন্দি মানুষের সংখ্যা আড়াই লাখ। বন্যায় প্রায় ৬৩ হাজার বাড়িঘর পানিতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। রোগব্যাধিতে আক্রান্ত হয়েছে শত শত গবাদিপশু। নলকূপ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৪২ হাজার ২৩৭টি।

বন্যার পানিতে ডুবে মারা গেছেন ২৩ জন। এর মধ্যে শিশুর সংখ্যা ১৮ জন। বন্যার পানি বিপদসীমার ওপর থেকে কমতে শুরু করার পর থেকে দেখা দিয়েছে পানিবাহিত রোগের প্রকোপ। চরাঞ্চলের মানুষের হাত-পা ও আঙুল ফেটে যাচ্ছে।

শরীরে বাসা বাঁধছে নানান জটিল রোগ। জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ বন্যাকালীন ৮৫টি মেডিকেল টিম গঠনের কথা বললেও দুর্গম চরাঞ্চলে চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন হাজার হাজার মানুষ।

পানি নেমে যাওয়ার পর এসব সংস্কার নিয়ে বিপাকে রয়েছেন মানুষ। অর্থের অভাবে ভাঙা কুঠিরেই অনেকে অবস্থান নিয়েছেন।

জেলার উলিপুর উপজেলার বেগমগঞ্জ ইউনিয়নের ব্রহ্মপুত্র নদ পরিবেষ্টিত মশালের চরের ইউপি সদস্য সিদ্দিক আলী বলেন, আমার ৯নং ওয়ার্ডে ২৫০ পরিবার রয়েছে। প্রায় প্রত্যেকটি বাড়িতে গরুর রোগ দেখা দিয়েছে।

খোঁজ নিয়ে দেখা গেল বেশিরভাগ গরু লাম্পি স্কিন ডিজিজে আক্রান্ত হয়েছে। এ ছাড়া বাড়ির পুরুষ ও নারীর হাত-পায়ের চর্মরোগে এবং শিশুরা সর্দি, কাশি ও পাতলা পায়খানায় আক্রান্ত হয়েছে।

পার্শ্ববর্তী ৭নং ওয়ার্ডের মেম্বার আবু বক্কর খান বলেন, আমার বতুয়াতুলি ও ফকিরেরচর গ্রামে ১৯৭ পরিবারের মধ্যে প্রায় অর্ধেক পরিবারে গরুর রোগ দেখা দিয়েছে। এ ছাড়া দেখা দিয়েছে নারী-পুরুষের চর্মরোগ। প্রতিটি গরুর চিকিৎসা বাবদ আড়াই হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত ব্যয় হচ্ছে। এতে কর্মহীন মানুষ দিশাহারা হয়ে পড়েছেন।

বেগমগঞ্জ ইউনিয়নের ৬নং ওয়ার্ডের মেম্বার মহু-বাদশা বলেন, আমাদের চরাঞ্চলে সরকারি কোনো পশু ডাক্তার আসে না। আমাদের বাড়তি ব্যয়ে নৌকা ভাড়া করে মোল্লারহাট বা যাত্রাপুরে গিয়ে গরুর চিকিৎসা করতে হয়। চরের সম্পদ হলো গরু। এই গরু না থাকলে আমরা বাঁচব কীভাবে।

এই জনপ্রতিনিধিরা দাবি করেন, আমাদের দুর্দশার কথা চিন্তা করে সরকার যদি সপ্তাহে একবার করে চরগুলোতে ডাক্তার পাঠানোর ব্যবস্থা করে, তা হলে আমাদের ভালো হয়। না হলে আমাদের প্রতারণা করে অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছেন এলাকার পল্লী চিকিৎসকরা।

এ ব্যাপারে জেলা অতিরিক্ত প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মকবুল হোসেন বলেন, লাম্পি স্কিন ডিজিজ মূলত ভাইরাল ডিজিজ। মশা-মাছি থেকে এটি ছড়িয়ে পড়ে। এতে গরু মারা যাওয়ার সম্ভাবনা কম। তবে চিকিৎসায় অবহেলা করলে মারাও যেতে পারে। এখনও যেসব চর এলাকায় আমাদের লোকজন যেতে পারেনি। দ্রুত সেখানে ভ্যাকসিন নিয়ন্ত্রণ ও জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম গ্রহণ করা হবে।

এ ছাড়া তিনি আরও বলেন, বন্যাকালীন গবাদিপশুর খাদ্যের জন্য সরকার এবার ১৪ লাখ টাকা বরাদ্দ দিয়েছে। ইতিমধ্যে বিভিন্ন উপজেলায় ৯ লাখ টাকা উপবরাদ্দ ও বিতরণ সম্পন্ন হয়েছে। এ ছাড়া আরও ৫ লাখ টাকা মজুদ রয়েছে।

রোগব্যাধির বিস্তার সম্পর্কে সিভিল সার্জন ডা. হাবিবুর রহমান বলেন, এ পর্যন্ত ডায়েরিয়া ও নিউমেনিয়াসহ অন্যান্য রোগের সেভাবে প্রাদুর্ভাব দেখা যায়নি। তবে আমাদের আশঙ্কা রয়েছে যে বন্যাপরবর্তী পানি নেমে যাওয়ার পর পানিবাহিত রোগগুলো বিস্তার লাভ করতে পারে। এ জন্য আমাদের ৮৫টি মেডিকেল টিম প্রস্তুত রয়েছে।

 
জেলার খবর
অনুসন্ধান করুন