পানির সঙ্গে বসবাস বরিশালের কয়েক উপজেলাবাসীর
jugantor
পানির সঙ্গে বসবাস বরিশালের কয়েক উপজেলাবাসীর

  সাইদুর রহমান পান্থ, বরিশাল ব্যুরো  

১০ আগস্ট ২০২০, ২১:১৮:১২  |  অনলাইন সংস্করণ

গোলাভরা ধান, গোয়ালভরা গরু। পুকুরে মাছের খুনসুঁটি। বাজারে লোকসমাগম। এমনি একটি আদর্শ গ্রাম ডিক্রিরচর। বরিশাল জেলার হিজলা থানার মেমানিয়া ইউনিয়নের অন্তর্গত গ্রামটি। সব ঠিকঠাক চলছিল কিন্তু চলতি মৌসুমের বন্যার পানির কারণে পানির সঙ্গেই বসবাস করছেন এ গ্রামের মানুষ।

বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট লঘুচাপ ও পূর্ণিমার প্রভাবে হঠাৎ করেই পানি বেড়ে যায়। স্রোতের সঙ্গে দ্রুতগতিতে পানি বেড়ে ডুবে গেছে পুরো গ্রাম। পুকুরের মাছ, ফসলসহ ঘরবাড়ি হারিয়ে নিঃস্ব অনেকেই। নিম্নাঞ্চলের রাস্তা-ঘাট, হাট-বাজার, বাসা-বাড়ি, স্কুলে জোয়ারের পানি ঢুকে কৃত্রিম বন্যার সৃষ্টি হয়েছে। একই সঙ্গে পুকুর ও ঘেরের মাছসহ কয়েকশ' হেক্টর ফসলি জমি তলিয়ে গেছে। বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে যোগাযোগ ব্যবস্থা।

এছাড়া মেঘনা নদীর পানি ১১৪ সেন্টিমিটার বিপৎসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় প্রবল স্রোতে নদীভাঙনে ফসলি জমি, বসতবাড়ি, রাস্তাঘাট বিলীন হয়ে গেছে।

বৃদ্ধা রহিমা বেগমের যেন সবকিছুই শূন্যের ঘরে। মেঘনা নদীরপাড়ে বাড়ি হওয়ায় সাধের ঘরসহ ফসলি জমি সবকিছু কেড়ে নিয়েছে সর্বনাশা নদী। তার চোখজুড়ে এখন পানি আর স্রোত। সব হারিয়ে চোখের জলও হারিয়ে গেছে। শুধু ফ্যাল ফ্যাল করে নির্বাক তাকিয়ে থাকেন। শুধু রহিমাই নন, এমন দু:সহ জীবনের গল্প এখন ডিক্রিরচরসহ তার পার্শ্ববর্তী মেঘনার কোল ঘেঁষে আবুপুর গ্রামের অনেক ঘরেই।

৭০ বছর বয়সী আব্দুর রহমান জানান, বন্যায় সব ডুবে গেছে। কোথাও থাকার জায়গা নেই। অনেক কষ্টে দিন পার করছি। আটানব্বই সালের পর এমন বন্যা আর দেখিনি।

উপজেলার শুধু ডিক্রিরচরই নয়, বাউশিয়া, মহিষখোলা, টুনচর, ঘঙ্গাপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় পানি ঢুকে গেছে। কোথাও কোথাও পানি উঠে নেমে গেলেও অনেক স্থানেই পানি গত প্রায় এক সপ্তাহ ধরে রয়েছে। এতে শুধু হিজলা উপজেলায় ৪ হাজারের বেশি ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পাঁচ শতাধিক পুকুর, প্রায় ২ হাজার একর পানের বরজ ও দেড় শতাধিক গবাদিপশু ক্ষতির মুখে পড়েছে।

এদিকে জেলার মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলার অবস্থাও হিজলা উপজেলার মতোই। এখানকার উলানিয়া, গবিন্দপুর, চানপুর, মেহেন্দিগঞ্জ সদর ইউনিয়নে পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন হাজারও মানুষ। বন্যায় এখানকার ৯১০টি ঘরবাড়ি পুরো ও আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানিয়েছেন উপজেলা প্রকল্প কর্মকর্তা মুজাহিদুল ইসলাম।

তিনি জানান, শুধু ঘরবাড়িই নয়, এখানকার ফসলি জমি, পানের বরজ ও পুকুর পানিতে তলিয়ে গেছে। এতে সীমাহীন দুর্ভোগে পড়েছেন এখানকার বাসিন্দারা। বরিশাল সদর উপজেলার শায়েস্তাবাদ ইউনিয়নের রামকাঠি, সিকান্দারপুর, কান্ডারিয়া, জগতবলসহ বিভিন্ন গ্রাম পানিতে তলিয়ে গেছে। ক্ষতির মুখে পড়েছে এখানকার ঘরবাড়ি ফসলের মাঠ। ভেসে গেছে অসংখ্য পুকুর ও ঘেরের মাছ।

রামকাঠি গ্রামের মাছের ঘেরের মালিক মো. গোলাম মোস্তফা বলেন, আমাদের স্বপ্ন বন্যার পানিতে ভেসে গেছে। শুধু আমারই নয়, অনেকের ঘেরের মাছ চলে গেছে। যদিও এজন্য সরকারিভাবে আমরা কোনো সাহায্য সহযোগিতা পাইনি।

জেলার বাবুগঞ্জ উপজেলার কেদারপুর ইউনিয়নের পূর্ব ভুতুরদিয়া, আগরপুর ইউনিয়নের চরজাহাপুর, সিলন্দিয়া, রহমতপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামের মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। পাশাপাশি বন্যার কারণে আড়িয়াল খাঁ নদের ভাঙন বেড়ে গেছে। এতে ছোট মীরগঞ্জ বাজার নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী হারুন অর রশিদ।

এদিকে বানারীপাড়া উপজেলার বিশরকান্দি ইউনিয়ন, উদয়পুর, সৈয়দকাঠি, ইলুহার, বাইশারীসহ বিভিন্ন ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চল পানিতে তলিয়ে গেছে।

এ ব্যাপারে বরিশাল জেলা প্রশাসক এসএম অজিয়র রহমান বলেন, এখন আর তেমন পানিবন্দি মানুষ নেই। জোয়ারের পানি ওঠে, আবার নেমে যায়। তারপরও বিভিন্ন উপজেলার ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ করা হচ্ছে। তবে বড় ধরনের কোনো ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। জেলার ১০ উপজেলায় ১০ টন করে চাল বরাদ্দ করা হয়েছে। পাশাপাশি চলমান ত্রাণ কার্যক্রম চলছে।

পানির সঙ্গে বসবাস বরিশালের কয়েক উপজেলাবাসীর

 সাইদুর রহমান পান্থ, বরিশাল ব্যুরো 
১০ আগস্ট ২০২০, ০৯:১৮ পিএম  |  অনলাইন সংস্করণ

গোলাভরা ধান, গোয়ালভরা গরু। পুকুরে মাছের খুনসুঁটি। বাজারে লোকসমাগম। এমনি একটি আদর্শ গ্রাম ডিক্রিরচর। বরিশাল জেলার হিজলা থানার মেমানিয়া ইউনিয়নের অন্তর্গত গ্রামটি। সব ঠিকঠাক চলছিল কিন্তু চলতি মৌসুমের বন্যার পানির কারণে পানির সঙ্গেই বসবাস করছেন এ গ্রামের মানুষ।

বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট লঘুচাপ ও পূর্ণিমার প্রভাবে হঠাৎ করেই পানি বেড়ে যায়। স্রোতের সঙ্গে দ্রুতগতিতে পানি বেড়ে ডুবে গেছে পুরো গ্রাম। পুকুরের মাছ, ফসলসহ ঘরবাড়ি হারিয়ে নিঃস্ব অনেকেই। নিম্নাঞ্চলের রাস্তা-ঘাট, হাট-বাজার, বাসা-বাড়ি, স্কুলে জোয়ারের পানি ঢুকে কৃত্রিম বন্যার সৃষ্টি হয়েছে। একই সঙ্গে পুকুর ও ঘেরের মাছসহ কয়েকশ' হেক্টর ফসলি জমি তলিয়ে গেছে। বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে যোগাযোগ ব্যবস্থা।

এছাড়া মেঘনা নদীর পানি ১১৪ সেন্টিমিটার বিপৎসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় প্রবল স্রোতে নদীভাঙনে ফসলি জমি, বসতবাড়ি, রাস্তাঘাট বিলীন হয়ে গেছে।

বৃদ্ধা রহিমা বেগমের যেন সবকিছুই শূন্যের ঘরে। মেঘনা নদীরপাড়ে বাড়ি হওয়ায় সাধের ঘরসহ ফসলি জমি সবকিছু কেড়ে নিয়েছে সর্বনাশা নদী। তার চোখজুড়ে এখন পানি আর স্রোত। সব হারিয়ে চোখের জলও হারিয়ে গেছে। শুধু ফ্যাল ফ্যাল করে নির্বাক তাকিয়ে থাকেন। শুধু রহিমাই নন, এমন দু:সহ জীবনের গল্প এখন ডিক্রিরচরসহ তার পার্শ্ববর্তী মেঘনার কোল ঘেঁষে আবুপুর গ্রামের অনেক ঘরেই।

৭০ বছর বয়সী আব্দুর রহমান জানান, বন্যায় সব ডুবে গেছে। কোথাও থাকার জায়গা নেই। অনেক কষ্টে দিন পার করছি। আটানব্বই সালের পর এমন বন্যা আর দেখিনি।

উপজেলার শুধু ডিক্রিরচরই নয়, বাউশিয়া, মহিষখোলা, টুনচর, ঘঙ্গাপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় পানি ঢুকে গেছে। কোথাও কোথাও পানি উঠে নেমে গেলেও অনেক স্থানেই পানি গত প্রায় এক সপ্তাহ ধরে রয়েছে। এতে শুধু হিজলা উপজেলায় ৪ হাজারের বেশি ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পাঁচ শতাধিক পুকুর, প্রায় ২ হাজার একর পানের বরজ ও দেড় শতাধিক গবাদিপশু ক্ষতির মুখে পড়েছে।

এদিকে জেলার মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলার অবস্থাও হিজলা উপজেলার মতোই। এখানকার উলানিয়া, গবিন্দপুর, চানপুর, মেহেন্দিগঞ্জ সদর ইউনিয়নে পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন হাজারও মানুষ। বন্যায় এখানকার ৯১০টি ঘরবাড়ি পুরো ও আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানিয়েছেন উপজেলা প্রকল্প কর্মকর্তা মুজাহিদুল ইসলাম।

তিনি জানান, শুধু ঘরবাড়িই নয়, এখানকার ফসলি জমি, পানের বরজ ও পুকুর পানিতে তলিয়ে গেছে। এতে সীমাহীন দুর্ভোগে পড়েছেন এখানকার বাসিন্দারা। বরিশাল সদর উপজেলার শায়েস্তাবাদ ইউনিয়নের রামকাঠি, সিকান্দারপুর, কান্ডারিয়া, জগতবলসহ বিভিন্ন গ্রাম পানিতে তলিয়ে গেছে। ক্ষতির মুখে পড়েছে এখানকার ঘরবাড়ি ফসলের মাঠ। ভেসে গেছে অসংখ্য পুকুর ও ঘেরের মাছ।

রামকাঠি গ্রামের মাছের ঘেরের মালিক মো. গোলাম মোস্তফা বলেন, আমাদের স্বপ্ন বন্যার পানিতে ভেসে গেছে। শুধু আমারই নয়, অনেকের ঘেরের মাছ চলে গেছে। যদিও এজন্য সরকারিভাবে আমরা কোনো সাহায্য সহযোগিতা পাইনি।

জেলার বাবুগঞ্জ উপজেলার কেদারপুর ইউনিয়নের পূর্ব ভুতুরদিয়া, আগরপুর ইউনিয়নের চরজাহাপুর, সিলন্দিয়া, রহমতপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামের মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। পাশাপাশি বন্যার কারণে আড়িয়াল খাঁ নদের ভাঙন বেড়ে গেছে। এতে ছোট মীরগঞ্জ বাজার নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী হারুন অর রশিদ।

এদিকে বানারীপাড়া উপজেলার বিশরকান্দি ইউনিয়ন, উদয়পুর, সৈয়দকাঠি, ইলুহার, বাইশারীসহ বিভিন্ন ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চল পানিতে তলিয়ে গেছে।

এ ব্যাপারে বরিশাল জেলা প্রশাসক এসএম অজিয়র রহমান বলেন, এখন আর তেমন পানিবন্দি মানুষ নেই। জোয়ারের পানি ওঠে, আবার নেমে যায়। তারপরও বিভিন্ন উপজেলার ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ করা হচ্ছে। তবে বড় ধরনের কোনো ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। জেলার ১০ উপজেলায় ১০ টন করে চাল বরাদ্দ করা হয়েছে। পাশাপাশি চলমান ত্রাণ কার্যক্রম চলছে।

 

ঘটনাপ্রবাহ : বন্যা ২০২০

জেলার খবর
অনুসন্ধান করুন