শেরপুরে মা ও শিশুকল্যাণ কেন্দ্রের দুর্নীতিতে জড়িতরা ধরাছোঁয়ার বাইরে
jugantor
শেরপুরে মা ও শিশুকল্যাণ কেন্দ্রের দুর্নীতিতে জড়িতরা ধরাছোঁয়ার বাইরে

  শেরপুর প্রতিনিধি  

১৩ আগস্ট ২০২০, ২১:১৯:৪৭  |  অনলাইন সংস্করণ

শেরপুর
শেরপুর মা ও শিশুকল্যাণ কেন্দ্র। যুগান্তর

শেরপুর মা ও শিশুকল্যাণ কেন্দ্রে চলছে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতি। ফলে এ সরকারি সেবাদান কেন্দ্রটি এখন দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত হয়েছে। এতদিন বিষয়টি আড়ালে থাকলেও বর্তমানে থলের বিড়াল বেরিয়ে আসতে শুরু করেছে। এই মা ও শিশুকল্যাণ কেন্দ্রে আধুনিক অপারেশন থিয়েটারে সিজারের ব্যবস্থা থাকলেও ষড়যন্ত্রমূলকভাবে ও ব্যক্তিস্বার্থ হাসিল করার জন্য কার্যত এটাকে অচল করে রাখা হয়েছে। কিন্তু এসব অনিয়মের সঙ্গে একাধিক কর্মকর্তা জড়িত থাকলেও তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে। উল্টো যে কর্মকর্তা এ অনিয়মের প্রতিবাদ করেছেন, তার বিরুদ্ধেই শোকজ করা হয়েছে। এ নিয়ে শুরু হয়েছে তোলপাড়।

 

অনুসন্ধানে জানা গেছে, চলতি বছর ২৩ মার্চ শেরপুর শহরের গোপালবাড়ী এলাকার অবস্থিত মা ও শিশুকল্যাণ কেন্দ্রের ওষুধভাণ্ডার থেকে প্রায় ৬ লাখ টাকার মূল্যবান মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ উদ্ধার করা হয়।

 

প্রাথমিকভাবে জানা যায়, এই কেন্দ্রের চিকিৎসা কর্মকর্তা (ক্লিনিক) ডা. মো. মোস্তাফিজুর রহমানের অবহেলা ও গাফিলতিতে এসব ওষুধ নষ্ট হয়ে গেছে। এতে সরকারি অর্থের অপচয়ের অভিযোগ উঠলে এ নিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা তদন্ত করলেও অদ্যাবধি কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। এছাড়াও প্রতি মাসে তিনটি করে ডিডিএস কিট আসে মা ও শিশুকল্যাণ কেন্দ্রের নামে। কিন্তু এসব ওষুধপত্র সাধারণ রোগীদের মধ্যে বিতরণ করে তা খাতার মধ্যে লিপিবদ্ধ করার নিয়ম থাকলেও মোস্তাফিজুর রহমান তার দায়িত্ব পালনকালীন এসবের কিছুই করেননি।

 

অভিযোগ রয়েছে, শেরপুর জেলা পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের উপপরিচালক ডা. পীযূষ চন্দ্র সূত্রধর এ বিভাগের নানা অনিয়মের সঙ্গে জড়িত থাকায় এসব অনিয়মের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না।

 

সূত্র মতে, ডা. পীযূষ ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলা থেকে প্রথমে শেরপুরের ঝিনাইগাতী পরে শ্রীবরদী উপজেলায় মেডিকেল অফিসার এমসিএইচ-এফপি হিসেবে যোগদান করেন। পরে অজ্ঞানের ট্রেনিং নিয়ে শেরপুরে সদর উপজেলায় এমসিএইচ-এফপি (অজ্ঞান) হিসেবে যোগদান করেন।

 

ডা. পীযূষ মা ও শিশুকল্যাণ কেন্দ্রের প্রথম অজ্ঞানের ডাক্তার। অজ্ঞানের ডাক্তার হিসেবে যোগদানের পর থেকে তিনি শেরপুরেই চাকরি করছেন, তাই জনস্বার্থে মা ও শিশুকল্যাণ কেন্দ্রের অপারেশন থিয়েটার সুষ্ঠুভাবে চালানোর কথা থাকলেও তিনি তা করেননি। কল্যাণ কেন্দ্রের অজ্ঞানের ডাক্তার হিসেবে তার দায়িত্ব পালনকলীন কল্যাণ কেন্দ্রের সামনের কোয়ার্টারে থাকার নিয়ম থাকলেও তিনি থাকেননি। কোয়ার্টারে থাকালেও বা না থাকলেও মাসে মাসে বেতন থেকে বাসা ভাড়া কেটে নেয়ার সরকারি নিয়ম রয়েছে।

 

কিন্তু ডা. পীযূষ প্রায় ৪ বছরকাল সেখানে দায়িত্ব পালন করে দুর্নীতির আশ্রয় নিয়ে কৌশলে বাসা ভাড়ার টাকাও উত্তোলন করে নিয়েছেন বলে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে। তার চাকরি জীবনের ২৩ বছরের মধ্যে ২০ বছরই কাটিয়েছেন শেরপুর জেলায়। উপ-পরিচালক হিসেবে পদোন্নতি পেয়ে ৫ বছর ধরে রয়েছেন এ জেলাতেই। শেরপুর মা ও শিশু স্বাস্থ্য কল্যাণ কেন্দ্রে অজ্ঞানের ডাক্তার আসলেও নানা কূটকৌশল করে বিদায় করে দেয়া হয়। আর মা ও শিশুকল্যাণ কেন্দ্রে আসা দরিদ্র রোগীদের বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতালে পাঠানো হয়।

 

এসব বেসরকারি হাসপাতালে সিজার করানোর সঙ্গে উপপরিচালক ডা. পীযূষ চন্দ্র সূত্রধর নিজে এবং মেডিকেল অফিসার (ক্লিনিক) মো. মোস্তাফিজুর রহমান জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে।

 

এদিকে শেরপুর মা ও শিশুকল্যাণ কেন্দ্রের ওষুধ ক্রয় না করেই ভুয়া বিল ভাউচারের মাধ্যমে বিল ওঠানোর জন্য দৌড়ঝাঁপ ব্যর্থ হওয়ার অভিযোগ উঠেছে ওই প্রতিষ্ঠানের মেডিকেল অফিসার (ক্লিনিক) ডা. মো. মোস্তাফিজুর রহমানের বিরুদ্ধে। ২০১৯-২০ অর্থবছরে দুদফায় সাড়ে চার লাখ টাকা ওষুধ ক্রয় করার জন্য সরকারি অর্থ বরাদ্দ আসে। নিয়ম অনুযায়ী ওই টাকার ওষুধ ক্রয় করে সাধারণ রোগীদের মধ্যে বিতরণ করার কথা ছিল। এ ওষুধ ক্রয় করতে হলে ক্রয় কমিটির সভা করে কোটেশন বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে সর্বনিম্ন দরদাতার কাছ থেকে ওষুধ ক্রয় করার নিয়ম। ওই ওষুধ বুঝে নেয়ার কথা শেরপুর সদর উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা অফিসার ডা. শারমিন রহমান অমির। তিনি ওষুধ বুঝে নিয়ে যাছাই-বাছাই শেষে প্রতিষ্ঠানের মেডিকেল অফিসার (ক্লিনিক) মোস্তাফিজুর রহমানের কাছে বুঝিয়ে দেয়ার কথা ছিল। কিন্তু এসব কিছুই করা হয়নি। ওষুধ ক্রয় না করেই ভুয়া বিল-ভাউচার তৈরি করে কমিটির সদস্যদের অফিসে অফিসে ঘুরে ঘুরে স্বাক্ষর নিয়ে টাকা উত্তোলনের চেষ্টা করছিলেন ডা. মোস্তাফিজুর রহমান।

 

শেরপুর সদর উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা অফিসার ডা. শারমিন রহমান অমি ওষুধ বুঝে না নিয়ে ভুয়া বিল ভাউচারে স্বাক্ষর করেননি। অভিযোগ রয়েছে, জেলা পরিবার পরিকল্পনা অফিসের উপপরিচালক ডা. পীযূষ চন্দ্র সূত্রধরও ভুয়া বিল-ভাউচারে স্বাক্ষর করার জন্য ডা. শারমিন রহমান অমিকে চাপ সৃষ্টি করেন। কিন্তু ডা. অমি কোন ভুয়া বিল-ভাউচারে স্বাক্ষর করেননি। ওষুধ ক্রয় না করায়, বিল ওঠাতে ব্যর্থ হয় তারা। ফলে টাকা ফেরত যায় সংশ্লিষ্ট অধিদফতরে। এতে তার প্রতি ক্ষুব্ধ হন উপ-পরিচালক ডা. পীযূষ চন্দ্র সূত্রধর। প্রতি বছরই ৩০ জুন তড়িঘড়ি করে এভাবেই ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে টাকা উত্তোলন করে তা ভাগবাটোয়ারা করে নেয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

 

সংশ্লিষ্ট বিভাগের একাধিক সূত্র জানায়, এ অনিয়মে সায় না দেয়ায় এখন উল্টো শেরপুর সদর উপজেলা পরিবার অফিসার, শেরপুর মা ও শিশুকল্যাণ কেন্দ্রের মেডিকেল অফিসার এবং ক্রয় কমিটির সদস্য ডা. শারমিন রহমান অমির বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র শুরু করা হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় জেলা পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের উপপরিচালক ডা. পীযূষ চন্দ্র সূত্রধর হয়রানি করার জন্য ডা. শারমিন রহমান অমিকে সম্প্রতি অন্য একটি ইস্যুতে শোকজ করেছেন।

 

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, ডা. শারমিন রহমান অমি শেরপুর সদর উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকেই তার কর্মতৎপরতায় প্রাণ ফিরে এসেছে পরিবার পকিল্পনা কার্যক্রমে। শেরপুর সদর উপজেলা প্রথম হয়েছে ময়মনসিংহ বিভাগে। শুধু তাই নয়, তিনি নানাভাবে মা ও শিশুদের চিকিৎসাসেবা দেয়ার পাশাপাশি মানুষকে সচেতন করতে নানাভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। করোনা সংকটকালীন ও চলতি বন্যার সময় তার স্টাফদের সঙ্গে নিয়ে নৌকাযোগে বাড়ি বাড়ি গিয়ে মা ও শিশুদের চিকিৎসাসেবা এবং বিনামূল্যে ওষুধ প্রদান ও শুকনো খাবার বিতরণ করেছেন ডা. অমি।

 

এ ব্যাপারে শেরপুর মা ও শিশুকল্যাণ কেন্দ্রের মেডিকেল অফিসার (ক্লিনিক) ডা. মো. মোস্তাফিজুর রহমানের সঙ্গে তার মোবাইল ফোনে যোগযোগ করা হলে তিনি বিভিন্ন দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, যেসব ওষুধপত্র ও জিনিস নষ্ট হয়েছে সেগুলো আমার আওতাধীন নয়। অজ্ঞানের ডাক্তার না থাকায় অপারেশন থিয়েটার চালু রাখা সম্ভব হয়নি। বাইরের ক্লিনিকে রোগী পাঠনোর যে অভিযোগ করা হয়েছে তা সত্য নয়। ওষুধ কেনার বিষয়ে ক্রয় কমিটির অন্যান্য সদস্য অসহযোগিতা করার কারণে টাকা ফেরত গেছে। তিনি ডিডিএস কিটের বিষয়ে বলেন, ওই ওষুধ বিতরণ করার পর তা হিসাব রাখার দায়িত্ব স্টোরকিপারের, আমার নয়। টাকা ভাগবাটোয়ারা করে নেয়ার যে অভিযোগ করা হয়েছে তাও সত্য নয়।

 

শেরপুর জেলা পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের উপ-পরিচালক ডা. পীযূষ চন্দ্র সূত্রধর তার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, মা ও শিশুকল্যাণ কেন্দ্রের অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগের বিষয়ে দায়ী কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য ডিজি অফিসে লিখেছি। তদন্ত হয়েছে, তবে করোনার কারণে তা ঝিমিয়ে পড়েছে।

শেরপুরে মা ও শিশুকল্যাণ কেন্দ্রের দুর্নীতিতে জড়িতরা ধরাছোঁয়ার বাইরে

 শেরপুর প্রতিনিধি 
১৩ আগস্ট ২০২০, ০৯:১৯ পিএম  |  অনলাইন সংস্করণ
শেরপুর
শেরপুর মা ও শিশুকল্যাণ কেন্দ্র। যুগান্তর

শেরপুর মা ও শিশুকল্যাণ কেন্দ্রে চলছে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতি। ফলে এ সরকারি সেবাদান কেন্দ্রটি এখন দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত হয়েছে। এতদিন বিষয়টি আড়ালে থাকলেও বর্তমানে থলের বিড়াল বেরিয়ে আসতে শুরু করেছে। এই মা ও শিশুকল্যাণ কেন্দ্রে আধুনিক অপারেশন থিয়েটারে সিজারের ব্যবস্থা থাকলেও ষড়যন্ত্রমূলকভাবে ও ব্যক্তিস্বার্থ হাসিল করার জন্য কার্যত এটাকে অচল করে রাখা হয়েছে। কিন্তু এসব অনিয়মের সঙ্গে একাধিক কর্মকর্তা জড়িত থাকলেও তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে। উল্টো যে কর্মকর্তা এ অনিয়মের প্রতিবাদ করেছেন, তার বিরুদ্ধেই শোকজ করা হয়েছে। এ নিয়ে শুরু হয়েছে তোলপাড়।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, চলতি বছর ২৩ মার্চ শেরপুর শহরের গোপালবাড়ী এলাকার অবস্থিত মা ও শিশুকল্যাণ কেন্দ্রের ওষুধভাণ্ডার থেকে প্রায় ৬ লাখ টাকার মূল্যবান মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ উদ্ধার করা হয়।

প্রাথমিকভাবে জানা যায়, এই কেন্দ্রের চিকিৎসা কর্মকর্তা (ক্লিনিক) ডা. মো. মোস্তাফিজুর রহমানের অবহেলা ও গাফিলতিতে এসব ওষুধ নষ্ট হয়ে গেছে। এতে সরকারি অর্থের অপচয়ের অভিযোগ উঠলে এ নিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা তদন্ত করলেও অদ্যাবধি কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। এছাড়াও প্রতি মাসে তিনটি করে ডিডিএস কিট আসে মা ও শিশুকল্যাণ কেন্দ্রের নামে। কিন্তু এসব ওষুধপত্র সাধারণ রোগীদের মধ্যে বিতরণ করে তা খাতার মধ্যে লিপিবদ্ধ করার নিয়ম থাকলেও মোস্তাফিজুর রহমান তার দায়িত্ব পালনকালীন এসবের কিছুই করেননি।

অভিযোগ রয়েছে, শেরপুর জেলা পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের উপপরিচালক ডা. পীযূষ চন্দ্র সূত্রধর এ বিভাগের নানা অনিয়মের সঙ্গে জড়িত থাকায় এসব অনিয়মের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না।

সূত্র মতে, ডা. পীযূষ ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলা থেকে প্রথমে শেরপুরের ঝিনাইগাতী পরে শ্রীবরদী উপজেলায় মেডিকেল অফিসার এমসিএইচ-এফপি হিসেবে যোগদান করেন। পরে অজ্ঞানের ট্রেনিং নিয়ে শেরপুরে সদর উপজেলায় এমসিএইচ-এফপি (অজ্ঞান) হিসেবে যোগদান করেন।

ডা. পীযূষ মা ও শিশুকল্যাণ কেন্দ্রের প্রথম অজ্ঞানের ডাক্তার। অজ্ঞানের ডাক্তার হিসেবে যোগদানের পর থেকে তিনি শেরপুরেই চাকরি করছেন, তাই জনস্বার্থে মা ও শিশুকল্যাণ কেন্দ্রের অপারেশন থিয়েটার সুষ্ঠুভাবে চালানোর কথা থাকলেও তিনি তা করেননি। কল্যাণ কেন্দ্রের অজ্ঞানের ডাক্তার হিসেবে তার দায়িত্ব পালনকলীন কল্যাণ কেন্দ্রের সামনের কোয়ার্টারে থাকার নিয়ম থাকলেও তিনি থাকেননি। কোয়ার্টারে থাকালেও বা না থাকলেও মাসে মাসে বেতন থেকে বাসা ভাড়া কেটে নেয়ার সরকারি নিয়ম রয়েছে।

কিন্তু ডা. পীযূষ প্রায় ৪ বছরকাল সেখানে দায়িত্ব পালন করে দুর্নীতির আশ্রয় নিয়ে কৌশলে বাসা ভাড়ার টাকাও উত্তোলন করে নিয়েছেন বলে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে। তার চাকরি জীবনের ২৩ বছরের মধ্যে ২০ বছরই কাটিয়েছেন শেরপুর জেলায়। উপ-পরিচালক হিসেবে পদোন্নতি পেয়ে ৫ বছর ধরে রয়েছেন এ জেলাতেই। শেরপুর মা ও শিশু স্বাস্থ্য কল্যাণ কেন্দ্রে অজ্ঞানের ডাক্তার আসলেও নানা কূটকৌশল করে বিদায় করে দেয়া হয়। আর মা ও শিশুকল্যাণ কেন্দ্রে আসা দরিদ্র রোগীদের বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতালে পাঠানো হয়।

এসব বেসরকারি হাসপাতালে সিজার করানোর সঙ্গে উপপরিচালক ডা. পীযূষ চন্দ্র সূত্রধর নিজে এবং মেডিকেল অফিসার (ক্লিনিক) মো. মোস্তাফিজুর রহমান জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে।

এদিকে শেরপুর মা ও শিশুকল্যাণ কেন্দ্রের ওষুধ ক্রয় না করেই ভুয়া বিল ভাউচারের মাধ্যমে বিল ওঠানোর জন্য দৌড়ঝাঁপ ব্যর্থ হওয়ার অভিযোগ উঠেছে ওই প্রতিষ্ঠানের মেডিকেল অফিসার (ক্লিনিক) ডা. মো. মোস্তাফিজুর রহমানের বিরুদ্ধে। ২০১৯-২০ অর্থবছরে দুদফায় সাড়ে চার লাখ টাকা ওষুধ ক্রয় করার জন্য সরকারি অর্থ বরাদ্দ আসে। নিয়ম অনুযায়ী ওই টাকার ওষুধ ক্রয় করে সাধারণ রোগীদের মধ্যে বিতরণ করার কথা ছিল। এ ওষুধ ক্রয় করতে হলে ক্রয় কমিটির সভা করে কোটেশন বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে সর্বনিম্ন দরদাতার কাছ থেকে ওষুধ ক্রয় করার নিয়ম। ওই ওষুধ বুঝে নেয়ার কথা শেরপুর সদর উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা অফিসার ডা. শারমিন রহমান অমির। তিনি ওষুধ বুঝে নিয়ে যাছাই-বাছাই শেষে প্রতিষ্ঠানের মেডিকেল অফিসার (ক্লিনিক) মোস্তাফিজুর রহমানের কাছে বুঝিয়ে দেয়ার কথা ছিল। কিন্তু এসব কিছুই করা হয়নি। ওষুধ ক্রয় না করেই ভুয়া বিল-ভাউচার তৈরি করে কমিটির সদস্যদের অফিসে অফিসে ঘুরে ঘুরে স্বাক্ষর নিয়ে টাকা উত্তোলনের চেষ্টা করছিলেন ডা. মোস্তাফিজুর রহমান।

শেরপুর সদর উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা অফিসার ডা. শারমিন রহমান অমি ওষুধ বুঝে না নিয়ে ভুয়া বিল ভাউচারে স্বাক্ষর করেননি। অভিযোগ রয়েছে, জেলা পরিবার পরিকল্পনা অফিসের উপপরিচালক ডা. পীযূষ চন্দ্র সূত্রধরও ভুয়া বিল-ভাউচারে স্বাক্ষর করার জন্য ডা. শারমিন রহমান অমিকে চাপ সৃষ্টি করেন। কিন্তু ডা. অমি কোন ভুয়া বিল-ভাউচারে স্বাক্ষর করেননি। ওষুধ ক্রয় না করায়, বিল ওঠাতে ব্যর্থ হয় তারা। ফলে টাকা ফেরত যায় সংশ্লিষ্ট অধিদফতরে। এতে তার প্রতি ক্ষুব্ধ হন উপ-পরিচালক ডা. পীযূষ চন্দ্র সূত্রধর। প্রতি বছরই ৩০ জুন তড়িঘড়ি করে এভাবেই ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে টাকা উত্তোলন করে তা ভাগবাটোয়ারা করে নেয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট বিভাগের একাধিক সূত্র জানায়, এ অনিয়মে সায় না দেয়ায় এখন উল্টো শেরপুর সদর উপজেলা পরিবার অফিসার, শেরপুর মা ও শিশুকল্যাণ কেন্দ্রের মেডিকেল অফিসার এবং ক্রয় কমিটির সদস্য ডা. শারমিন রহমান অমির বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র শুরু করা হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় জেলা পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের উপপরিচালক ডা. পীযূষ চন্দ্র সূত্রধর হয়রানি করার জন্য ডা. শারমিন রহমান অমিকে সম্প্রতি অন্য একটি ইস্যুতে শোকজ করেছেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, ডা. শারমিন রহমান অমি শেরপুর সদর উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকেই তার কর্মতৎপরতায় প্রাণ ফিরে এসেছে পরিবার পকিল্পনা কার্যক্রমে। শেরপুর সদর উপজেলা প্রথম হয়েছে ময়মনসিংহ বিভাগে। শুধু তাই নয়, তিনি নানাভাবে মা ও শিশুদের চিকিৎসাসেবা দেয়ার পাশাপাশি মানুষকে সচেতন করতে নানাভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। করোনা সংকটকালীন ও চলতি বন্যার সময় তার স্টাফদের সঙ্গে নিয়ে নৌকাযোগে বাড়ি বাড়ি গিয়ে মা ও শিশুদের চিকিৎসাসেবা এবং বিনামূল্যে ওষুধ প্রদান ও শুকনো খাবার বিতরণ করেছেন ডা. অমি।

এ ব্যাপারে শেরপুর মা ও শিশুকল্যাণ কেন্দ্রের মেডিকেল অফিসার (ক্লিনিক) ডা. মো. মোস্তাফিজুর রহমানের সঙ্গে তার মোবাইল ফোনে যোগযোগ করা হলে তিনি বিভিন্ন দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, যেসব ওষুধপত্র ও জিনিস নষ্ট হয়েছে সেগুলো আমার আওতাধীন নয়। অজ্ঞানের ডাক্তার না থাকায় অপারেশন থিয়েটার চালু রাখা সম্ভব হয়নি। বাইরের ক্লিনিকে রোগী পাঠনোর যে অভিযোগ করা হয়েছে তা সত্য নয়। ওষুধ কেনার বিষয়ে ক্রয় কমিটির অন্যান্য সদস্য অসহযোগিতা করার কারণে টাকা ফেরত গেছে। তিনি ডিডিএস কিটের বিষয়ে বলেন, ওই ওষুধ বিতরণ করার পর তা হিসাব রাখার দায়িত্ব স্টোরকিপারের, আমার নয়। টাকা ভাগবাটোয়ারা করে নেয়ার যে অভিযোগ করা হয়েছে তাও সত্য নয়।

শেরপুর জেলা পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের উপ-পরিচালক ডা. পীযূষ চন্দ্র সূত্রধর তার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, মা ও শিশুকল্যাণ কেন্দ্রের অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগের বিষয়ে দায়ী কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য ডিজি অফিসে লিখেছি। তদন্ত হয়েছে, তবে করোনার কারণে তা ঝিমিয়ে পড়েছে।

 
আরও খবর
 
জেলার খবর
অনুসন্ধান করুন