শতকোটি টাকার হাঁস প্রজনন কেন্দ্রের বাচ্চা ফোটে কাগজে-কলমে
jugantor
শতকোটি টাকার হাঁস প্রজনন কেন্দ্রের বাচ্চা ফোটে কাগজে-কলমে

  আবু বাসার আখন্দ, মাগুরা   

২৬ সেপ্টেম্বর ২০২০, ২০:২৬:২২  |  অনলাইন সংস্করণ

মাগুরায় বাচ্চা ফোটে না ১০০ কোটি টাকা ব্যায়ে স্থাপিত আঞ্চলিক সরকারি হাঁস প্রজনন কেন্দ্রে। বছরের পর বছর ধরে নষ্ট ইনকিউবেটর।

অথচ দাফতরিক কাগজপত্রে গত ৬ মাসে সেখানে উৎপাদিত হয়েছে ১১ হাজার ৩৮২টি বাচ্চা। শুধু তাই নয় সেইসব বাচ্চা বিক্রি থেকে পাওয়া যাচ্ছে অর্থ। এমনতর গায়েবি তথ্য উপস্থাপন করে এটিকে উৎপাদনশীল দেখাতে জোটবদ্ধ মাগুরার প্রাণিসম্পদ বিভাগ। এতে সুফল থেকে একেবারেই বঞ্চিত হচ্ছে স্থানীয় হাঁস খামারিরা।

তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, ২০০২ সালে মাগুরা-ফরিদপুর মহাসড়কের পাশে বেলনগর এলাকায় ৩ একর ১৮ শতাংশ জমির উপর স্থাপিত হয় ‘মাগুরা হাঁস পালন কেন্দ্র’। প্রায় ৩০ কোটি টাকা ব্যায়ে স্থাপিত খামারটি জনবল সংকটের কারণে কখনই কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি। অথচ ২০১৩ সনে প্রকল্পটির মেয়াদ শেষ হয়ে যায়।

এ অবস্থায় আরও প্রায় ৭০ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়ে এটিকে ‘আঞ্চলক হাঁস প্রজনন কেন্দ্র’ নাম দিয়ে নতুন প্রকল্পের মাধ্যমে চালুর উদ্যোগ নেয়া হয়। ইতোমধ্যে কেন্দ্রটিকে রাজস্ব খাতে স্থানান্তরিত করা হয়েছে। কিন্তু অবস্থা সেই আগের মতোই। চালু করা যায়নি বাচ্চা উৎপাদনের ইনকিউবেটর মেশিন। বিধায় স্থানীয় খামারিরা মাগুরার বাইরে দূরদূরান্তের বেসরকারি খামার থেকে বাচ্চা সংগ্রহ করতে বাধ্য হচ্ছে।

মাগুরার সদর উপজেলার চানপুর গ্রামের হাঁস খামারি সোহেল আহমেদ। লেখাপড়ার পাশাপাশি তিনি ৪ শত হাঁস নিয়ে নিজ গ্রামে খামারটি তৈরি করেছেন। তিনি বলেন, মাগুরার সরকারি হাঁস প্রজনন কেন্দ্রে গিয়েছিলাম। কিন্তু মেশিন নষ্টের কথা বলে তারা বাচ্চা দেয়নি। বাধ্য হয়ে খুলনা থেকে বাচ্চা সংগ্রহ করতে হয়েছে।

একই অভিযোগ মঘি গ্রামের হাঁস খামারি আকিদুল ইসলামের। তিনি বলেন, এক হাজার হাঁস দিয়ে খামার তৈরি করেছি। কিন্তু সরকারি প্রজনন কেন্দ্র থেকে কোনো সহযোগিতা পাওয়া যায়নি। অনেক খরচ করে বাচ্চা আনতে হয় দর্শনা থেকে।

শহরের পারনান্দুয়ালি এলাকার বাসিন্দা সিরাজুল ইসলাম সবুজ বলেন, এখানে শুধু ডিম বিক্রি চলে। বাচ্চা ফোটানো হয় না। কেউ চাহিদা দিলে বাইরে থেকে বাচ্চা এনে দেয়া হবে বলে জানান তারা।

এসব অভিযোগ নিয়ে আঞ্চলিক হাঁস প্রজনন কেন্দ্রের দায়িত্বরত সদর উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা আনোয়ারুল করিমের সঙ্গে কথা হলে তিনি অভিযোগ অসত্য বলে দাবি করেন। বরং নিয়মিত বাচ্চা উৎপাদিত হচ্ছে এমন একটি হিসাব খাতা উপস্থাপন করেন। গত মার্চ মাসের ১৪ তারিখ থেকে ২১ আগস্ট পর্যন্ত মোট ১১ হাজার ৩৮২টি বাচ্চা উৎপাদিত হয়েছে বলে নথিপত্র দেখান। এর অনুকূলে সরকারি কোষাগারে ২ লাখ ২৭ হাজার ৬৪০ টাকাও ট্রেজারি চালানের মাধ্যমে জমা করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।

এদিকে সরেজমিনে মাগুরা আঞ্চলিক হাঁস প্রজনন কেন্দ্রে গেলে স্থানীয় খামারিদের বক্তব্যের সত্যতা পাওয়া যায়। দেখা যায় ১১টি ছোট বড় ভবনের অধিকাংশই পরিত্যক্ত। বিভিন্ন কক্ষে হাঁস থাকলেও বাচ্চার নমুনা নেই কোথায়ও। ইনকিউবেটর কক্ষটি অন্ধকার। পরিত্যক্ত পড়ে আছে।

বাচ্চা উৎপাদনের বিষয়ে সেখানে কর্মরতদের সঙ্গে কথা বলে নানা অসঙ্গতি ধরা পড়ে। হ্যাচারি এটেনডেন্ট জাহিদুল ইসলামের সঙ্গে কথা বলতে গেলে তাকে থামিয়ে দেন দায়িত্বরত উপ-সহকারী প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা আবু সোহেল মোহাম্মদ আরিফ।

তবে মনির হোসেন নামে অপর একজন কর্মচারী বলেন, গত বছর ডিসেম্বরের ৪ তারিখে প্রজনন কেন্দ্রে যোগদান করেছি। কিন্তু মেশিন নষ্ট থাকায় একদিনও বাচ্চা উৎপাদনের সুযোগ পাওয়া যায়নি।

অন্যদিকে কেন্দ্রটিতে ৫শ হাঁস পালনের অনুমোদন এবং খাদ্য বরাদ্দ দেয়া হলেও সেখানে ৬শ হাঁসের বেশি রেখে ডিম উৎপাদন করা হচ্ছে বলে স্বীকার করেন সেখানে কর্মরত আশরাফুল ইসলামসহ অপরাপর কর্মচারীরা।

তবে মাগুরা প্রাণিসম্পদ বিভাগ সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, এখানে অনুমোদনের বাইরে অধিক সংখ্যক হাঁস পালন করা হচ্ছে। যা থেকে পাওয়া অতিরিক্ত ডিম বিক্রির অর্থ সরকারি খাতায় বাচ্চা বিক্রির বলে সমন্বয় করা হচ্ছে। নিজেদের চাকরি বহাল রাখতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা কর্মচারীরা এসব আজগুবি তথ্য উপস্থাপন করে প্রতারণা করছে সরকারের সঙ্গে। ঠকিয়ে আসছে সাধারণ মানুষকেও।

এ বিষয়ে মাগুরা জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. হাদিউজ্জামানের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ প্রকাশ করেন। হাঁস প্রজনন কেন্দ্রের কাজের সঙ্গে তার কোনো সম্পৃক্ততা নেই উল্লেখ করলেও এ ধরণের সংবাদ প্রকাশ থেকে বিরত থাকার অনুরোধ করেন তিনি।

শতকোটি টাকার হাঁস প্রজনন কেন্দ্রের বাচ্চা ফোটে কাগজে-কলমে

 আবু বাসার আখন্দ, মাগুরা  
২৬ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০৮:২৬ পিএম  |  অনলাইন সংস্করণ

মাগুরায় বাচ্চা ফোটে না ১০০ কোটি টাকা ব্যায়ে স্থাপিত আঞ্চলিক সরকারি হাঁস প্রজনন কেন্দ্রে। বছরের পর বছর ধরে নষ্ট ইনকিউবেটর। 

অথচ দাফতরিক কাগজপত্রে গত ৬ মাসে সেখানে উৎপাদিত হয়েছে ১১ হাজার ৩৮২টি বাচ্চা। শুধু তাই নয় সেইসব বাচ্চা বিক্রি থেকে পাওয়া যাচ্ছে অর্থ। এমনতর গায়েবি তথ্য উপস্থাপন করে এটিকে উৎপাদনশীল দেখাতে জোটবদ্ধ মাগুরার প্রাণিসম্পদ বিভাগ। এতে সুফল থেকে একেবারেই বঞ্চিত হচ্ছে স্থানীয় হাঁস খামারিরা।

তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, ২০০২ সালে মাগুরা-ফরিদপুর মহাসড়কের পাশে বেলনগর এলাকায় ৩ একর ১৮ শতাংশ জমির উপর স্থাপিত হয় ‘মাগুরা হাঁস পালন কেন্দ্র’। প্রায় ৩০ কোটি টাকা ব্যায়ে স্থাপিত খামারটি জনবল সংকটের কারণে কখনই কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি। অথচ ২০১৩ সনে প্রকল্পটির মেয়াদ শেষ হয়ে যায়। 

এ অবস্থায় আরও প্রায় ৭০ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়ে এটিকে ‘আঞ্চলক হাঁস প্রজনন কেন্দ্র’ নাম দিয়ে নতুন প্রকল্পের মাধ্যমে চালুর উদ্যোগ নেয়া হয়। ইতোমধ্যে কেন্দ্রটিকে রাজস্ব খাতে স্থানান্তরিত করা হয়েছে। কিন্তু অবস্থা সেই আগের মতোই। চালু করা যায়নি বাচ্চা উৎপাদনের ইনকিউবেটর মেশিন। বিধায় স্থানীয় খামারিরা মাগুরার বাইরে দূরদূরান্তের বেসরকারি খামার থেকে বাচ্চা সংগ্রহ করতে বাধ্য হচ্ছে।

মাগুরার সদর উপজেলার চানপুর গ্রামের হাঁস খামারি সোহেল আহমেদ। লেখাপড়ার পাশাপাশি তিনি ৪ শত হাঁস নিয়ে নিজ গ্রামে খামারটি তৈরি করেছেন। তিনি বলেন, মাগুরার সরকারি হাঁস প্রজনন কেন্দ্রে গিয়েছিলাম। কিন্তু মেশিন নষ্টের কথা বলে তারা বাচ্চা দেয়নি। বাধ্য হয়ে খুলনা থেকে বাচ্চা সংগ্রহ করতে হয়েছে।

একই অভিযোগ মঘি গ্রামের হাঁস খামারি আকিদুল ইসলামের। তিনি বলেন, এক হাজার হাঁস দিয়ে খামার তৈরি করেছি। কিন্তু সরকারি প্রজনন কেন্দ্র থেকে কোনো সহযোগিতা পাওয়া যায়নি। অনেক খরচ করে বাচ্চা আনতে হয় দর্শনা থেকে।

শহরের পারনান্দুয়ালি এলাকার বাসিন্দা সিরাজুল ইসলাম সবুজ বলেন, এখানে শুধু ডিম বিক্রি চলে। বাচ্চা ফোটানো হয় না। কেউ চাহিদা দিলে বাইরে থেকে বাচ্চা এনে দেয়া হবে বলে জানান তারা। 

এসব অভিযোগ নিয়ে আঞ্চলিক হাঁস প্রজনন কেন্দ্রের দায়িত্বরত সদর উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা আনোয়ারুল করিমের সঙ্গে কথা হলে তিনি অভিযোগ অসত্য বলে দাবি করেন। বরং নিয়মিত বাচ্চা উৎপাদিত হচ্ছে এমন একটি হিসাব খাতা উপস্থাপন করেন। গত মার্চ মাসের ১৪ তারিখ থেকে ২১ আগস্ট পর্যন্ত মোট ১১ হাজার ৩৮২টি বাচ্চা উৎপাদিত হয়েছে বলে নথিপত্র দেখান। এর অনুকূলে সরকারি কোষাগারে ২ লাখ ২৭ হাজার ৬৪০ টাকাও ট্রেজারি চালানের মাধ্যমে জমা করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।

এদিকে সরেজমিনে মাগুরা আঞ্চলিক হাঁস প্রজনন কেন্দ্রে গেলে স্থানীয় খামারিদের বক্তব্যের সত্যতা পাওয়া যায়। দেখা যায় ১১টি ছোট বড় ভবনের অধিকাংশই পরিত্যক্ত। বিভিন্ন কক্ষে হাঁস থাকলেও বাচ্চার নমুনা নেই কোথায়ও। ইনকিউবেটর কক্ষটি অন্ধকার। পরিত্যক্ত পড়ে আছে।

বাচ্চা উৎপাদনের বিষয়ে সেখানে কর্মরতদের সঙ্গে কথা বলে নানা অসঙ্গতি ধরা পড়ে। হ্যাচারি এটেনডেন্ট জাহিদুল ইসলামের সঙ্গে কথা বলতে গেলে তাকে থামিয়ে দেন দায়িত্বরত উপ-সহকারী প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা আবু সোহেল মোহাম্মদ আরিফ। 

তবে মনির হোসেন নামে অপর একজন কর্মচারী বলেন, গত বছর ডিসেম্বরের ৪ তারিখে প্রজনন কেন্দ্রে যোগদান করেছি। কিন্তু মেশিন নষ্ট থাকায় একদিনও বাচ্চা উৎপাদনের সুযোগ পাওয়া যায়নি।

অন্যদিকে কেন্দ্রটিতে ৫শ হাঁস পালনের অনুমোদন এবং খাদ্য বরাদ্দ দেয়া হলেও সেখানে ৬শ হাঁসের বেশি রেখে ডিম উৎপাদন করা হচ্ছে বলে স্বীকার করেন সেখানে কর্মরত আশরাফুল ইসলামসহ অপরাপর কর্মচারীরা।

তবে মাগুরা প্রাণিসম্পদ বিভাগ সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, এখানে অনুমোদনের বাইরে অধিক সংখ্যক হাঁস পালন করা হচ্ছে। যা থেকে পাওয়া অতিরিক্ত ডিম বিক্রির অর্থ সরকারি খাতায় বাচ্চা বিক্রির বলে সমন্বয় করা হচ্ছে। নিজেদের চাকরি বহাল রাখতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা কর্মচারীরা এসব আজগুবি তথ্য উপস্থাপন করে প্রতারণা করছে সরকারের সঙ্গে। ঠকিয়ে আসছে সাধারণ মানুষকেও।

এ বিষয়ে মাগুরা জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. হাদিউজ্জামানের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ প্রকাশ করেন। হাঁস প্রজনন কেন্দ্রের কাজের সঙ্গে তার কোনো সম্পৃক্ততা নেই উল্লেখ করলেও এ ধরণের সংবাদ প্রকাশ থেকে বিরত থাকার অনুরোধ করেন তিনি।
 

 
জেলার খবর
অনুসন্ধান করুন