মেশিন ছুঁলেই ৪২ স্বাস্থ্য পরীক্ষার রিপোর্ট!
jugantor
চিকিৎসার নামে অভিনব প্রতারণা
মেশিন ছুঁলেই ৪২ স্বাস্থ্য পরীক্ষার রিপোর্ট!

  আখতারুজ্জামান আখতার, পাবনা  

২২ অক্টোবর ২০২০, ২২:১৫:২৫  |  অনলাইন সংস্করণ

অষ্টম শ্রেণি পাস করা ইএনটি স্পেশালিস্ট সাহেব আলী ওরফে শান্ত এবং ভুয়া (আল্ট্রাসনোলজিস্ট) এমবিবিএস চিকিৎসক মাসুদ করিম আটকের পর এবার পাবনায় ধরা পড়ল এসএসসি পাস প্রতারক চিকিৎসক এমএ আকবর।

এই আকবরের রয়েছে এক অভিনব এবং আশ্চর্যজনক চিকিৎসা মেশিন। তার মেশিনে হাত রাখামাত্র কম্পিউটার মনিটরে উঠে আসছে মানবদেহের মস্তিষ্ক থেকে শুরু করে হার্ট, কিডনি, ফুসফুসসহ শরীরের ৪২ প্রকারের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ও শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়ার অবস্থা।

তাৎক্ষণিক দেয়া রিপোর্টে চিকিৎসাপত্রসহ ধরিয়ে দেয়া হচ্ছে সাত থেকে ১০ হাজার টাকার ওষুধ। হাতের চাপে মুহূর্তেই এমন পরীক্ষা ও সে অনুযায়ী চিকিৎসা প্রদান করে রীতিমতো খ্যাতিও অর্জন করেন অনেক নিরীহ সাধারণ মানুষের কাছে।

স্বাস্থ্য বিভাগের কোনো অনুমোদন ছাড়াই পাবনার পৌর এলাকার থানাপাড়ায় চিকিৎসার নামে দীর্ঘদিন ধরে এ অভিনব কায়দায় প্রতারণা করে আসছিল ইউনি ওয়ার্ল্ড সার্ভিস লিমিটেড নামের একটি প্রতিষ্ঠান। সেখানে অভিযান চালিয়ে প্রতিষ্ঠানের মালিক ও চেয়ারম্যান এমএ আকবরকে আটক করে পুলিশ।

বৃহস্পতিবার বিকালে এ ঘটনায় সদর থানার এসআই জহরুল ইসলাম বাদী হয়ে বিশেষ ক্ষমতা আইনে ও স্বাস্থ্যকর্মী জাকির হোসেন বাদী হয়ে সদর থানায় প্রতারণা মামলা দায়ের করেন। পরে বিকালে এমএ আকবরকে আদালতের মাধ্যমে জেলহাজতে পাঠানো হয়।

ভুক্তভোগীরা জানান, এক বছর ধরে পাবনা শহরের থানাপাড়ায় একটি ভবনের চারতলার তিনটি ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে এমন প্রতারণার ফাঁদ খুলে বসেন শহরের নয়নামতি এলাকার আকবর হোসেন ও তার সহযোগীরা। পাবনা সদর উপজেলার দাপুনিয়া বিবি দাখিল মাদ্রাসা থেকে এসএসসি সমমান পরীক্ষায় পাস করে নিজেকে চিকিৎসক পরিচয় দিয়ে ইউনানি ও অ্যালোপ্যাথিক পদ্ধতির চিকিৎসাও দেন আকবর হোসেন।

শুধু তাই নয়, আকর্ষণীয় বেতনের লোভ দেখিয়ে জামানত নিয়ে প্রায় অর্ধশত নারী-পুরুষকে নিয়োগ দেয় তার ইউনি হেলথ সার্ভিস নামের প্রতিষ্ঠানটি। স্বাস্থ্যকর্মীদের মাধ্যমে আসা প্রতিটি রোগীর জন্য আকর্ষণীয় কমিশনের আশ্বাসও দেয় কর্তৃপক্ষ।

ইউনি ওয়ার্ল্ড সার্ভিসের স্বাস্থ্যকর্মী আবু তালেব, মনিরা, নাদিরা, আফরিন, শারমিন, সালমা, নাজমুল, আজিজুল, ফারজানা লাবণী জানান, কর্তৃপক্ষের কথায় বিশ্বাস করে আমরা অনেক স্বজন ও প্রতিবেশীদের চিকিৎসা গ্রহণের জন্য রাজি করিয়ে এ চিকিৎসা কেন্দ্রে নিয়ে আসি। হাতের স্ক্যান পরীক্ষার জন্য এক হাজার টাকা ও পরে প্যাকেজ চিকিৎসায় ওষুধ বাবদ আট থেকে ১০ হাজার টাকা করে নেয়া হয় তাদের কাছ থেকে।

তারা বলেন, ওষুধের কোর্স সম্পন্নের পরও কোনো রোগীরই স্বাস্থ্যের উন্নতি না হওয়ায় তারা আমাদের নানা প্রশ্ন করেন। এতে আমাদেরও সন্দেহের সৃষ্টি হয়। স্বাস্থ্যকর্মীদের চুক্তিমাফিক বেতন না দিয়েও নানা টালবাহানা করেন। এমতাবস্থায় মিডিয়া কর্মীদের মাধ্যমে বিষয়টি জানাজানি হলে বুধবার রাতে সদর থানা পুলিশ এসে প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার আকবরকে আটক করে নিয়ে যায়।

পাবনা সদর থানার ওসি নাসিম আহমেদ জানান, প্রতিষ্ঠানের মালিক এমএ আকবর স্বাস্থ্যসেবা প্রদান কিংবা পরীক্ষার কোনো অনুমোদনপত্র দেখাতে ব্যর্থ হন। তিনি মাদ্রাসা থেকে এসএসসি সমমান পরীক্ষায় পাস করে কীভাবে নামের আগে ডাক্তার লিখে চিকিৎসা দিচ্ছেন তারও সদুত্তর দিতে পারেননি। প্রাথমিকভাবে আমাদের কাছে প্রতিষ্ঠানটি ভুয়া ও প্রতারক চক্রের কাজ বলে মনে হয়েছে। বিস্তারিত জিজ্ঞাসাবাদের পর আমরা প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেব।

কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ প্রফেসর ডা. ইফতেখার মাহমুদ বলেন, হাতের স্পর্শের মাধ্যমে একসঙ্গে ৪২টি পরীক্ষার এমন কোনো মেশিন চিকিৎসা বিজ্ঞানে আছে বলে আমার জানা নেই। বিষয়টি একেবারেই অবাস্তব।

পাবনার সিভিল সার্জন ডা. মেহেদী ইকবাল জানান, ইউনি ওয়ার্ল্ড সার্ভিস নামে কোনো স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের সম্পর্কে জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ অবগত নয়। তাদের আইনবহির্ভূত কর্মকাণ্ডের বিষয়ে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।

তবে অনুমোদন ছাড়াই এতদিন এ প্রতারণামূলক চিকিৎসা কীভাবে চলছে- সে বিষয়ে তিনি কোনো উত্তর দেননি।

এদিকে প্রতারক এমএ আকবর আটক হওয়ার খবরের পর বৃহস্পতিবার দুপুর থেকে প্রতারিত অসংখ্য নারী-পুরুষ ইউনি ওয়ার্ল্ড অফিসে ভিড় করেন। তারা প্রতারক আকবরের বিচার এবং টাকা ফেরত চান।

প্রসঙ্গত, সম্প্রতি দৈনিক যুগান্তরের অনুসন্ধানী রিপোর্টে পাবনায় ভুয়া ইএনটি স্পেশালিস্ট ডা. সাহেব আলী শান্ত এবং ভুয়া (আল্ট্রাসনোলজিস্ট) এমবিবিএস চিকিৎসক মাসুদ করিমের প্রতারণার বিষয়টি ফাঁস হয়। এরপর শান্ত রাতের অন্ধকারে পালিয়ে যান এবং মাসুদ করিম পুলিশের হাতে আটক হন। মাসুদ করিম পাবনা বিএমএর আজীবন সদস্যপদও অর্জন করেছিলেন।

চিকিৎসার নামে অভিনব প্রতারণা

মেশিন ছুঁলেই ৪২ স্বাস্থ্য পরীক্ষার রিপোর্ট!

 আখতারুজ্জামান আখতার, পাবনা 
২২ অক্টোবর ২০২০, ১০:১৫ পিএম  |  অনলাইন সংস্করণ

অষ্টম শ্রেণি পাস করা ইএনটি স্পেশালিস্ট সাহেব আলী ওরফে শান্ত এবং ভুয়া (আল্ট্রাসনোলজিস্ট) এমবিবিএস চিকিৎসক মাসুদ করিম আটকের পর এবার পাবনায় ধরা পড়ল এসএসসি পাস প্রতারক চিকিৎসক এমএ আকবর।

এই আকবরের রয়েছে এক অভিনব এবং আশ্চর্যজনক চিকিৎসা মেশিন। তার মেশিনে হাত রাখামাত্র কম্পিউটার মনিটরে উঠে আসছে মানবদেহের মস্তিষ্ক থেকে শুরু করে হার্ট, কিডনি, ফুসফুসসহ শরীরের ৪২ প্রকারের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ও শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়ার অবস্থা।

তাৎক্ষণিক দেয়া রিপোর্টে চিকিৎসাপত্রসহ ধরিয়ে দেয়া হচ্ছে সাত থেকে ১০ হাজার টাকার ওষুধ। হাতের চাপে মুহূর্তেই এমন পরীক্ষা ও সে অনুযায়ী চিকিৎসা প্রদান করে রীতিমতো খ্যাতিও অর্জন করেন অনেক নিরীহ সাধারণ মানুষের কাছে।

স্বাস্থ্য বিভাগের কোনো অনুমোদন ছাড়াই পাবনার পৌর এলাকার থানাপাড়ায় চিকিৎসার নামে দীর্ঘদিন ধরে এ অভিনব কায়দায় প্রতারণা করে আসছিল ইউনি ওয়ার্ল্ড সার্ভিস লিমিটেড নামের একটি প্রতিষ্ঠান। সেখানে অভিযান চালিয়ে প্রতিষ্ঠানের মালিক ও  চেয়ারম্যান এমএ আকবরকে আটক করে পুলিশ।

বৃহস্পতিবার বিকালে এ ঘটনায় সদর থানার এসআই জহরুল ইসলাম বাদী হয়ে বিশেষ ক্ষমতা আইনে ও স্বাস্থ্যকর্মী জাকির হোসেন বাদী হয়ে সদর থানায় প্রতারণা মামলা দায়ের করেন। পরে বিকালে এমএ আকবরকে আদালতের মাধ্যমে জেলহাজতে পাঠানো হয়।

ভুক্তভোগীরা জানান, এক বছর ধরে পাবনা শহরের থানাপাড়ায় একটি ভবনের চারতলার তিনটি ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে এমন প্রতারণার ফাঁদ খুলে বসেন শহরের নয়নামতি এলাকার আকবর হোসেন ও তার সহযোগীরা। পাবনা সদর উপজেলার দাপুনিয়া বিবি দাখিল মাদ্রাসা থেকে এসএসসি সমমান পরীক্ষায় পাস করে নিজেকে চিকিৎসক পরিচয় দিয়ে ইউনানি ও অ্যালোপ্যাথিক পদ্ধতির চিকিৎসাও দেন আকবর হোসেন।

শুধু তাই নয়, আকর্ষণীয় বেতনের লোভ দেখিয়ে জামানত নিয়ে প্রায় অর্ধশত নারী-পুরুষকে নিয়োগ দেয় তার ইউনি হেলথ সার্ভিস নামের প্রতিষ্ঠানটি। স্বাস্থ্যকর্মীদের মাধ্যমে আসা প্রতিটি রোগীর জন্য আকর্ষণীয় কমিশনের আশ্বাসও দেয় কর্তৃপক্ষ।

ইউনি ওয়ার্ল্ড সার্ভিসের স্বাস্থ্যকর্মী আবু তালেব, মনিরা, নাদিরা, আফরিন, শারমিন, সালমা, নাজমুল, আজিজুল, ফারজানা লাবণী জানান, কর্তৃপক্ষের কথায় বিশ্বাস করে আমরা অনেক স্বজন ও প্রতিবেশীদের চিকিৎসা গ্রহণের জন্য রাজি করিয়ে এ চিকিৎসা কেন্দ্রে নিয়ে আসি। হাতের স্ক্যান পরীক্ষার জন্য এক হাজার টাকা ও পরে প্যাকেজ চিকিৎসায় ওষুধ বাবদ আট থেকে ১০ হাজার টাকা করে নেয়া হয় তাদের কাছ থেকে।

তারা বলেন, ওষুধের কোর্স সম্পন্নের পরও কোনো রোগীরই স্বাস্থ্যের উন্নতি না হওয়ায় তারা আমাদের নানা প্রশ্ন করেন। এতে আমাদেরও সন্দেহের সৃষ্টি হয়। স্বাস্থ্যকর্মীদের চুক্তিমাফিক বেতন না দিয়েও নানা টালবাহানা করেন। এমতাবস্থায় মিডিয়া কর্মীদের মাধ্যমে বিষয়টি জানাজানি হলে বুধবার রাতে সদর থানা পুলিশ এসে প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার আকবরকে আটক করে নিয়ে যায়।

পাবনা সদর থানার ওসি নাসিম আহমেদ জানান, প্রতিষ্ঠানের মালিক এমএ আকবর স্বাস্থ্যসেবা প্রদান কিংবা পরীক্ষার কোনো অনুমোদনপত্র দেখাতে ব্যর্থ হন। তিনি মাদ্রাসা থেকে এসএসসি সমমান পরীক্ষায় পাস করে কীভাবে নামের আগে ডাক্তার লিখে চিকিৎসা দিচ্ছেন তারও সদুত্তর দিতে পারেননি। প্রাথমিকভাবে আমাদের কাছে প্রতিষ্ঠানটি ভুয়া ও প্রতারক চক্রের কাজ বলে মনে হয়েছে। বিস্তারিত জিজ্ঞাসাবাদের পর আমরা প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেব।

কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ প্রফেসর ডা. ইফতেখার মাহমুদ বলেন, হাতের স্পর্শের মাধ্যমে একসঙ্গে ৪২টি পরীক্ষার এমন কোনো মেশিন চিকিৎসা বিজ্ঞানে আছে বলে আমার জানা নেই। বিষয়টি একেবারেই অবাস্তব।

পাবনার সিভিল সার্জন ডা. মেহেদী ইকবাল জানান, ইউনি ওয়ার্ল্ড সার্ভিস নামে কোনো স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের সম্পর্কে জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ অবগত নয়। তাদের আইনবহির্ভূত কর্মকাণ্ডের বিষয়ে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।

তবে অনুমোদন ছাড়াই এতদিন এ প্রতারণামূলক চিকিৎসা কীভাবে চলছে- সে বিষয়ে তিনি কোনো উত্তর দেননি।

এদিকে প্রতারক এমএ আকবর আটক হওয়ার খবরের পর বৃহস্পতিবার দুপুর থেকে প্রতারিত অসংখ্য নারী-পুরুষ ইউনি ওয়ার্ল্ড অফিসে ভিড় করেন। তারা প্রতারক আকবরের বিচার এবং টাকা ফেরত চান।

প্রসঙ্গত, সম্প্রতি দৈনিক যুগান্তরের অনুসন্ধানী রিপোর্টে পাবনায় ভুয়া ইএনটি স্পেশালিস্ট ডা. সাহেব আলী শান্ত এবং ভুয়া (আল্ট্রাসনোলজিস্ট) এমবিবিএস চিকিৎসক মাসুদ করিমের প্রতারণার বিষয়টি ফাঁস হয়। এরপর শান্ত রাতের অন্ধকারে পালিয়ে যান এবং মাসুদ করিম পুলিশের হাতে আটক হন। মাসুদ করিম পাবনা বিএমএর আজীবন সদস্যপদও অর্জন করেছিলেন।

 
জেলার খবর
অনুসন্ধান করুন