‘গুজব ছড়িয়েই সেই ব্যক্তিকে হত্যা করা হয়’
jugantor
‘গুজব ছড়িয়েই সেই ব্যক্তিকে হত্যা করা হয়’

  মো. মিজানুর রহমান দুলাল, লালমনিরহাট প্রতিনিধি  

৩১ অক্টোবর ২০২০, ১৯:১০:৩৬  |  অনলাইন সংস্করণ

সহিদুন্নবী জুয়েল

লালমনিরহাটের পাটগ্রাম উপজেলার বুড়িমারীতে মানসিকভাবে বিধ্বস্ত ব্যক্তি ইউনুস মো. সহিদুন্নবী জুয়েলকে (৫০) ‘কোরআন অবমাননার’ গুজব ছড়িয়ে পিটিয়ে ও আগুনে পুড়িয়ে মারার ঘটনায় পৃথক-পৃথক ৩টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। গুজবের বলি হওয়া জুয়েল রংপুর শহরের শালবন মিস্ত্রি পাড়ার আবু ওয়াজেদ মিয়ার ছেলে।

শনিবার ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে পাটগ্রামের শহীদ আফজাল হোসেন মিলনায়তনে উপজেলার বিভিন্ন মসজিদের ঈমাম, মুয়াজ্জিন ও খাদেমসহ বিভিন্ন লোকের সাথে মতবিনিময় করেছেন রংপুর বিভাগীয় কমিশনার আব্দুল ওহাব ভুঁইয়া ও রংপুর পুলিশের ডিআইজি দেবদাস ভট্রাচার্জ। এসময় লালমনিরহাট জেলা প্রশাসক আবু জাফর, পুলিশ সুপার আবিদা সুলতানাসহ প্রশাসনের বিভিন্ন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

মতবিনিময় শেষে রংপুর বিভাগীয় কমিশনার আব্দুল ওহাব ভুইঁয়া ও পুলিশের ডিআইজি দেবদাস ভট্টাচার্জ সাংবাদিকদের বলেন, ওই ঘটনায় ৩ টি মামলা হয়েছে। আর ঘটনার সাথে যারাই জড়িত থাক না কেন, তাদেরকে ছাড় দেয়া হবেনা বলেও জানিয়েছেন প্রশাসনের ওই উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।

কে এই জুয়েল?

জানা গেছে, বুড়িমারীতে নিহত আবু ইউনুস মো. সহিদুন্নবী জুয়েল রংপুর ক্যান্টমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের গ্রন্থাগার বিভাগে কর্মরত ছিলেন। এক বছর আগে তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠায় প্রতিষ্ঠানটি।

জুয়েলের বড় মেয়ে এবছর এইচএসসি পাস করেছে। আর এক ছেলে ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে পড়াশোনা করছে।

নিহত জুয়েল দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহকারী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান (অব.) সাইকিয়াট্রি ডা. রফিকুল ইসলামের কাছে চিকিৎসাধীন ছিলেন।

সেদিন কী হয়েছিল?

পাটগ্রামের বুড়িমারীর ওই ঘটনাস্থলে গিয়ে জানা গেছে, গত বৃহস্পতিবার আসরের নামাজ শেষে মোটরসাইকেলে করে রংপুর থেকে আসা সহিদুন্নবী জুয়েল নিজেকে র‌্যাব পরিচয় দিয়ে বুড়িমারী কেন্দ্রীয় বাজার জামে মসজিদের খাদেম জোবেদ আলীকে মসজিদের সেলফে অস্ত্র আছে বলে তল্লাশি চালাতে থাকে। এসময় ওই সেলফে থাকা একটি কোরআন শরীফ হঠাৎ করে সহিদুন্নবীর পায়ের কাছে পরে গেলে ঘটনার সূত্রপাত হয়।

ওই সময় মসজিদের ভিতরে এবং বাইরে থাকা মুসল্লীরা জুয়েলের ওপর চড়াও হয়। এ খবর মুহূর্তেই বাইরে ছড়িয়ে পড়লে বুড়িমারী বাজারের লোকজন মসজিদের দিকে ছুটতে থাকেন। এসময় স্থানীয় বুড়িমারী ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য হাফিজুল ইসলাম ওই দুই ব্যক্তিকে বুড়িমারী ইউনিয়ন পরিষদে নিরাপদে সরিয়ে নেন। এরপর বুড়িমারী ইউনিয়ন পরিষদে স্থানীয় লোকজন জড়ো হয়ে ঘটনাটিকে ভিন্নভাবে নিয়ে বিক্ষোভ করতে থাকেন।

খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন পাটগ্রাম উপজেলা নির্বাহী অফিসার, পাটগ্রাম উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান, পাটগ্রাম থানার অফিসার ইনচার্জ ও বুড়িমারী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান। তারা উপস্থিত হয়ে বিক্ষুব্ধ মানুষকে শান্ত করার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন। এসময় বিক্ষুব্ধ লোকজন বুড়িমারী ইউনিয়ন পরিষদের ভবনের সুরম্য দেয়াল, গ্রীল এবং দরজা ভেঙে সহিদুন্নবী জুয়েলকে পেটাতে-পেটাতে বাহির করে নিয়ে আসে।

একপর্যায়ে সেখানেই তিনি মারা যান। এরপর তার লাশ রশিতে বেঁধে টেনে নিয়ে গিয়ে ইউনিয়ন পরিষদ থেকে ৫’শ গজ দুরে জয় ট্রেডার্সের সামনে প্রথম বাঁশকল এলাকায় পেট্রোল ঢেলে আগুনে পুড়িয়ে ফেলে। এই অবস্থায় পাটগ্রাম থানার ওসি আহত সুলতান জোবায়েত আব্বাসকে ইউনিয়ন পরিষদের ছাদ বেয়ে সেখান থেকে তাকে নিরাপদে সরিয়ে নেন। পরে বিক্ষুব্ধ লোকজন ইউনিয়ন পরিষদে ব্যাপক ভাঙচুর চালিয়ে সেখানে অগ্নিসংযোগ করে। এসময় একটি মোটরসাইকেলে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়।

উত্তেজিত লোকজনের হাত থেকে নিরাপদে সরে যান উপজেলা নির্বাহী অফিসার কামরুন নাহার, পাটগ্রাম উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান রহুল আমিন বাবুল ও বুড়িমারী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবু সাঈদ শাহ নেওয়াজ নিশাত।

খবর পেয়ে লালমনিরহাট জেলা প্রশাসক আবু জাফর, পুলিশ সুপার আবিদা সুলতানা ঘটনাস্থলে ছুটে যান। পাশাপাশি ঘটনাস্থলে অতিরিক্ত পুলিশ গিয়ে প্রায় সাড়ে ৫ ঘন্টার পর উত্তেজিত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হন।

এদিকে গত শুক্রবার জুম্মার নামাজের আগে ওই মসজিদের খাদেম জোবেদ আলীর কাছে জানতে চাইলে তিনি ঘটনা সম্পর্কে বলেন, ‘ওইদিন আছরের নামাজ শেষে এক ব্যক্তি নিজেকে র‌্যাব পরিচয়ে মসজিদের সেলফে অস্ত্র আছে বলে তল্লাশি করতে থাকে। এসময় একটি কোরআন শরীফ তার পায়ের নিকট পড়ে গেলে উপস্থিত কয়েকজন মুসল্লীর সঙ্গে তার কথা কাটাকাটি শুরু হয়। এক পর্যায়ে মেম্বার হাফিজুর এসে তাকে ইউনিয়ন পরিষদে নিয়ে যান’।

বুড়িমারী ইউনিয়নের ১নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য হাফিজুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, উত্তেজিত মানুষের হাত থেকে রক্ষা করতে ওই দুই ব্যক্তিকে ইউনিয়ন পরিষদে এনে তালাবদ্ধ করে রাখি। এরপর উত্তেজিত পরিস্থিতির বিষয়টি ইউএনও, উপজেলা চেয়ারম্যান, পুলিশ এবং ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানকে সংবাদ দেই।

গুজব ছড়িয়ে হত্যা

লালমনিরহাটের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. রবিউল ইসলাম শুক্রবার সকালে সাংবাদিকদের বলেন, মসজিদের কোরআন শরীফ হয়তো তার পায়ের ওপর পড়েছে বলে গুজব রটে। এরপরে লোকজনের সাথে কথা কাটাকাটি হয়। হয়তো তিনি (জুয়েল) বেশিই (রিয়াক্ট) করে ফেলেছিলেন। এরপর উত্তেজিত লোকজন তাদের বাইরে নিয়ে এসে ঘটনাটি ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করলে লোকজন আরো উত্তেজিত হয়। ঘটনাস্থলে পুলিশ পৌঁছলেও তা নিয়ন্ত্রণে নিতে পারেনি।

তিনি আরো বলেন, এ ঘটনায় পুলিশের ১০ জন সদস্য আহত হয়েছেন। তদন্ত কার্যক্রম অব্যাহত আছেও বলে জানান তিনি।

বুড়িমারী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবু সাঈদ নেওয়াজ নিশাত যুগান্তরকে বলেন, আমরা সবাই মিলে অনেক চেষ্টাও করে পরিস্থিতি সামলাতে পারিনি। তারা আমাদের লাঞ্ছিত করে পরিষদের দেয়াল ও গ্রিল ভেঙে একজনকে বের করে পিটিয়ে মেরে ফেলেছে। তারা ইউনিয়ন পরিষদে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ ও লুটপাট চালিয়ে পরিষদে আগুন ধরিয়ে দেয়। আমরা পরিষদের পক্ষ ভিডিও ফুটেজ দেখে থানায় একটি মামলা করেছি।

আবু ইউনুস মোঃ সহিদুন্নবী জুয়েলের শ্যালক মিলন হক তালুকদার (৩৫) শুক্রবার পাটগ্রাম থানা কম্পাউন্ডে কথা হলে তিনি তার দুলাভাইকে একজন সৎ এবং ধার্মিক উল্লেখ করে ঘটনার সুষ্ঠ তদন্ত দাবী করে দায়ী ব্যাক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবী করেন।

নিহত জুয়েলের বড় বোন হাসনা আক্তার লিপি মোবাইলে যুগান্তরকে বলেন, ‘ঘটনার দিন ফজরের নামাজ পরেই জুয়েল বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়। এরপর সকাল সাড়ে ৮টায় তার সাথে শেষ কথা হয়। এসময় জুয়েল তাকে জানান, জরুরি একটি কাজ শেষ করেই বাসায় ফিরবেন। এরপর অনেকবার মোবাইল ফোনে চেষ্টা করা হলেও সে মোবাইল রিসিভ করেনি’।

পাটগ্রাম থানার ওসি সুমন কুমার মহন্ত যুগান্তরকে বলেন, এ ঘটনায় ৩টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে নিহতের পরিবার থেকে একটি হত্যা মামলা, বুড়িমারী ইউনিয়ন পরিষদ থেকে ভাংচুর ও লুটপাটের মামলা এবং পুলিশকে সরকারি কাজে বাধা প্রদানের অভিযোগে আরেটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। শনিবার বিকালে এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত ৫ জনকে আটক করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি।

‘গুজব ছড়িয়েই সেই ব্যক্তিকে হত্যা করা হয়’

 মো. মিজানুর রহমান দুলাল, লালমনিরহাট প্রতিনিধি 
৩১ অক্টোবর ২০২০, ০৭:১০ পিএম  |  অনলাইন সংস্করণ
সহিদুন্নবী জুয়েল
সহিদুন্নবী জুয়েল। ফাইল ছবি

লালমনিরহাটের পাটগ্রাম উপজেলার বুড়িমারীতে মানসিকভাবে বিধ্বস্ত ব্যক্তি ইউনুস মো. সহিদুন্নবী জুয়েলকে (৫০) ‘কোরআন অবমাননার’ গুজব ছড়িয়ে পিটিয়ে ও আগুনে পুড়িয়ে মারার ঘটনায় পৃথক-পৃথক ৩টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। গুজবের বলি হওয়া জুয়েল রংপুর শহরের শালবন মিস্ত্রি পাড়ার আবু ওয়াজেদ মিয়ার ছেলে। 

শনিবার ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে পাটগ্রামের শহীদ আফজাল হোসেন মিলনায়তনে উপজেলার বিভিন্ন মসজিদের ঈমাম, মুয়াজ্জিন ও খাদেমসহ বিভিন্ন লোকের সাথে মতবিনিময় করেছেন রংপুর বিভাগীয় কমিশনার আব্দুল ওহাব ভুঁইয়া ও রংপুর পুলিশের ডিআইজি দেবদাস ভট্রাচার্জ। এসময় লালমনিরহাট জেলা প্রশাসক আবু জাফর, পুলিশ সুপার আবিদা সুলতানাসহ প্রশাসনের বিভিন্ন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। 

মতবিনিময় শেষে রংপুর বিভাগীয় কমিশনার আব্দুল ওহাব ভুইঁয়া ও পুলিশের ডিআইজি দেবদাস ভট্টাচার্জ সাংবাদিকদের বলেন, ওই ঘটনায় ৩ টি মামলা হয়েছে। আর ঘটনার সাথে যারাই জড়িত থাক না কেন, তাদেরকে ছাড় দেয়া হবেনা বলেও জানিয়েছেন প্রশাসনের ওই উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।

কে এই জুয়েল?

জানা গেছে, বুড়িমারীতে নিহত আবু ইউনুস মো. সহিদুন্নবী জুয়েল রংপুর ক্যান্টমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের গ্রন্থাগার বিভাগে কর্মরত ছিলেন।  এক বছর আগে তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠায় প্রতিষ্ঠানটি। 

জুয়েলের বড় মেয়ে এবছর এইচএসসি পাস করেছে। আর এক ছেলে ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে পড়াশোনা করছে।

নিহত জুয়েল দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহকারী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান (অব.) সাইকিয়াট্রি ডা. রফিকুল ইসলামের কাছে চিকিৎসাধীন ছিলেন।  

সেদিন কী হয়েছিল?

পাটগ্রামের বুড়িমারীর ওই ঘটনাস্থলে গিয়ে জানা গেছে, গত বৃহস্পতিবার আসরের নামাজ শেষে মোটরসাইকেলে করে রংপুর থেকে আসা সহিদুন্নবী জুয়েল নিজেকে র‌্যাব পরিচয় দিয়ে বুড়িমারী কেন্দ্রীয় বাজার জামে মসজিদের খাদেম জোবেদ আলীকে মসজিদের সেলফে অস্ত্র আছে বলে তল্লাশি চালাতে থাকে।  এসময় ওই সেলফে থাকা একটি কোরআন শরীফ হঠাৎ করে সহিদুন্নবীর পায়ের কাছে পরে গেলে ঘটনার সূত্রপাত হয়। 

ওই সময় মসজিদের ভিতরে এবং বাইরে থাকা মুসল্লীরা জুয়েলের ওপর চড়াও হয়।  এ খবর মুহূর্তেই বাইরে ছড়িয়ে পড়লে বুড়িমারী বাজারের লোকজন মসজিদের দিকে ছুটতে থাকেন।  এসময় স্থানীয় বুড়িমারী ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য হাফিজুল ইসলাম ওই দুই ব্যক্তিকে বুড়িমারী ইউনিয়ন পরিষদে নিরাপদে সরিয়ে নেন। এরপর বুড়িমারী ইউনিয়ন পরিষদে স্থানীয় লোকজন জড়ো হয়ে ঘটনাটিকে ভিন্নভাবে নিয়ে বিক্ষোভ করতে থাকেন। 

খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন পাটগ্রাম উপজেলা নির্বাহী অফিসার, পাটগ্রাম উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান, পাটগ্রাম থানার অফিসার ইনচার্জ ও বুড়িমারী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান। তারা উপস্থিত হয়ে বিক্ষুব্ধ মানুষকে শান্ত করার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন। এসময় বিক্ষুব্ধ লোকজন বুড়িমারী ইউনিয়ন পরিষদের ভবনের সুরম্য দেয়াল, গ্রীল এবং দরজা ভেঙে সহিদুন্নবী জুয়েলকে পেটাতে-পেটাতে বাহির করে নিয়ে আসে। 

একপর্যায়ে সেখানেই তিনি মারা যান। এরপর তার লাশ রশিতে বেঁধে টেনে নিয়ে গিয়ে ইউনিয়ন পরিষদ থেকে ৫’শ গজ দুরে জয় ট্রেডার্সের সামনে প্রথম বাঁশকল এলাকায় পেট্রোল ঢেলে আগুনে পুড়িয়ে ফেলে। এই অবস্থায় পাটগ্রাম থানার ওসি আহত সুলতান জোবায়েত আব্বাসকে ইউনিয়ন পরিষদের ছাদ বেয়ে সেখান থেকে তাকে নিরাপদে সরিয়ে নেন। পরে বিক্ষুব্ধ লোকজন ইউনিয়ন পরিষদে ব্যাপক ভাঙচুর চালিয়ে সেখানে অগ্নিসংযোগ করে। এসময় একটি মোটরসাইকেলে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়। 

উত্তেজিত লোকজনের হাত থেকে নিরাপদে সরে যান উপজেলা নির্বাহী অফিসার কামরুন নাহার, পাটগ্রাম উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান রহুল আমিন বাবুল ও বুড়িমারী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবু সাঈদ শাহ নেওয়াজ নিশাত। 

খবর পেয়ে লালমনিরহাট জেলা প্রশাসক আবু জাফর, পুলিশ সুপার আবিদা সুলতানা ঘটনাস্থলে ছুটে যান। পাশাপাশি ঘটনাস্থলে অতিরিক্ত পুলিশ গিয়ে প্রায় সাড়ে ৫ ঘন্টার পর উত্তেজিত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হন।

এদিকে গত শুক্রবার জুম্মার নামাজের আগে ওই মসজিদের খাদেম জোবেদ আলীর কাছে জানতে চাইলে তিনি ঘটনা সম্পর্কে বলেন, ‘ওইদিন আছরের নামাজ শেষে এক ব্যক্তি নিজেকে র‌্যাব পরিচয়ে মসজিদের সেলফে অস্ত্র আছে বলে তল্লাশি করতে থাকে। এসময় একটি কোরআন শরীফ তার পায়ের নিকট পড়ে গেলে উপস্থিত কয়েকজন মুসল্লীর সঙ্গে তার কথা কাটাকাটি শুরু হয়।  এক পর্যায়ে মেম্বার হাফিজুর এসে তাকে ইউনিয়ন পরিষদে নিয়ে যান’।

বুড়িমারী ইউনিয়নের ১নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য হাফিজুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, উত্তেজিত মানুষের হাত থেকে রক্ষা করতে ওই দুই ব্যক্তিকে ইউনিয়ন পরিষদে এনে তালাবদ্ধ করে রাখি। এরপর উত্তেজিত পরিস্থিতির বিষয়টি ইউএনও, উপজেলা চেয়ারম্যান, পুলিশ এবং ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানকে সংবাদ দেই। 

গুজব ছড়িয়ে হত্যা

লালমনিরহাটের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. রবিউল ইসলাম শুক্রবার সকালে সাংবাদিকদের বলেন, মসজিদের কোরআন শরীফ হয়তো তার পায়ের ওপর পড়েছে বলে গুজব রটে। এরপরে লোকজনের সাথে কথা কাটাকাটি হয়।  হয়তো তিনি (জুয়েল) বেশিই (রিয়াক্ট) করে ফেলেছিলেন। এরপর উত্তেজিত লোকজন তাদের বাইরে নিয়ে এসে ঘটনাটি ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করলে লোকজন আরো উত্তেজিত হয়।  ঘটনাস্থলে পুলিশ পৌঁছলেও তা নিয়ন্ত্রণে নিতে পারেনি। 

তিনি আরো বলেন, এ ঘটনায়  পুলিশের ১০ জন সদস্য আহত হয়েছেন। তদন্ত কার্যক্রম অব্যাহত আছেও বলে জানান তিনি। 

বুড়িমারী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবু সাঈদ নেওয়াজ নিশাত যুগান্তরকে বলেন, আমরা সবাই মিলে অনেক চেষ্টাও করে পরিস্থিতি সামলাতে পারিনি। তারা আমাদের লাঞ্ছিত করে পরিষদের দেয়াল ও গ্রিল ভেঙে একজনকে বের করে পিটিয়ে মেরে ফেলেছে।  তারা ইউনিয়ন পরিষদে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ ও লুটপাট চালিয়ে পরিষদে আগুন ধরিয়ে দেয়। আমরা পরিষদের পক্ষ ভিডিও ফুটেজ দেখে থানায় একটি মামলা করেছি।  

আবু ইউনুস মোঃ সহিদুন্নবী জুয়েলের শ্যালক মিলন হক তালুকদার (৩৫) শুক্রবার পাটগ্রাম থানা কম্পাউন্ডে কথা হলে তিনি তার দুলাভাইকে একজন সৎ এবং ধার্মিক উল্লেখ করে ঘটনার সুষ্ঠ তদন্ত দাবী করে দায়ী ব্যাক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবী করেন।

নিহত জুয়েলের বড় বোন হাসনা আক্তার লিপি  মোবাইলে যুগান্তরকে বলেন, ‘ঘটনার দিন ফজরের নামাজ পরেই জুয়েল বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়। এরপর সকাল সাড়ে ৮টায় তার সাথে শেষ কথা হয়। এসময় জুয়েল তাকে জানান, জরুরি একটি কাজ শেষ করেই বাসায় ফিরবেন। এরপর অনেকবার মোবাইল ফোনে চেষ্টা করা হলেও সে মোবাইল রিসিভ করেনি’।

পাটগ্রাম থানার ওসি সুমন কুমার মহন্ত যুগান্তরকে বলেন, এ ঘটনায় ৩টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে নিহতের পরিবার থেকে একটি হত্যা মামলা, বুড়িমারী ইউনিয়ন পরিষদ থেকে ভাংচুর ও লুটপাটের মামলা এবং পুলিশকে সরকারি কাজে বাধা প্রদানের অভিযোগে আরেটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। শনিবার বিকালে এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত ৫ জনকে আটক করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি।

 
জেলার খবর
অনুসন্ধান করুন