‘অসম ত্রিভুজ প্রেমের’ বলি পাপিয়া, খুন করে ভাই তৃতীয় লিঙ্গের সাম্মী
রাজু আহমেদ, নারায়ণগঞ্জ
২২ নভেম্বর ২০২০, ২২:০৮:৪৭ | অনলাইন সংস্করণ
গার্মেন্টকর্মী পাপিয়ার স্বপ্ন ছিল তার প্রেমিক আরিফুলের সঙ্গে ঘর বাঁধার। দু’জনের গভীর প্রেমের সম্পর্কে বাদসাধে পাপিয়ার ভাই তৃতীয় লিঙ্গের সাম্মী। অসম ত্রিভুজ প্রেমের এ বিরোধে নিজের বড়বোন পাপিয়াকে হত্যা করে সাম্মী।
আর এই লাশ গুম করতে শেষপর্যন্ত পরিকল্পনায় অংশ নেয় তারই প্রেমিক আরিফুল ও নিহত পাপিয়ার আরেক ভাই ও বাবা। লাশ ফেলতে ভাড়া করা হয় অ্যাম্বুলেন্স। ছয় মাস আগে অজ্ঞাত অবস্থায় মহাসড়কে পড়ে থাকা পাপিয়ার লাশই শেষপর্যন্ত রহস্য খুলে দেয় এই ত্রিভুজ প্রেমের অসম কাহিনীর। আর এ রহস্য উদঘাটন করেন পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) নারায়ণগঞ্জের সদস্যরা।
পিবিআই নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপার মনিরুল ইসলাম যুগান্তরকে জানান, গত ২৮ মে আড়াইহাজার থানার শিমুলতলা নামক স্থানে আড়াইহাজার থানা পুলিশ একজন অজ্ঞাতনামা তরুণীর লাশ উদ্ধার করে। ওই ঘটনায় আড়াইহাজার থানায় পুলিশ বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে একটি মামলা দায়ের করেন। খবর পেয়ে নারায়ণগঞ্জ পিবিআই ক্রাইমসিন টিম বায়োমেট্রিক পদ্ধতিতে অজ্ঞাত সেই নারীর পরিচয় শনাক্ত করে।
তিনি জানান, সেই নিহত তরুণী সুনামগঞ্জ জেলার জগন্নাথপুর থানার হলদিপুর এলাকার জয়নাল মিয়ার মেয়ে পাপিয়া বেগম (২০)। পুলিশ হেডকোয়ার্টারের নির্দেশে মামলাটির তদন্তভার পিবিআইকে দেয়ার পরই বেরিয়ে আসতে শুরু করে চমকপ্রদ তথ্য।
পুলিশ সুপার মনিরুল ইসলাম জানান, গত ১৮ নভেম্বর নিহত পাপিয়ার সেই প্রেমিক আরিফুলকে গ্রেফতার করার পরই মূল ঘটনা প্রকাশ পেতে শুরু করে। আরিফুল জিজ্ঞাসাবাদে জানান, গার্মেন্টে কাজ করার সুবাদে তার সঙ্গে পাপিয়ার পরিচয় হয়। পরিচয় থেকে তাদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে উঠে। পরে একপর্যায়ে তারা বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নেন। বিয়ের আগেই আরিফুল তার নিজের ভোটার আইডি কার্ড দেখিয়ে সিদ্ধিরগঞ্জের মুক্তিনগর এলাকায় স্বামী-স্ত্রী পরিচয় দিয়ে একটি বাসা ভাড়া নিয়ে বসবাস শুরু করেন।
আরিফুল জিজ্ঞাসাবাদে জানান, এ সম্পর্ক মেনে নিতে পারেনি নিহত পাপিয়ার ভাই লিঙ্গান্তর হওয়া সাইদুর রহমান ওরফে (সাম্মী)। এই প্রেমে বাদসাধে সাম্মী। প্রেমের প্রস্তাব দিয়ে ব্যর্থ হয়ে সরাসরি আরিফুলকে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপনের প্রস্তাব দেয় সাম্মী। বিষয়টি প্রেমিকা পাপিয়াকে জানালে শুরু হয় ভাই-বোনের বিরোধ।
তিনি আরও জানান, ঘটনার দিন গত ২৭ মে পাপিয়ার সেই ভাড়া বাসায় আসেন প্রেমিক আরিফুল। সেখানে আরিফুলকে নিয়ে সাম্মী ও পাপিয়ার ঝগড়া শুরু হলে আরিফুল বেরিয়ে পাশের এক ভবনে তার বন্ধুর বাড়িতে অবস্থান করছিলেন। কয়েক ঘণ্টা পর পুনরায় পাপিয়ার বাসায় ফিরে আরিফুল দেখতে পান গলায় ওড়না পেঁচানো অবস্থায় পাপিয়ার নিথর দেহ বিছানার উপর পড়ে আছে। এ সময় একজন স্থানীয় ডাক্তার ডেকে এনে জানতে পারেন পাপিয়া মারা গেছেন।
পরে সাম্মীর মাধ্যমে তার বাবা জয়নাল, পাপিয়ার আরেক ভাই মামুন মৃত্যুর খবর জানতে পেরে ঘটনাস্থলে আসেন। এ সময় পাপিয়া আত্মহত্যা করেছে- এমন তথ্য দিয়ে তার লাশ গ্রামের বাড়িতে দাফন করতে চাইলেও ওই এলাকার স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা পুলিশের ক্লিয়ারেন্স ছাড়া লাশ দাফন করা যাবে না বলে জানিয়ে দেন।
এরপর তারা সবাই পরিকল্পনা করেন পাপিয়ার লাশ ভৈরব ব্রিজ থেকে নদীতে ফেলে দেয়া হবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী তারা ১৪ হাজার টাকায় একটি অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া করে মৃত পাপিয়াকে বোরকা পরিয়ে অ্যাম্বুলেন্সে তুলে রওনা হন। কিন্তু পথিমধ্যে পুলিশের চেকপোস্ট থাকায় তারা আড়াইহাজার থানাধীন শিমুলতলা নামক স্থানে রাস্তার পাশে জঙ্গলের ভেতরে পাপিয়ার লাশ ফেলে চলে যান।
পুলিশ সুপার (পিবিআই) মনিরুল ইসলাম জানান, ইতোমধ্যে নিহত পাপিয়ার প্রেমিক আরিফুল ও পাপিয়ার বাবা জয়নাল মিয়াকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তারা উভয়ই আদালতে ১৬৪ ধারায় এ ঘটনায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। মূল আসামি নিহতের ভাই সাম্মী এখনও পলাতক আছে। তাকে এবং বাকিদের গ্রেফতারে বিশেষ অভিযান চলছে।
তিনি জানান, মূলত এই অসম ত্রিভুজ প্রেমের কারণেই পাপিয়াকে প্রাণ দিতে হয়েছে। সাম্মীকে গ্রেফতার করলে আরও রহস্য বেরিয়ে আসবে।
সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম
প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।
পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬
E-mail: [email protected]
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
‘অসম ত্রিভুজ প্রেমের’ বলি পাপিয়া, খুন করে ভাই তৃতীয় লিঙ্গের সাম্মী
গার্মেন্টকর্মী পাপিয়ার স্বপ্ন ছিল তার প্রেমিক আরিফুলের সঙ্গে ঘর বাঁধার। দু’জনের গভীর প্রেমের সম্পর্কে বাদসাধে পাপিয়ার ভাই তৃতীয় লিঙ্গের সাম্মী। অসম ত্রিভুজ প্রেমের এ বিরোধে নিজের বড়বোন পাপিয়াকে হত্যা করে সাম্মী।
আর এই লাশ গুম করতে শেষপর্যন্ত পরিকল্পনায় অংশ নেয় তারই প্রেমিক আরিফুল ও নিহত পাপিয়ার আরেক ভাই ও বাবা। লাশ ফেলতে ভাড়া করা হয় অ্যাম্বুলেন্স। ছয় মাস আগে অজ্ঞাত অবস্থায় মহাসড়কে পড়ে থাকা পাপিয়ার লাশই শেষপর্যন্ত রহস্য খুলে দেয় এই ত্রিভুজ প্রেমের অসম কাহিনীর। আর এ রহস্য উদঘাটন করেন পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) নারায়ণগঞ্জের সদস্যরা।
পিবিআই নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপার মনিরুল ইসলাম যুগান্তরকে জানান, গত ২৮ মে আড়াইহাজার থানার শিমুলতলা নামক স্থানে আড়াইহাজার থানা পুলিশ একজন অজ্ঞাতনামা তরুণীর লাশ উদ্ধার করে। ওই ঘটনায় আড়াইহাজার থানায় পুলিশ বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে একটি মামলা দায়ের করেন। খবর পেয়ে নারায়ণগঞ্জ পিবিআই ক্রাইমসিন টিম বায়োমেট্রিক পদ্ধতিতে অজ্ঞাত সেই নারীর পরিচয় শনাক্ত করে।
তিনি জানান, সেই নিহত তরুণী সুনামগঞ্জ জেলার জগন্নাথপুর থানার হলদিপুর এলাকার জয়নাল মিয়ার মেয়ে পাপিয়া বেগম (২০)। পুলিশ হেডকোয়ার্টারের নির্দেশে মামলাটির তদন্তভার পিবিআইকে দেয়ার পরই বেরিয়ে আসতে শুরু করে চমকপ্রদ তথ্য।
পুলিশ সুপার মনিরুল ইসলাম জানান, গত ১৮ নভেম্বর নিহত পাপিয়ার সেই প্রেমিক আরিফুলকে গ্রেফতার করার পরই মূল ঘটনা প্রকাশ পেতে শুরু করে। আরিফুল জিজ্ঞাসাবাদে জানান, গার্মেন্টে কাজ করার সুবাদে তার সঙ্গে পাপিয়ার পরিচয় হয়। পরিচয় থেকে তাদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে উঠে। পরে একপর্যায়ে তারা বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নেন। বিয়ের আগেই আরিফুল তার নিজের ভোটার আইডি কার্ড দেখিয়ে সিদ্ধিরগঞ্জের মুক্তিনগর এলাকায় স্বামী-স্ত্রী পরিচয় দিয়ে একটি বাসা ভাড়া নিয়ে বসবাস শুরু করেন।
আরিফুল জিজ্ঞাসাবাদে জানান, এ সম্পর্ক মেনে নিতে পারেনি নিহত পাপিয়ার ভাই লিঙ্গান্তর হওয়া সাইদুর রহমান ওরফে (সাম্মী)। এই প্রেমে বাদসাধে সাম্মী। প্রেমের প্রস্তাব দিয়ে ব্যর্থ হয়ে সরাসরি আরিফুলকে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপনের প্রস্তাব দেয় সাম্মী। বিষয়টি প্রেমিকা পাপিয়াকে জানালে শুরু হয় ভাই-বোনের বিরোধ।
তিনি আরও জানান, ঘটনার দিন গত ২৭ মে পাপিয়ার সেই ভাড়া বাসায় আসেন প্রেমিক আরিফুল। সেখানে আরিফুলকে নিয়ে সাম্মী ও পাপিয়ার ঝগড়া শুরু হলে আরিফুল বেরিয়ে পাশের এক ভবনে তার বন্ধুর বাড়িতে অবস্থান করছিলেন। কয়েক ঘণ্টা পর পুনরায় পাপিয়ার বাসায় ফিরে আরিফুল দেখতে পান গলায় ওড়না পেঁচানো অবস্থায় পাপিয়ার নিথর দেহ বিছানার উপর পড়ে আছে। এ সময় একজন স্থানীয় ডাক্তার ডেকে এনে জানতে পারেন পাপিয়া মারা গেছেন।
পরে সাম্মীর মাধ্যমে তার বাবা জয়নাল, পাপিয়ার আরেক ভাই মামুন মৃত্যুর খবর জানতে পেরে ঘটনাস্থলে আসেন। এ সময় পাপিয়া আত্মহত্যা করেছে- এমন তথ্য দিয়ে তার লাশ গ্রামের বাড়িতে দাফন করতে চাইলেও ওই এলাকার স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা পুলিশের ক্লিয়ারেন্স ছাড়া লাশ দাফন করা যাবে না বলে জানিয়ে দেন।
এরপর তারা সবাই পরিকল্পনা করেন পাপিয়ার লাশ ভৈরব ব্রিজ থেকে নদীতে ফেলে দেয়া হবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী তারা ১৪ হাজার টাকায় একটি অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া করে মৃত পাপিয়াকে বোরকা পরিয়ে অ্যাম্বুলেন্সে তুলে রওনা হন। কিন্তু পথিমধ্যে পুলিশের চেকপোস্ট থাকায় তারা আড়াইহাজার থানাধীন শিমুলতলা নামক স্থানে রাস্তার পাশে জঙ্গলের ভেতরে পাপিয়ার লাশ ফেলে চলে যান।
পুলিশ সুপার (পিবিআই) মনিরুল ইসলাম জানান, ইতোমধ্যে নিহত পাপিয়ার প্রেমিক আরিফুল ও পাপিয়ার বাবা জয়নাল মিয়াকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তারা উভয়ই আদালতে ১৬৪ ধারায় এ ঘটনায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। মূল আসামি নিহতের ভাই সাম্মী এখনও পলাতক আছে। তাকে এবং বাকিদের গ্রেফতারে বিশেষ অভিযান চলছে।
তিনি জানান, মূলত এই অসম ত্রিভুজ প্রেমের কারণেই পাপিয়াকে প্রাণ দিতে হয়েছে। সাম্মীকে গ্রেফতার করলে আরও রহস্য বেরিয়ে আসবে।