ছোট্ট হাতে বড় সংসারের হাল ধরার স্বপ্ন সোহেলের
jugantor
ছোট্ট হাতে বড় সংসারের হাল ধরার স্বপ্ন সোহেলের

  আক্তারুজ্জামান বকুল, নাগরপুর (টাঙ্গাইল)  

২৩ ডিসেম্বর ২০২০, ১৭:৩৭:৪৩  |  অনলাইন সংস্করণ

বয়স ১০ ছুঁই ছুঁই। নাম সোহেল রানা। ভালোবেসে সবাই সোহেল বলেই ডাকে। দুরন্ত চঞ্চলা ওই শিশু ঘুনি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ালেখা করে। ছুটি পেলেই বেরিয়ে পড়ে পাঁচ সদস্যের পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী বাবার আয়ের জোগান দিতে।

ওই শিশুর বাবা একজন কাঠমিস্ত্রি। ঘরের কাজে বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে ঘুরে কাজ করাই তার পেশা। রোজগার হলেই জ্বলে চুলা। তাই করোনায় দীর্ঘ কয়েক মাস স্কুল বন্ধ থাকায় প্রায়ই দেখা যায় বিভিন্ন ক্ষেত-খামারে কিংবা সুপারি গাছের আগায় ওই শিশু সোহেলকে।

শিশু সোহেল নাগরপুর উপজেলার গয়হাটা ইউনিয়নের ঘুনি এলাকার আলতাফ হোসেনের ছেলে। তার দুই মেয়ে এবং এক ছেলে। তারা সবাই স্কুলে পড়ে। তার সংসারের খরচ জোগাতেই হিমসিম খেতে হয়। এরপর ছেলেমেয়েদের স্কুলের খরচ। নিজের বলতে এক চিলতে জমিতে একটি টিনের ঘর ছাড়া কিছুই নেই।

এরকম আরও পাঁচ-ছয়জন শিশুরা আছে এলাকায়। কেউ কেউ সখের বসেও দিগন্তের শস্যের ক্ষেত-খামারে ঘুরে বেড়ায় নিজেদের চাহিদা মেটানোর কাজে।

সরেজমিন জানা যায়, ফসলের মাঠে ঝরেপড়া ও ইঁদুরের গর্ত থেকে ধান সংগ্রহের আনন্দে মেতেছে হতদরিদ্র শিশুরা। প্রতি বছর ধান কাটা শেষ হতেই ঝরেপড়া ধান কুড়াতে ব্যস্ত সময় পার করে একদল শিশু-কিশোর এমনকি বৃদ্ধরাও। ধান সংগ্রহ করে কেউ সংসারের খোরাক জোগায় কেউবা ধান বিক্রি করে শার্ট, প্যান্ট, জুতা, শীতের পোশাক কিনবে কেউ বা খাবে শীতের পিঠা।

বিস্তীর্ণ ফসলের মাঠ থেকে কৃষকরা ধান নিয়ে যাওয়ার পর একদল শিশু-কিশোর হাতে খুন্তি-শাবল, চালন, ব্যাগ নিয়ে খুঁজে ফিরছে ইঁদুরের গর্ত। ইঁদুরের গর্তে জমানো ধান ব্যাগে ভরে তারা। এছাড়া জমিতে পড়ে থাকা ধানও কুড়িয়ে ব্যাগে ভরতে দেখা যায়।

এ সময় দেখা মেলে ওই শিশু সোহেলের। ঠিকানা নিয়ে বাড়িতে গিয়ে কথা হয় পরিবারের ও আশপাশের লোকজনের সঙ্গে। অভাব-অনটনের সংসারে সুযোগ পেলেই দিগ্বিদিক ছুটে সোহেল। কখনো মাটি খুঁড়ে কচুর মুখি, কচুর লতি, ইঁদুরের গর্ত খুঁড়ে ধান এমনটি বিভিন্ন গাছ থেকে চুক্তি নিয়ে কাজ করে আনে নগদ টাকা অথবা সুপারি। পুরোটাই তুলে দেয় মা-বাবার হাতে।

মাঠে ধান সংগ্রহ করতে আসা ওই শিশু জানায়, বিভিন্ন মাঠে ইঁদুরের গর্ত থেকে ধান সংগ্রহ করি। কখনো কচুর মুখি, কখনো গাছ থেকে চুক্তিতে সুপারি পেরে যা পাই সব মায়ের কাছে দেই। বাবা অনেক কষ্ট করে আমাদের জন্য, তাই বসে না থেকে আমি এগুলোই করি। পড়ালেখা করে বড় হয়ে মা-বাবার পাশে দাঁড়াব।

ঘুনি এলাকার কৃষক আঞ্জু মিয়া জানান, ধান কাটার পর মাটিতে পড়ে থাকা ধান শিশু-কিশোররা সংগ্রহ করে, এতে আমরা বাধা দেই না। এছাড়া গ্রামের হতদরিদ্র পরিবারের শিশুরাই দলবেঁধে ধান সংগ্রহ করে। তবে তাদের সাবধান করি গর্তে বিষাক্ত সাপ থাকতে পারে বলে।

উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে ধান কাটা ও মাড়াই চলছে। এবার ধানের দাম বেশি পাওয়ায় কৃষকের মুখে হাসি ফুটেছে। এক মণ ধান বাজারে বিক্রি হচ্ছে ১১শ' থেকে ১২শ' টাকায়। এ বছর উপজেলায় ২ হাজার ৩৫০ হেক্টর জমিতে রোপা আমনের আবাদ হয়েছে; যার উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ৮ হাজার ২২৫ টন। প্রবল বন্যার কারণে ধান রোপণ এবং কর্তন সব দিকেই পিছিয়ে আছে কৃষকরা।

নাগরপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মতিন বিশ্বাস জানান, ক্ষেতে এভাবে ইঁদুরের গর্ত থেকে ধান সংগ্রহ করা অনিরাপদ এবং ঝুঁকিপূর্ণ। তবে আধুনিক লগো পদ্ধতিতে ১০ লাইন পর পর এক লাইন গ্যাপ দিয়ে ধান রোপণ করলে ইঁদুরে ধান নষ্ট কম করে। এতে করে আলো চলাচলের সুযোগ পায় ফলনও ভালো হয়; কৃষকরাও উপকৃত ও লাভবান হবেন।

ছোট্ট হাতে বড় সংসারের হাল ধরার স্বপ্ন সোহেলের

 আক্তারুজ্জামান বকুল, নাগরপুর (টাঙ্গাইল) 
২৩ ডিসেম্বর ২০২০, ০৫:৩৭ পিএম  |  অনলাইন সংস্করণ

বয়স ১০ ছুঁই ছুঁই। নাম সোহেল রানা। ভালোবেসে সবাই সোহেল বলেই ডাকে। দুরন্ত চঞ্চলা ওই শিশু ঘুনি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ালেখা করে। ছুটি পেলেই বেরিয়ে পড়ে পাঁচ সদস্যের পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী বাবার আয়ের জোগান দিতে।

ওই শিশুর বাবা একজন কাঠমিস্ত্রি। ঘরের কাজে বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে ঘুরে কাজ করাই তার পেশা। রোজগার হলেই জ্বলে চুলা। তাই করোনায় দীর্ঘ কয়েক মাস স্কুল বন্ধ থাকায় প্রায়ই দেখা যায় বিভিন্ন ক্ষেত-খামারে কিংবা সুপারি গাছের আগায় ওই শিশু সোহেলকে।

শিশু সোহেল নাগরপুর উপজেলার গয়হাটা ইউনিয়নের ঘুনি এলাকার আলতাফ হোসেনের ছেলে। তার দুই মেয়ে এবং এক ছেলে। তারা সবাই স্কুলে পড়ে। তার সংসারের খরচ জোগাতেই হিমসিম খেতে হয়। এরপর ছেলেমেয়েদের স্কুলের খরচ। নিজের বলতে এক চিলতে জমিতে একটি টিনের ঘর ছাড়া কিছুই নেই।

এরকম আরও পাঁচ-ছয়জন শিশুরা আছে এলাকায়। কেউ কেউ সখের বসেও দিগন্তের শস্যের ক্ষেত-খামারে ঘুরে বেড়ায় নিজেদের চাহিদা মেটানোর কাজে।

সরেজমিন জানা যায়, ফসলের মাঠে ঝরেপড়া ও ইঁদুরের গর্ত থেকে ধান সংগ্রহের আনন্দে মেতেছে হতদরিদ্র শিশুরা। প্রতি বছর ধান কাটা শেষ হতেই ঝরেপড়া ধান কুড়াতে ব্যস্ত সময় পার করে একদল শিশু-কিশোর এমনকি বৃদ্ধরাও। ধান সংগ্রহ করে কেউ সংসারের খোরাক জোগায় কেউবা ধান বিক্রি করে শার্ট, প্যান্ট, জুতা, শীতের পোশাক কিনবে কেউ বা খাবে শীতের পিঠা।

বিস্তীর্ণ ফসলের মাঠ থেকে কৃষকরা ধান নিয়ে যাওয়ার পর একদল শিশু-কিশোর হাতে খুন্তি-শাবল, চালন, ব্যাগ নিয়ে খুঁজে ফিরছে ইঁদুরের গর্ত। ইঁদুরের গর্তে জমানো ধান ব্যাগে ভরে তারা। এছাড়া জমিতে পড়ে থাকা ধানও কুড়িয়ে ব্যাগে ভরতে দেখা যায়।

এ সময় দেখা মেলে ওই শিশু সোহেলের। ঠিকানা নিয়ে বাড়িতে গিয়ে কথা হয় পরিবারের ও আশপাশের লোকজনের সঙ্গে। অভাব-অনটনের সংসারে সুযোগ পেলেই দিগ্বিদিক ছুটে সোহেল। কখনো মাটি খুঁড়ে কচুর মুখি, কচুর লতি, ইঁদুরের গর্ত খুঁড়ে ধান এমনটি বিভিন্ন গাছ থেকে চুক্তি নিয়ে কাজ করে আনে নগদ টাকা অথবা সুপারি। পুরোটাই তুলে দেয় মা-বাবার হাতে।

মাঠে ধান সংগ্রহ করতে আসা ওই শিশু জানায়, বিভিন্ন মাঠে ইঁদুরের গর্ত থেকে ধান সংগ্রহ করি। কখনো কচুর মুখি, কখনো গাছ থেকে চুক্তিতে সুপারি পেরে যা পাই সব মায়ের কাছে দেই। বাবা অনেক কষ্ট করে আমাদের জন্য, তাই বসে না থেকে আমি এগুলোই করি। পড়ালেখা করে বড় হয়ে মা-বাবার পাশে দাঁড়াব।

ঘুনি এলাকার কৃষক আঞ্জু মিয়া জানান, ধান কাটার পর মাটিতে পড়ে থাকা ধান শিশু-কিশোররা সংগ্রহ করে, এতে আমরা বাধা দেই না। এছাড়া গ্রামের হতদরিদ্র পরিবারের শিশুরাই দলবেঁধে ধান সংগ্রহ করে। তবে তাদের সাবধান করি গর্তে বিষাক্ত সাপ থাকতে পারে বলে।

উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে ধান কাটা ও মাড়াই চলছে। এবার ধানের দাম বেশি পাওয়ায় কৃষকের মুখে হাসি ফুটেছে। এক মণ ধান বাজারে বিক্রি হচ্ছে ১১শ' থেকে ১২শ' টাকায়। এ বছর উপজেলায় ২ হাজার ৩৫০ হেক্টর জমিতে রোপা আমনের আবাদ হয়েছে; যার উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ৮ হাজার ২২৫ টন। প্রবল বন্যার কারণে ধান রোপণ এবং কর্তন সব দিকেই পিছিয়ে আছে কৃষকরা।

নাগরপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মতিন বিশ্বাস জানান, ক্ষেতে এভাবে ইঁদুরের গর্ত থেকে ধান সংগ্রহ করা অনিরাপদ এবং ঝুঁকিপূর্ণ। তবে আধুনিক লগো পদ্ধতিতে ১০ লাইন পর পর এক লাইন গ্যাপ দিয়ে ধান রোপণ করলে ইঁদুরে ধান নষ্ট কম করে। এতে করে আলো চলাচলের সুযোগ পায় ফলনও ভালো হয়; কৃষকরাও উপকৃত ও লাভবান হবেন।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও খবর
 
জেলার খবর
অনুসন্ধান করুন