৬ সদস্যের কারও আঙ্গুলেই ছাপ নেই, চরম বিড়ম্বনায় পুরো পরিবার
jugantor
৬ সদস্যের কারও আঙ্গুলেই ছাপ নেই, চরম বিড়ম্বনায় পুরো পরিবার

  রাজশাহী ব্যুরো  

২৩ ডিসেম্বর ২০২০, ১৭:৫৪:০৩  |  অনলাইন সংস্করণ

রাজশাহীর পুঠিয়া উপজেলার ৬ সদস্যবিশিষ্ট একটি পরিবারের কারও আঙ্গুলের ছাপ নেই। এ নিয়ে চরম বিড়ম্বনার মধ্যে রয়েছে পরিবারটি।

২০০৮ সালের দিকে জাতীয় পরিচয়পত্রের জন্য যখন আঙ্গুলের ছাপ নেয়া শুরু হয় তখন থেকেই পুঠিয়ার অমল সরকার ও তার পরিবারের সদস্যদের সমস্যা শুরু হয়েছে।

অমল সরকার যখন বারবার আঙ্গুলের ছাপ দিতে ব্যর্থ হন, তখন ফিঙ্গারপ্রিন্ট সংগ্রহের দায়িত্বে থাকা কর্মীরা বুঝতে পারছিলেন না তারা ঠিক কী করবেন। পরে কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে এনআইডি কার্ডে লেখা হয় ‘আঙ্গুলের ছাপ নেই।’ শুধু অমল সরকার ও তার ছেলে অপু সরকার নয়, বিরল এক বংশগত সমস্যার কারণে এ পরিবারের ছয় সদস্যের আঙ্গুলে কোনো ছাপ নেই।

এ নিয়ে দিন দিন তাদের বিড়ম্বনা বাড়ছেই। ২০১৬ সালে যখন মোবাইল সিম কার্ডের জন্য আঙ্গুলের ছাপ দেয়া বাধ্যতামূলক করা হয়, তখন নতুন করে বিপদের মুখে পড়েন অপু সরকার।

অপু বলেন, আমি সিম নিতে যাওয়ার পর যতবার আঙ্গুলের ছাপ দিতে যাই, ততবারই সফটওয়্যার হ্যাং হয়ে যায়, যখন তাদের আমার সমস্যার কথা বললাম, তারা বলল যে সরি, আমরা তো আঙ্গুলের ছাপ ছাড়া সিম দিতে পারব না।

অপু বলেন, আমার দাদারও একই সমস্যা ছিল। কিন্তু আমার দাদা মনে হয় না এটাকে কখনও সমস্যা হিসেবে দেখেছেন।

অপু সরকার সাংবাদিকদের জানান, তার বাবা এবং তার ছোটভাই তিনজনই এখন তার মায়ের নামে তোলা সিম ব্যবহার করেন। পাসপোর্টের জন্যও তাদের বিড়ম্বনায় পড়তে হয়। ফিঙ্গারপ্রিন্ট না আসায় তাদের পাসপোর্টও দেয়া হচ্ছিল না। অবশেষে কয়েক মাস চেষ্টা করার পর সিভিল সার্জনের করে দেয়া মেডিকেল বোর্ডের সার্টিফিকেট জমা দিয়ে শেষ পর্যন্ত পাসপোর্ট হাতে পান অমল সরকার।

তবে বিদেশের বিমানবন্দরে গিয়ে আবার কী ঝামেলায় পড়তে হয়, সেই ভয়ে এখনও বিদেশে ভ্রমণ করার সাহস পাননি তিনি। অমল সরকার চলাফেরার জন্য একটি মোটরসাইকেল ব্যবহার করেন। তবে তার কাছে ড্রাইভিং লাইসেন্সের কার্ডটি নেই।

তিনি বলেন, আমি রেজিস্ট্রেশন ফি জমা দিয়েছি। কিন্তু আঙ্গুলের ছাপ না থাকায় আমাকে ড্রাইভিং লাইসেন্স দেয়নি।
এখন মোটরসাইকেল চালানোর সময় তিনি বিআরটিএতে জমা দেয়া ফি'র রিসিপ্টটি কাছে রাখেন। এরপরও তাকে দুইবার জরিমানা দিতে হয়েছে।

অমল সরকারের বাবা এবং দাদারও একই সমস্যা ছিল। তারা দু'জনই ছিলেন বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান। তার দুই ভাইও একই সমস্যা নিয়ে জন্মেছেন। বড়ভাই গোপেশ সরকার প্রায় দুই বছর অপেক্ষা করার পর সম্প্রতি তার পাসপোর্ট হাতে পেয়েছেন। দিনাজপুরের একটি হাসপাতালে চাকরি করেন গোপেশ সরকার।

তিনি বলেন, এ পাসপোর্টের জন্য আমাকে চার থেকে পাঁচবার ঢাকায় যেতে হয়েছে, এটা বোঝানোর জন্য যে আসলেই আমার এ সমস্যা আছে। তার হাসপাতালে যখন কর্মচারীদের হাজিরার জন্য আঙ্গুলের ছাপ নেয়া শুরু হয়, তখন তিনি কর্মকর্তাদের বুঝিয়ে পুরনো পদ্ধতিতে খাতায় স্বাক্ষর রাখতে রাজি করান।

সম্প্রতি মেডিকেল সার্টিফিকেট দেখিয়ে স্মার্টকার্ড করেছেন অপু সরকার ও তার বাবা। আঙ্গুলের ছাপ দিতে পারেননি, তবে রেটিনা স্ক্যান করা হয়েছে তাদের।

অমল এবং গোপেশ সরকার ছোটবেলা থেকেই যেহেতু জানেন যে আঙ্গুলের ছাপের এ সমস্যা তাদের বংশগত, তাই তারা কখনো চিকিৎসার চেষ্টা করেননি। তবে হাতের তালুর চামড়ার খসখসে ভাব কমাতে চিকিৎসকের পরামর্শে কিছুদিন একটি ক্রিম ব্যবহার করেছিলেন অমল সরকার।

অমল সরকার জানান, কৃষিকাজ করলে তার হাতের চামড়া খুব সহজেই ফেটে যায় ও সেটি তুলনামূলক খসখসে। এ নিয়ে তিনি এমনিতেই অস্বস্তিতে ভোগেন। তার ওপর এই সমস্যার কারণে পদে পদে অপদস্থ হতে হচ্ছে।

অমল বলেন, কারও সঙ্গে হাত মেলাতে গেলে সে একটু চমকে ওঠে। এইটা নিয়ে একটু লজ্জা লাগে আমার।

বিবিসি বাংলার এক সংবাদে বলা হয়েছে, মেডিকেল বোর্ড তাদের এ সমস্যাকে ‘কনজেনিয়াল পালমোপ্লান্টার কেরাটোডার্মা’ হিসেবে চিহ্নিত করেন। সুইজারল্যান্ডের একজন চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক পিটার ইটিন এবং আরও কয়েকজন গবেষক এ বিষয়ে একটি গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশ করেন ২০১১ সালে। ওই গবেষণায় তারা এই বংশগত বা জেনেটিক সমস্যার জন্য দায়ী জেনেটিক মিউটেশনটি শনাক্ত করেন।

তাদের গবেষণার সময় পর্যন্ত সারা বিশ্বে চারটি পরিবার শনাক্ত হয়েছিল, যারা বংশগতভাবে এ সমস্যায় ভুগছেন। এর সবই ছিল এশিয়া মহাদেশের বাইরে।

অধ্যাপক ইটিন বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, সারাবিশ্বে অল্প কয়েকটি পরিবারের কথাই আমরা এখনও পর্যন্ত জানতে পেরেছি। ২০০৭ সালে এক সুইস নারী আঙ্গুলের ছাপ দিতে না পারায় যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবন্দরে বারবার সমস্যায় পড়ার পর অধ্যাপক ইটিনের শরণাপন্ন হন। সেটিই ছিল তার কাছে এ ধরনের প্রথম কোনো রোগী। পরবর্তীতে গবেষক দলটি ওই নারীর পরিবারের ১৬ জনের ওপর গবেষণা চালিয়ে বংশগত সমস্যার কারণটি খুঁজে বের করেন।

গবেষক দলটি এই রোগের আরেকটি নাম দেন ‘অভিবাসন বিলম্ব রোগ’ বা ‘ইমিগ্রেশন ডিলে ডিজিজ’। অধ্যাপক ইটিন মনে করেন, সরকার পরিবারের বংশগত কেরাটোডার্মাই সেকেন্ডারি অ্যাডারমাটোগ্লিফিয়ায় রূপ নিচ্ছে। সেকেন্ডারি অ্যাডারমাটোগ্লিফিয়া তুলনামূলকভাবে বেশিসংখ্যক মানুষের থাকতে পারে। কখনও কখনও আঙ্গুলের মাথায় হালকা রেখাও থাকে কারও কারও। শুধুমাত্র জিন থেরাপির মাধ্যমেই ভবিষ্যতে এটি নিরাময় সম্ভব হতে পারে।

৬ সদস্যের কারও আঙ্গুলেই ছাপ নেই, চরম বিড়ম্বনায় পুরো পরিবার

 রাজশাহী ব্যুরো 
২৩ ডিসেম্বর ২০২০, ০৫:৫৪ পিএম  |  অনলাইন সংস্করণ

রাজশাহীর পুঠিয়া উপজেলার ৬ সদস্যবিশিষ্ট একটি পরিবারের কারও আঙ্গুলের ছাপ নেই। এ নিয়ে চরম বিড়ম্বনার মধ্যে রয়েছে পরিবারটি।

২০০৮ সালের দিকে জাতীয় পরিচয়পত্রের জন্য যখন আঙ্গুলের ছাপ নেয়া শুরু হয় তখন থেকেই পুঠিয়ার অমল সরকার ও তার পরিবারের সদস্যদের সমস্যা শুরু হয়েছে।

অমল সরকার যখন বারবার আঙ্গুলের ছাপ দিতে ব্যর্থ হন, তখন ফিঙ্গারপ্রিন্ট সংগ্রহের দায়িত্বে থাকা কর্মীরা বুঝতে পারছিলেন না তারা ঠিক কী করবেন। পরে কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে এনআইডি কার্ডে লেখা হয় ‘আঙ্গুলের ছাপ নেই।’ শুধু অমল সরকার ও তার ছেলে অপু সরকার নয়, বিরল এক বংশগত সমস্যার কারণে এ পরিবারের ছয় সদস্যের আঙ্গুলে কোনো ছাপ নেই।

এ নিয়ে দিন দিন তাদের বিড়ম্বনা বাড়ছেই। ২০১৬ সালে যখন মোবাইল সিম কার্ডের জন্য আঙ্গুলের ছাপ দেয়া বাধ্যতামূলক করা হয়, তখন নতুন করে বিপদের মুখে পড়েন অপু সরকার।

অপু বলেন, আমি সিম নিতে যাওয়ার পর যতবার আঙ্গুলের ছাপ দিতে যাই, ততবারই সফটওয়্যার হ্যাং হয়ে যায়, যখন তাদের আমার সমস্যার কথা বললাম, তারা বলল যে সরি, আমরা তো আঙ্গুলের ছাপ ছাড়া সিম দিতে পারব না।

অপু বলেন, আমার দাদারও একই সমস্যা ছিল। কিন্তু আমার দাদা মনে হয় না এটাকে কখনও সমস্যা হিসেবে দেখেছেন।

অপু সরকার সাংবাদিকদের জানান, তার বাবা এবং তার ছোটভাই তিনজনই এখন তার মায়ের নামে তোলা সিম ব্যবহার করেন। পাসপোর্টের জন্যও তাদের বিড়ম্বনায় পড়তে হয়। ফিঙ্গারপ্রিন্ট না আসায় তাদের পাসপোর্টও দেয়া হচ্ছিল না। অবশেষে কয়েক মাস চেষ্টা করার পর সিভিল সার্জনের করে দেয়া মেডিকেল বোর্ডের সার্টিফিকেট জমা দিয়ে শেষ পর্যন্ত পাসপোর্ট হাতে পান অমল সরকার।

তবে বিদেশের বিমানবন্দরে গিয়ে আবার কী ঝামেলায় পড়তে হয়, সেই ভয়ে এখনও বিদেশে ভ্রমণ করার সাহস পাননি তিনি। অমল সরকার চলাফেরার জন্য একটি মোটরসাইকেল ব্যবহার করেন। তবে তার কাছে ড্রাইভিং লাইসেন্সের কার্ডটি নেই। 

তিনি বলেন, আমি রেজিস্ট্রেশন ফি জমা দিয়েছি। কিন্তু আঙ্গুলের ছাপ না থাকায় আমাকে ড্রাইভিং লাইসেন্স দেয়নি।
এখন মোটরসাইকেল চালানোর সময় তিনি বিআরটিএতে জমা দেয়া ফি'র রিসিপ্টটি কাছে রাখেন। এরপরও তাকে দুইবার জরিমানা দিতে হয়েছে। 

অমল সরকারের বাবা এবং দাদারও একই সমস্যা ছিল। তারা দু'জনই ছিলেন বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান। তার দুই ভাইও একই সমস্যা নিয়ে জন্মেছেন। বড়ভাই গোপেশ সরকার প্রায় দুই বছর অপেক্ষা করার পর সম্প্রতি তার পাসপোর্ট হাতে পেয়েছেন। দিনাজপুরের একটি হাসপাতালে চাকরি করেন গোপেশ সরকার।

তিনি বলেন, এ পাসপোর্টের জন্য আমাকে চার থেকে পাঁচবার ঢাকায় যেতে হয়েছে, এটা বোঝানোর জন্য যে আসলেই আমার এ সমস্যা আছে। তার হাসপাতালে যখন কর্মচারীদের হাজিরার জন্য আঙ্গুলের ছাপ নেয়া শুরু হয়, তখন তিনি কর্মকর্তাদের বুঝিয়ে পুরনো পদ্ধতিতে খাতায় স্বাক্ষর রাখতে রাজি করান। 

সম্প্রতি মেডিকেল সার্টিফিকেট দেখিয়ে স্মার্টকার্ড করেছেন অপু সরকার ও তার বাবা। আঙ্গুলের ছাপ দিতে পারেননি, তবে রেটিনা স্ক্যান করা হয়েছে তাদের।

অমল এবং গোপেশ সরকার ছোটবেলা থেকেই যেহেতু জানেন যে আঙ্গুলের ছাপের এ সমস্যা তাদের বংশগত, তাই তারা কখনো চিকিৎসার চেষ্টা করেননি। তবে হাতের তালুর চামড়ার খসখসে ভাব কমাতে চিকিৎসকের পরামর্শে কিছুদিন একটি ক্রিম ব্যবহার করেছিলেন অমল সরকার। 

অমল সরকার জানান, কৃষিকাজ করলে তার হাতের চামড়া খুব সহজেই ফেটে যায় ও সেটি তুলনামূলক খসখসে। এ নিয়ে তিনি এমনিতেই অস্বস্তিতে ভোগেন। তার ওপর এই সমস্যার কারণে পদে পদে অপদস্থ হতে হচ্ছে। 

অমল বলেন, কারও সঙ্গে হাত মেলাতে গেলে সে একটু চমকে ওঠে। এইটা নিয়ে একটু লজ্জা লাগে আমার।

বিবিসি বাংলার এক সংবাদে বলা হয়েছে, মেডিকেল বোর্ড তাদের এ সমস্যাকে ‘কনজেনিয়াল পালমোপ্লান্টার কেরাটোডার্মা’ হিসেবে চিহ্নিত করেন। সুইজারল্যান্ডের একজন চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক পিটার ইটিন এবং আরও কয়েকজন গবেষক এ বিষয়ে একটি গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশ করেন ২০১১ সালে। ওই গবেষণায় তারা এই বংশগত বা জেনেটিক সমস্যার জন্য দায়ী জেনেটিক মিউটেশনটি শনাক্ত করেন। 

তাদের গবেষণার সময় পর্যন্ত সারা বিশ্বে চারটি পরিবার শনাক্ত হয়েছিল, যারা বংশগতভাবে এ সমস্যায় ভুগছেন। এর সবই ছিল এশিয়া মহাদেশের বাইরে।

অধ্যাপক ইটিন বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, সারাবিশ্বে অল্প কয়েকটি পরিবারের কথাই আমরা এখনও পর্যন্ত জানতে পেরেছি। ২০০৭ সালে এক সুইস নারী আঙ্গুলের ছাপ দিতে না পারায় যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবন্দরে বারবার সমস্যায় পড়ার পর অধ্যাপক ইটিনের শরণাপন্ন হন। সেটিই ছিল তার কাছে এ ধরনের প্রথম কোনো রোগী। পরবর্তীতে গবেষক দলটি ওই নারীর পরিবারের ১৬ জনের ওপর গবেষণা চালিয়ে বংশগত সমস্যার কারণটি খুঁজে বের করেন।

গবেষক দলটি এই রোগের আরেকটি নাম দেন ‘অভিবাসন বিলম্ব রোগ’ বা ‘ইমিগ্রেশন ডিলে ডিজিজ’। অধ্যাপক ইটিন মনে করেন, সরকার পরিবারের বংশগত কেরাটোডার্মাই সেকেন্ডারি অ্যাডারমাটোগ্লিফিয়ায় রূপ নিচ্ছে। সেকেন্ডারি অ্যাডারমাটোগ্লিফিয়া তুলনামূলকভাবে বেশিসংখ্যক মানুষের থাকতে পারে। কখনও কখনও আঙ্গুলের মাথায় হালকা রেখাও থাকে কারও কারও। শুধুমাত্র জিন থেরাপির মাধ্যমেই ভবিষ্যতে এটি নিরাময় সম্ভব হতে পারে।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
জেলার খবর
অনুসন্ধান করুন