কয়লা শ্রমিকের সুরের মূর্ছনায় মুগ্ধ সবাই
jugantor
কয়লা শ্রমিকের সুরের মূর্ছনায় মুগ্ধ সবাই

  তারিম আহমেদ ইমন, অভয়নগর (যশোর)  

২৪ জানুয়ারি ২০২১, ১৭:৫৭:২১  |  অনলাইন সংস্করণ

সোহাগ মুন্সী

সামান্য পারিশ্রমিকে সারাদিন কয়লা টেনে চলে না সংসার। বাড়িতে অনটন তবুও সন্ধ্যার পর চায়ের দোকানে তাকে ঘিরে ভিড় জমে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের। মূলত প্রাণজুড়ানো কথা আর সুরের মায়ায় মানুষ ছুটে আসেন ক্লান্তি ভুলে গান আর প্রাণের আনন্দে!

শনিবার সন্ধ্যা, নোয়াপাড়ার একটি চায়ের দোকান অসংখ্য মানুষের ভিড়! মাঘ মাসের কনকনে শীতকে উপেক্ষা করে সন্ধ্যার পর সোহাগ মুন্সীর কণ্ঠে গাওয়া গান শুনতে এভাবেই ভিড় জমে অভয়নগর উপজেলার নওয়াপাড়া শহরের বিভিন্ন চায়ের দোকানে। সতেরো বছরের যুবক এই সোহাগ মুন্সী। তার সুমিষ্ট কণ্ঠে গান গান শুনতে শুনতে সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষেরা সারা দিনের ক্লান্তি ভুলে যান।

সারাদিন নওয়াপাড়ার কয়লা ঘাটে কাজ সেরে সোহাগ মুন্সী সন্ধ্যার পর উপস্থিত হন শহরের যেকোনো চায়ের দোকানে। চায়ের দোকানে বসে বাদ্যযন্ত্র হিসেবে বাজাতে থাকেন হাড়ি-পাতিল, কখনও চায়ের দোকানে থাকা টেবিল-বেঞ্চ, কখনও বা থালা-বাটি। গানের সাথে সাথে এসব বাদ্যযন্ত্রের শব্দ যোগ হয়ে সুরের মূর্ছনায়, পরিণত হয় সুনসান গানের আসরে। আর সেই সুরে মুগ্ধ হয়ে জড়ো হতে থাকেন আশপাশের সর্বস্তরের মানুষ।

গান শেষে কথা হলে তিনি যুগান্তরকে জানান, গোপালগঞ্জ জেলার তাড়াইল উপজেলার রাতুল গ্রামের মৃত কায়েম মুন্সীর ছেলে এই সোহাগ। সোহাগী জীবন আর পাওয়া হয়নি। তাই অভাবের তাড়নায় নওয়াপাড়া শহরে এসে কয়লার ঘাটে শ্রমিকের কাজ করে চলেছেন তিনি।

পিতৃহারা সোহাগ মুন্সীর গ্রামের বাড়িতে তার অপর চার ভাইবোনদের নিয়ে বসবাস করেন মা আছিয়া বেগম। গোপালগঞ্জে বসতভিটা ছাড়া কিছুই নেই তাদের। এই ভীনদেশে, একাকী শ্রমিক জীবনে, সারা দিনের কাজ শেষে, হোটেলে খাওয়া-দাওয়া সেরে কোনোমতে রাত কাটান নওয়াপাড়া পীরের মাজারে।
সকাল হলেই প্রতিদিনের মতো বেরিয়ে পড়েন কয়লার ঘাটে কাজ করার উদ্দেশ্যে। কয়লার ঘাটে কাজ করে তিনি সপ্তাহে মুজুরি হিসেবে পান এক থেকে দেড় হাজার টাকা। সামান্য এই টাকা আয় করে তা দিয়ে নিজের জীবন চলে সংকটের মধ্য দিয়েই। মায়ের সংসার খরচের প্রত্যাশার সামান্যই মেটাতে পারেন তিনি। ভেতরে ভেতরে বেশ যন্ত্রণাও অনুভব করেন।

সারা দিনের হাড়ভাঙ্গা খাটুনির শেষে, এই স্বভাব গায়কের কণ্ঠে সুরের জাদু অন্যদের দিনের ক্লান্তি দূর করতে সক্ষম হয়। এজন্যই সন্ধ্যার পর প্রাণের পরশ পেতে নানা সংকটের মধ্যে জীবনযাপন করা মানুষগুলো ছুটে আসেন।

আসরে বসে থাকা স্কুলশিক্ষক ফারুক মাস্টার বলেন, আপনি হয়তো শিল্পীর এই সুরে অনুভব করতে পারবেন না- সামান্য পারিশ্রমিকে, সারাদিন কী হাড়ভাঙা খাটুনির পরে এই মোহনীয় সুর বেরিয়ে এসেছে এই লোকজ শিল্পীর কণ্ঠে। ঘর নেই, খাওয়ারও সঠিক স্থান নেই, কিন্তু সুরে কী মায়া! এ ধরনের শিল্পীদের কদর করা উচিৎ। এদের মূল্যায়ন করলে দেশে যোগ্য শিল্পীদের আর অভাব ঘটবে না। এরাই তো এই শ্রমজীবী মানুষের বিনোদনের অন্যতম মাধ্যম!

সোহাগ মুন্সী যুগান্তরকে জানান, খুব বেশি কিছুর প্রয়োজন নেই। কিন্তু আর কিছু বাড়তি আয়ের পথ হলে বাড়িতে মা-বাবাকে সাহায্য করতে পারতাম। শিল্পী সোহাগ মুন্সী মনে করেন, তার অভাবের দিন একদিন ঘুচবে। হয়তো তার গানের মাধ্যমে অথবা কোনো দরদি মানুষের কৃপায়!

কয়লা শ্রমিকের সুরের মূর্ছনায় মুগ্ধ সবাই

 তারিম আহমেদ ইমন, অভয়নগর (যশোর) 
২৪ জানুয়ারি ২০২১, ০৫:৫৭ পিএম  |  অনলাইন সংস্করণ
সোহাগ মুন্সী
সোহাগ মুন্সী

সামান্য পারিশ্রমিকে সারাদিন কয়লা টেনে চলে না সংসার। বাড়িতে অনটন তবুও সন্ধ্যার পর চায়ের দোকানে তাকে ঘিরে ভিড় জমে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের। মূলত প্রাণজুড়ানো কথা আর সুরের মায়ায় মানুষ ছুটে আসেন ক্লান্তি ভুলে গান আর প্রাণের আনন্দে!

শনিবার সন্ধ্যা, নোয়াপাড়ার একটি চায়ের দোকান অসংখ্য মানুষের ভিড়! মাঘ মাসের কনকনে শীতকে উপেক্ষা করে সন্ধ্যার পর সোহাগ মুন্সীর কণ্ঠে গাওয়া গান শুনতে এভাবেই ভিড় জমে অভয়নগর উপজেলার নওয়াপাড়া শহরের বিভিন্ন চায়ের দোকানে। সতেরো বছরের যুবক এই সোহাগ মুন্সী। তার সুমিষ্ট কণ্ঠে গান গান শুনতে শুনতে সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষেরা সারা দিনের ক্লান্তি ভুলে যান।

সারাদিন নওয়াপাড়ার কয়লা ঘাটে কাজ সেরে সোহাগ মুন্সী সন্ধ্যার পর উপস্থিত হন শহরের যেকোনো চায়ের দোকানে। চায়ের দোকানে বসে বাদ্যযন্ত্র হিসেবে বাজাতে থাকেন হাড়ি-পাতিল, কখনও চায়ের দোকানে থাকা টেবিল-বেঞ্চ, কখনও বা থালা-বাটি। গানের সাথে সাথে এসব বাদ্যযন্ত্রের শব্দ যোগ হয়ে সুরের মূর্ছনায়, পরিণত হয় সুনসান গানের আসরে। আর সেই সুরে মুগ্ধ হয়ে জড়ো হতে থাকেন আশপাশের সর্বস্তরের মানুষ। 

গান শেষে কথা হলে তিনি যুগান্তরকে জানান, গোপালগঞ্জ জেলার তাড়াইল উপজেলার রাতুল গ্রামের মৃত কায়েম মুন্সীর ছেলে এই সোহাগ। সোহাগী জীবন আর পাওয়া হয়নি। তাই অভাবের তাড়নায় নওয়াপাড়া শহরে এসে কয়লার ঘাটে শ্রমিকের কাজ করে চলেছেন তিনি। 

পিতৃহারা সোহাগ মুন্সীর গ্রামের বাড়িতে তার অপর চার ভাইবোনদের নিয়ে বসবাস করেন মা আছিয়া বেগম। গোপালগঞ্জে বসতভিটা ছাড়া কিছুই নেই তাদের। এই ভীনদেশে, একাকী শ্রমিক জীবনে, সারা দিনের কাজ শেষে, হোটেলে খাওয়া-দাওয়া সেরে কোনোমতে রাত কাটান নওয়াপাড়া পীরের মাজারে।
সকাল হলেই প্রতিদিনের মতো বেরিয়ে পড়েন কয়লার ঘাটে কাজ করার উদ্দেশ্যে। কয়লার ঘাটে কাজ করে তিনি সপ্তাহে মুজুরি হিসেবে পান এক থেকে দেড় হাজার টাকা। সামান্য এই টাকা আয় করে তা দিয়ে নিজের জীবন চলে সংকটের মধ্য দিয়েই। মায়ের সংসার খরচের প্রত্যাশার সামান্যই মেটাতে পারেন তিনি। ভেতরে ভেতরে বেশ যন্ত্রণাও অনুভব করেন।

সারা দিনের হাড়ভাঙ্গা খাটুনির শেষে, এই স্বভাব গায়কের কণ্ঠে সুরের জাদু অন্যদের দিনের ক্লান্তি দূর করতে সক্ষম হয়। এজন্যই সন্ধ্যার পর প্রাণের পরশ পেতে নানা সংকটের মধ্যে জীবনযাপন করা মানুষগুলো ছুটে আসেন।

আসরে বসে থাকা স্কুলশিক্ষক ফারুক মাস্টার বলেন, আপনি হয়তো শিল্পীর এই সুরে অনুভব করতে পারবেন না- সামান্য পারিশ্রমিকে, সারাদিন কী হাড়ভাঙা খাটুনির পরে এই মোহনীয় সুর বেরিয়ে এসেছে এই লোকজ শিল্পীর কণ্ঠে। ঘর নেই, খাওয়ারও সঠিক স্থান নেই, কিন্তু সুরে কী মায়া! এ ধরনের শিল্পীদের কদর করা উচিৎ। এদের মূল্যায়ন করলে দেশে যোগ্য শিল্পীদের আর অভাব ঘটবে না। এরাই তো এই শ্রমজীবী মানুষের বিনোদনের অন্যতম মাধ্যম!

সোহাগ মুন্সী যুগান্তরকে জানান, খুব বেশি কিছুর প্রয়োজন নেই। কিন্তু আর কিছু বাড়তি আয়ের পথ হলে বাড়িতে মা-বাবাকে সাহায্য করতে পারতাম। শিল্পী সোহাগ মুন্সী মনে করেন, তার অভাবের দিন একদিন ঘুচবে। হয়তো তার গানের মাধ্যমে অথবা কোনো দরদি মানুষের কৃপায়!
 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
জেলার খবর
অনুসন্ধান করুন